সব ব্যাপারেই সরকারি দল ষড়যন্ত্র খোঁজে

এম গোলাম মোস্তফা, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৮, ১৭:৫২ | প্রকাশিত : ১৯ আগস্ট ২০১৮, ১৭:৪৬

বাংলাদেশের সব সরকারি দলই তাদের সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ব্যবহার করে আসছে বলে মনে করেন লেখক-গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ আমলেও এ্ ভাবধারা থেকে বেরোতে পারেনি কোনো সরকার। তারা সব ব্যাপারেই ষড়যন্ত্র খোঁজে।

শনিবার রাতে চ্যানেল আই-এর মতিউর রহমান চৌধুরীর সঞ্চালনায় প্রতিদিনের সংবাদপত্র বিশ্লেষণধর্মী অনুষ্ঠান ‘আজকের সংবাদপত্র’-এ এসব কথা বলেন তিনি। 

ফের অশান্ত পাহাড়, সেখানে রক্ত ঝরছে। ব্রাশফায়ার করে সাতজনের মৃত্যু। এটা কীভাবে দেখছেন? উপস্থাপকের এমন প্রশ্নে মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে এ ধরনের অন্তঃকলহ, সেখানে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী এবং বাঙালিদের মধ্যে কনফ্লিক্ট তো লেগেই আছে, এটা মাঝে মাঝেই মাথা চাড়া দেয়। সেখানে আমি নিজে দেখেছি, একটানা নয় দিন ছিলাম সেখানে। এই যে দিনের পর দিন অবরোধ, কিছু হলেই অবরোধ দিয়ে দেয়, কাপ্তাই লেকে সমস্ত নৌযান, যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এখানে তৃতীয় পক্ষেরও উস্কানি আছে- এ রকম অভিযোগও শোনা যায়।

‘পাহাড়ের সমস্যা অনেক দিন ধরে জিইয়ে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। ১৯৯৬ সালের শেষের যে পার্বত্য চুক্তি হয়েছিল, সেই চুক্তির কিছু কিছু ধারা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। আর মুল স্পর্শকাতর ভূমি অধিকার বিষয়টি সমাধান হয়নি এবং ওদের জন্য (স্থানীয় যারা) কিন্তু এটাই সবচেয়ে বড়।’

মহিউদ্দিন বলেন, ‘ওখানে সব গ্রুপই সশস্ত্র, তারা নিজেরাই মারামারি করে। অনেক সময় তৃতীয় পক্ষও তাদের ব্যবহার করে। পরিস্থিতি অশান্ত হলে ঘোলা পানিতে যারা মাছ শিকার করতে চায় তাদের জন্য সুবিধা হয়।’

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি টালমাটাল, এটার সাথে পাহাড় অশান্তের কোনো যোগসুত্র আছে কি না- সঞ্চালকের এমন প্রশ্নে মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সারা দেশ এক ধরনের মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচনের জন্য। সেই সময় এ ধরনের ঘটনায় পরিবেশ যদি বিঘ্নিত হয়, অশান্ত হয়ে ওঠে এবং এটা তো আরও বাড়তে পারে, সুতরাং এটাও একটা অশনি সংকেত বলা যায়।’

মত প্রকাশের সুযোগ যত কমে, গুজব তত বাড়ে- জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনার প্রসঙ্গ আনলে মহিউদ্দিন বলেন, ‘এটা তো খুব স্বাভাবিক। কারণ, এমনিতে মানুষ তথ্যের জন্য নির্ভর করে গণমাধ্যমের ওপর। এখন গণমাধ্যমে সবকিছু আসে না। এখন গণমাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে সরকারের তোষামোদি করে, আগেও এমনটা ছিল। আগে তো সরকারি পত্রিকাই ছিল, এখন সেটা নেই। কিন্তু দেখা যায় অনেকেই সরকারের সমর্থক, অনেকেই আছে বিরোধিতা করে। যারা সরকারের কাজের সমালোচনা করে সরকার তাদের পছন্দ করে না। আবার অনেক সময় সরকার সমালোচনার মধ্যে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পায়। সেই ষড়যন্ত্রের মধ্যে গণমাধ্যমও চলে আসে। ফলে আমি বলব, গণমাধ্যম অনেকটাই কোণঠাসা এবং এক ধরনের ভীতিও কাজ করে গণমাধ্যম কর্মীদের মধ্যে। অনেক জায়গায় তারা নানান রকমের হ্যারেজমেন্টের শিকার হচ্ছেন।

মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমরা কিছুদিন আগে দেখলাম গণমাধ্যমকর্মীদের বিশেষ করে ফটোসাংবাদিকদের পেটাল হেলমেট বাহিনী, পুলিশের ছত্রছায়ায়। তার মানে তো, এটা সরাসরি আঘাত। সুতরাং গণমাধ্যমে যদি সত্যিকারের তথ্যটা না আসে, তালে নিত্যনতুন গুজব তৈরি হবে। গুজবে মানুষ কান দেয় কখন, যখন সে প্রকৃত তথ্যটি পায় না।

গণমাধ্যম বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে সেখানে মানুষ যাবে না উল্লেখ করে মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মানুষ তো অনেক সংবাদপত্র পড়ে না। আর টিভি চ্যানেলে যে নিউজ প্রচার করা হয়, সবাই সব নিউজ দেখে না। আগেও বিটিভির নিউজ কেউ দেখত না, এখনো দেখে না। বিটিভির নিউজ বাধ্যতামুলক দেখানো হয় বেসরকারি টিভি চ্যানেলে। ওদের নিউজ যদি এতটাই বস্তুনিষ্ঠ হয় তাহলে তো বাধ্য করার প্রশ্নটা আসত না।’

অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে এটা করা কি সম্ভব- এমন প্রশ্নে মহিউদ্দিন বলেন, ‘এটা সম্ভব না। এখন সামাজিক গণমাধ্যমটি দাঁড়িয়ে গেছে। যখন প্রধান গণমাধ্যমে সত্য চাপা পড়ে যাবে, সোসাল মিডিয়ায় তো সেন্সরের বিষয় নাই, সেখানে মানুষ দিবে। দেশে থেকে মানুষ দিতে না পারলেও বিদেশ থেকে দেবে। কাজেই ওইখানটায় বন্ধ করা যাবে না। সত্যটা কোনো না কোনোভাবে বেরিয়ে আসবে।

মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, এখন সামাজিক গণমাধ্যমেও গুজব ছড়ানো হয়। এখন দেশে একটা আতঙ্কও চলছে। কোনো তথ্য যদি শাসকরা মনে করে যে সেটা তাদের পক্ষে যাচ্ছে না, তখন সেটাকে তারা ইন্টারপ্রেট করতে পারে ষড়যন্ত্র হিসেবে এবং সেটা করার একটা প্রবণতাও আমরা দেখছি। বিভিন্ন জায়গায় যেভাবে গ্রেপ্তার হচ্ছে।

‘এই ব্যাপারটি আসলে সাংঘর্ষিক দেখা যাচ্ছে। আমরা একদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলছি, অন্যদিকে আমরা অবাধ তথ্যপ্রবাহে বাধা দিচ্ছি। কিন্তু এটাকে বাধা দিয়ে রাখা যাবে না। এখন তথ্যপ্রবাহে নানান রকমের বাধা দেয়া হচ্ছে। ঘোষিত-অঘোষিত, লিখিত-অলিখিত বাধা দেয়া হচ্ছে। এটা নিয়েও কিন্তু বিদেশি গণমাধ্যমে কথাবার্তা হচ্ছে। তখন হয়তো অভিযোগ উঠবে যে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র হচ্ছে।’

মহিউদ্দিন বলেন, ‘সব ব্যাপারেই ক্ষমতাসীন দল শুধু ষড়যন্ত্র খোঁজে। এটা আমরা লিয়াকত আলীর সময় থেকেই দেখে আসছি। সমালোচক মানেই হচ্ছে রাষ্ট্রদ্রোহী, সমালোচক মানেই আপনি ষড়যন্ত্রকারী। পাকিস্তানের লিয়াকত আলী থেকে শুরু করে সাকসেসিভ যত সরকার আছে, এই একই অভিযোগ বিরোধী দলের ওপর করে গেছে। পাকিস্তানের এই ভাবধারা থেকে আমাদের দেশের সরকারও মুক্ত না।’

ঢাকাটাইমস/১৯আগস্ট/জিএম/মোআ

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
Close