মানবপাচারের ‘গডফাদার’ তেজগাঁও কলেজ শিক্ষক গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২০ আগস্ট ২০১৮, ১৪:৩৭ | প্রকাশিত : ২০ আগস্ট ২০১৮, ১৪:২৭

মানবপাচারের অভিযোগে মোহাম্মদ আছেম (৩৫) নামের রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সোমবার সকালে সিআইডি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম এই তথ্য জানান।

সিআইডি বলছে, আছেম সাগর পথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচার চক্রের অন্যতম গডফাদার। তিনি সমুদ্রপথে শত-শত মানুষকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পর তাদের অনেককে জিম্মি করে স্বজন-পরিজনের কাছ থেকে নানাভাবে টাকা আদায় করেছেন।

মোল্যা নজরুল বলেন, ‘আছেমের বাবা ও বড়ভাই দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়া রয়েছেন। এই সুবাদে তিনি মানবপাচারের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। তারা শতশত মানুষকে কক্সবাজার ও টেকনাফ দিয়ে সাগর পথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছে।’

‘মালয়েশিয়া পাঠানোর পর বিভিন্ন ব্যক্তিকে আটকে রেখে নির্যাতন এবং বাংলাদেশে থাকা তাদের আত্মীয়দের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করতো তারা। আমরা তথ্য পেয়েছি আছেম মুক্তিপণের টাকা তার আত্মীয়-স্বজন, মা ও নিজের অ্যাকাউন্টে জমা রেখেছেন।’

মোল্যা নজরুল বলেন, ২০১৪ সালে এই আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র সাগর পথে সিরাজগঞ্জের মাসুদকে মালয়েশিয়ায় পাচার করে। এরপর পাচারকারীরা ফোন করে মুক্তিপণ হিসেবে ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা দাবী করে। পরে মাসুদের বাবা আ. ছালাম ইসলামী ব্যাংকের মহাখালি শাখার একাউন্টে মুক্তিপণের ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা পাঠান। কিন্তু এরপরও তার ছেলে মুক্তি না পেলে, এই ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে উল্লাপাড়া থানায় একটি মামলা করেন (মামলা নং-১১, তারিখঃ ১১/৩/২০১৬, ধারাঃ৭/৮/১০ এর মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২)।

সিআইডি মামলাটি তদন্ত করে জানতে পারে, একটি সংঘবব্ধ আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী গ্রুপ মাসুদেকে পাচারের সাথে জড়িত। মানি ফ্লো এবং লিঙ্ক চার্ট থেকে দেখা যায় কারা মানব পাচারের অবৈধ অর্থ গ্রহন করেছে এবং নৃশংস অপরাধ সাথে জড়িত ছিল। এই মামলা তদন্তকালে ইসলামী ব্যাংকের মহাখালি শাখার ওই একাউন্টের সূত্র ধরে উদ্ঘাটিত হয় এর সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবব্ধ আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র।

এরই ধারাবাহিকতায় সিআইডির তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মো. আ. রাজ্জাক খান বাদী হয়ে বনানী থানায় একটি মামলা করেন। পরবর্তীতে এই মানি লন্ডারিং মামলা তদন্ত করার সময় জানা যায়, এই চক্রের সকল সদস্যদের পরিচয় এবং তারা কিভাবে কোন কোন ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে মুক্তিপণের অবৈধ অর্থ নিয়েছে।

মোল্লা নজরুল বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের বাংলাদেশের প্রধান নিয়ন্ত্রণকারী মূলহোতা মোহাম্মদ আছেম। তাকে রবিবার কারওয়ান বাজার এলাকা থেকে সিআইডি গ্রেপ্তার করে। আছেমের বাবা আনোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় ছিলেন এবং তার বড়ভাই মোহাম্মদ খোবায়েদ সেও মালয়েশিয়ায়। এই সুবাদে তারা আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের সঙ্গে যোগ দেয়।’

