গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ‘কিছু দিনের মধ্যে’

মোসাদ্দেক বশির, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৮, ১৭:২২ | প্রকাশিত : ২১ আগস্ট ২০১৮, ০৯:২৪

বিচার ঠেকাতে উচ্চ আদালতে আসামিপক্ষের পাঁচবার ছুটে যাওয়া, সাক্ষীদের জেরায় একই কথা বারবার টেনে আনা আর নানা কৌশলে সময়ক্ষেপণে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার প্রত্যাশিত রায় মেলেনি এখনও।

দুই বছর ধরেই বলা হচ্ছিল আগামী ২১ আগস্টের মধ্যেই রায় ঘোষিত হবে। কিন্তু সেটা আর হচ্ছে না। তবে মামলা এখন যে পর্যায়ে তাতে রায় ঘোষণা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

হামলার ১৪ বছর পূর্তির আগের দিন রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমরা গত বছর গণমাধ্যম‌কে ব‌লে‌ছিলাম এ বছর ২১ আগ‌স্টের মধ্যে এ মামলার রায় পেতে সক্ষম হব। সেই  প্রত্যাশা অনুযায়ী মামলার কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা অল্প কিছু দিনের মধ্যে এ মামলার রায় পাব। আইনমন্ত্রীও এ প্রত্যাশা করেছেন।’

এই মামলার ৫২ আসামির মধ্যে জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ এবং হরকাতুল জিদাহ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও তার সহযোগী বিপুলের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে অন্য মামলায়। বাকি ৪৯ জন জীবিত আসামির মধ্যে চার জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সাজা মৃত্যুদণ্ডতুল্য না। তারা আবার পলাতক।

আর পলাতকদের মধ্যে কারও মৃত্যুদণ্ডের সাজা হলেই কেবল তার পক্ষে রাষ্ট্র আইনজীবী নিয়োগ করে। ফলে ৪৫ জনের যুক্তি উপস্থাপনের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনি যুক্তিতে শেষ হবে শুনানি। এরপর আসবে রায়ের তারিখ।

এখন ৪৫ তম আসামি হিসেবে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন চলছে। রাষ্ট্রপক্ষ আশা করেছিল, এই যুক্তি আগেই শেষ হয়ে যাবে এবং হামলার মাস আগস্টেই পাওয়া যাবে রায়।

তবে সেটা হয়নি, আগামী ২৬ থেকে ২৮ আগস্ট-এই তিন দিন বাবরের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের কথা আছে। এই অবস্থায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান এবং আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আগামী মাসে অর্থাৎ সেপ্টেম্বরেই রায় পাওয়ার আশা করছেন।

মামলাটি প্রকাশ্যে হলেও এর তদন্ত ছিল জটিল। সে সময় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার মামলাটির তদন্ত করে কেবল আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করেনি, প্রধান আসামিদেরকে পার পাইয়ে দিতে নির্দোষ জজ মিয়াকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। আর ওই সরকার ক্ষমতা থেকে যাওয়ার পর প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং পরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুই দফা তদন্তের পর শুরু হয় বিচার। আর এই প্রক্রিয়ায় কেটে যায় প্রায় আটটি বছর। এর পরের ছয় বছর ধরে চলছে শুনানি।

বিচার চলছে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে। তার পরও ছয় বছর শুনানির পরও কেন রায় পাওয়া যায়নি, জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এ মামলায় রাষ্ট্রপ‌ক্ষের ৫১১ জন সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জন সাক্ষীর জবানব‌ন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। আসামিপক্ষ এসব সাক্ষীদের জেরা করেছেন। অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় জেরা করার মাধ্যমে কালক্ষেপণ করেছেন। আসামিরা পাঁচ বার হাইকোর্টে গেছেন।’

‘সর্বমোট ২৭২ কর্ম‌দিবস তারা ব্যয় করেছেন। এ মামলায় এখন পর্যন্ত ১০৮ কার্য‌দিবস যু‌ক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়েছে। তার মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ ২৫দিন যু‌ক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছে। যুক্তি উপস্থাপন করতে গিয়েও সব আসামির আইনজীবীরা একই কথা বলে সময় নষ্ট করেছেন।’

তবে এসব অপকৌশল আর কাজে আসবে না জানিয়ে রেজাউর রহমান বলেন, ‘এখন শেষ আসামির পক্ষে বক্তব্যও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এরপর রায়ের তারিখ ঘোষণায় আর সময় লাগার কথা না।’

‘এখন সর্বশেষ আসামি বাবর সাহেবের (বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর) পক্ষে যু‌ক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে। তার প‌ক্ষে পাঁচ দিন যু‌ক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন আইনজীবী। আগামী সোম, মঙ্গল ও বুধবার যুক্তি উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য আছে।’

‘এরপর রাষ্টপক্ষ এখন আইনি যু‌ক্তি উপস্থাপন করবে। সেটা এক‌দিনের বে‌শি নয়।’

দৃষ্টান্তমূলক সাজার প্রত্যাশা

যুক্তিতর্ক এবং সাক্ষ্য প্রমাণ হিসেবে যা উপস্থাপন করা হয়েছে তাতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সব আসামির দৃষ্টান্তমূলক সাজা হবে বলেই বিশ্বাস করেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান।

রেজাউর রহমান বলেন, ‘আমরা আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছি। সকল আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।’

রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী বলেন, ‘সাক্ষ্য প্রমাণের মাধ্যমে আমরা মামলা প্রমা‌ণ করতে সক্ষম হয়েছি। আশা করি, আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হ‌বে। যাতে আর কেউ এমন নৃশংস হামলা করতে সাহস না করে।’

১৪ বছরের আজকের দিনটাকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের মোড় ঘুরানো ঘটনা বললে অত্যুক্তি হবে না। সে সময়ের বিরোধীদলীয় নেতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালিয়ে হত্যার চেষ্টা হয়।

বেঁচে গেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা, কিন্তু জনসভা থেকে বেঁচে ফিরতে পারেননি ২০ জনেরও বেশি নেতা-কর্মী। শতাধিক হন গুরুতর আহত।

গ্রেনেডের স্প্লিন্টারগুলো ২১ আগস্ট এলে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় সেদিনের বীভৎসতা। জানার চেষ্টা হয় কবে পাবেন বিচার।

সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, ‘‘চারদলীয় জোট সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকদের সহায়তায় এ হামলায় অংশগ্রহণ করে নি‌ষিদ্ধঘো‌ষিত তিন‌টি জঙ্গি সংগঠন। তৎকালীন প্র‌তিমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ধানম‌ন্ডির বাসভব‌নসহ ১০টি জায়গায় বৈঠক করা হয়েছে।’

‘আবার এ মামলার তদন্ত ভিন্নখাতে প্রবা‌হিত করার জন্য চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু পরে তা ধরা পড়েছে।’

তদন্তের শুরুতে জোট সরকারের অপচেষ্টা

শুরু থেকেই এই হামলার জন্য সে সময় ক্ষমতায় থাকা বিএনপির সম্পৃক্ততার অভিযোগ করে আসছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু ওই আমলে সরকার মামলাটি ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তখন সরকারের বিরুদ্ধে মামলার আলামত ইচ্ছা করেই নষ্ট করার অভিযোগ উঠে। সে সময়ের জোট সরকার যুক্তরাজ্যের তদন্ত সংস্থা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডকে তদন্তের জন্য আমন্ত্রণ জানালেও তারা সরকারের অসহযোগিতায় বিরক্তি প্রকাশ করে চলে যায়।

পরে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তদন্তের জট খুলতে শুরু করে। সে সময় জজ মিয়া নামে নিরীহ একজনকে আসামি সাজিয়ে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা ফাঁস হয়ে যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে।

২০০৮ সালের ১১ জুন ২২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রথম অভিযোগপত্র দাখিল করে সিআইডি। এতে শেষে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুর সালাম মিণ্টু ও তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনকে আসামি করা হয়।

ওই বছর ২৯ অক্টোবর ২২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল। ২০০৯ সালের ৯ জুন পর্যন্ত ৬১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়।

অধিকতর তদন্তে আসামি তারেক রহমান

২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। পরে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডির পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আখন্দ।

২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক রহমানসহ ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে মোট ৫২ জনের নামে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা।

অধিকতর তদন্তে উঠে আসে, হাওয়া ভবনসহ যেসব স্থানে এই হামলার পরিকল্পনা হয়েছে, সেগুলোতে তারেক রহমান উপস্থিত ছিলেন। আর এ কারণেই হামলার পর মামলাটি ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্টা হয়েছে।