‘আছেম ২০১০ সালে তাদের সঙ্গে  মানবপাচারে কাজ শুরু করে। আছেম ও তার ছোটভাই জাভেদ মোস্তফা মানবপাচারের জন্য তারা প্রথমেই বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় দালাল নিয়োগ করে। দালালরা লোক ঠিক করে নিয়ে আসে। এরপর তাদের কাছ থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার খরচ নিয়ে টেকনাফে নিয়ে যাওয়া হয়। টেকনাফ থেকে ট্রলারে করে মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে রাখা হয়। সেখানে পাচারকৃত লোকদের আটকে রাখে। এরপর নির্যাতন করে বাংলাদেশে থাকা তাদের স্বজনদের কাছে মুক্তিপণ চায়। এরপর আছেম ও তার সহযোগিরা মুক্তিপণ আদায় করে। আর যারা মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হয় তাদের থাইল্যান্ডের জঙ্গলে মেরে ফেলা হয়। নেওয়ার পর তাদের হত্যা করা হয়।’

চক্রটি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা নিতো। এছাড়াও নগদ ক্যাশ নিয়ে থাকে। আছেম, তার ছোটভাই মোস্তফা, মা খাদিজা বেগম এবং তার সহযোগী আরিফ, একরাম, ওসমান সারোয়ারের নামে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, টেকনাফে বিভিন্ন ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তারা এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে মুক্তিপণের টাকা সংগ্রহ করে বলেও জানিয়েছে সিআইডি।

তিনি আরও জানান, আছেম মানবপাচারের টাকায় রাজধানীতে এসিএম করপোরেশন নামে একটি রিক্রটিং এজেন্সি খুলেছে। এই প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টেও অনেক টাকা রেখে। সেগুলো এই প্রতিষ্ঠানের ফাইন্যান্স ম্যানেজার আরিফুজ্জামান আকন্দ ওরফে আরিফ তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নিয়েছে বলেও সিআইডি অভিযোগ করেছে।

মোল্যা নজরুল বলেন, ‘আছেম পাচারের টাকা দিয়ে টেকনাফে বাড়ি ও জমি কিনেছে। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাতেও জমি কিনেছে। এগুলো সব অবৈধ টাকা।’

আছেম বর্তমানে পূর্ব রাজাবাজারে বসবাস করেন। তিনি তেজগাঁও কলেজের বিবিএ ডিপার্টমেন্টের প্রভাষক। তার গ্রামের বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার মৌলভীপাড়া এলাকায়।

তার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং ও মানবপাচারের তিনটি মামলা আছে। একটি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানায়, একটি রাজধানীর বনানী এবং অপর মামলাটি বাজিতপুর থানায় মানবপাচার আইনে করা হয়েছে।

গত পাঁচদিন আগে তাকে সিআইডি গ্রেপ্তার করেছিল, কিন্তু তিনদিনের মাথায় তার জামিন হলে সে আবার বের হয়ে আসে বলেও জানান সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার।

আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র কক্সবাজার সাগর চ্যানেল দিয়ে গত কয়েক বছর হাজার হাজার মানুষকে সাগর পথে মালয়েশিয়া পাচার করেছে এবং পাচারের সময় সাগর পথে মৃত্যুবরন করেছে শত শত বাংলাদেশী নাগরিক। এখনও নিখোঁজ আছেন অনেক মানুষ, যাদের খোঁজ মেলেনি আজো।

এরকম নৃশংস অপরাধ করেছে একটি সংঘবব্ধ আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র। যারা দীর্ঘদিন ধরে কক্সবা জার-থাইল্যান্ড-মালয়শেয়িা সাগর পথে অবৈধ ভাবে মানবপাচার করে মুক্তিপণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থের মালিক হয়েছে। এই সংঘবব্ধ চক্রের সদস্যরা কয়েকটি গ্রুপে ভাগ হয়ে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড ও মালয়শেয়িা অবস্থান করছে।

ঢাকাটাইমস/২০আগস্ট/এসএস/ডিএম

সংবাদটি শেয়ার করুন

অপরাধ ও দুর্নীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত