গ্রেনেড হামলায় খালেদা-তারেক জড়িত: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৮, ১৭:১৬ | প্রকাশিত : ২১ আগস্ট ২০১৮, ১২:০৯

১৪ বছর আগে আজকের দিনে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের শোভাযাত্রার আগে গ্রেনেড হামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমান জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের হামলার আগে পরের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে এই অভিযোগ করেন তিনি।

হামলার ১৪ বছর পূর্তির দিনে মঙ্গলবার সকালে দলীয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিহতদের স্মরণে নির্মিত অস্থায়ী বেদীতে শ্রদ্ধা জানান শেখ হাসিনা। এরপর তিনি একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। আর বক্তব্য শেষে নিহতদের স্বজন ও আহতদের স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটান।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রায় নজিরবিহীন হামলা হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা আর্জেস গ্রেনেড ছুড়ে এবং পরে গুলি চালিয়ে সে সময়ের বিরোধীদলীয় নেতাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তাকে নেতা-কর্মীরা মানববর্ম বানিয়ে রক্ষা করেন। তবে প্রাণ হারান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২২ জন। আহত হয় অগনিত মানুষ।

সে সময় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি এবং তারা সে সময় এই হামলার জন্য আওয়ামী লীগকেই দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছে। আর হামলার আগে ও পরের নানা ঘটনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা খুব স্বাভাবিকভাবে আসে, এই যে হত্যাকাণ্ডের চেষ্টা, এর সাথে বিএনপি একেবারে যে ওতপ্রতোভাবে জড়িত। খালেদা জিয়া, তার ছেলে (তারেক রহমান) সব যে জড়িত, তার কোনো সন্দেহ নেই।’

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়ার একটি উক্তিও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। বলেন, ‘আমার নামে নিয়ে বলেছিল, হাসিনা- সে প্রধানমন্ত্রী হওয়া দূরের কথা, বিরোধীদলের নেতাও হতে পারবে না। আর আওয়ামী লীগ ১০০ বছর ক্ষমতায় যেতে পারবে না। তারপরেই কিন্তু এই হামলা।’

‘খুব স্বাভাবিকভাবে এটা যেকোনো মানুষের কাছে উপলব্ধি হবে যে, আমাকে তো মারবেই পারবে, আওয়ামী লীগকেও নিশ্চিহ্ন করে দেবে যেন এই আওয়ামী লীগ আর শত বছরেও আওয়ামী লীগ যেত না পারে। তাই এই ঘটনার সাথে তারা যে শতভাগ জড়িত।’

বিএনপির সম্পৃক্ততার প্রমাণ

এই হামলায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সম্পৃক্ততার প্রমাণ হিসেবে বেশ কিছু ঘটনা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। বলেন, যখন এই ধরনের সমাবেশ বা শোভাযাত্রা হয় তখন দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের দিয়ে স্বেচ্ছাসেবী দল করা হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা আশপাশের ছাদে অবস্থান নেয়। কিন্তু ২১ আগস্টের সেই সমাবেশে এই নেতা-কর্মীদের কোনো ভবনে উঠতে দেয়নি পুলিশ।

‘আপনারা সেদিন স্মরণ করে দেখেন, সেদিন কিন্তু ছাদে কাউকে যেতে দেয়নি, কাউকে পাহারা দিতে দেয়নি। পুরা বন্ধ ছিল। কী কারণে?’-প্রশ্ন রাখেন শেখ হাসিনা।

হামলার পর পুলিশের ভূমিকাও ‍তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘আমাদের নেতা-কর্মীরা যখন আহত অবস্থায় পড়ে কাতরাচ্ছে সেই দিন অন্য যারা নেতা কর্মী আছে তারা যখন ছুটে আসল সাহায্য করতে, তখন ওই অবস্থায় টিয়ারসেল মারা হলো, লাঠিচার্জ করা হলো।’

‘একটা ঘটনা ঘটলে পরে সাধারণত পুলিশ যায় মানুষকে সাহায্য করতে। আমরা সেদিন দেখলাম একটা ভিন্ন চিত্র। পুলিশ সাহায্য করতে না, উল্টো যারা সাহায্য করতে ছুটে আসছে, তাদের ওপর লাঠিচার্জ তাদের ওপর টিয়ারসেল মেরেছে।’

‘লাঠিচার্জ করে এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি করেছিল যেন হামলাকারীরা নির্বিঘ্নে সেখান থেকে চলে যেতে পারে, সেই সুযোগটাই সৃষ্টি করেছিল।’

সেদিন ওই এলাকায় কাজ করা রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের একজন কর্মকর্তাকে পুলিশ সদরদপ্তর থেকে শাসানো হয়েছিল বলেও জানান শেখ হাসিনা। বলেন, ‘সে (গোয়েন্দা কর্মকর্তা) পুলিশ হেডকোয়ার্টারে ফোন করে, সে জানতে চায় এটা কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, তাকে ধমক দিয়ে বলা হয়, তোমার ওখানে কী কাজ, তুমি এখান থেকে সরো।’

‘যে সমস্ত পুলিশ কর্মকর্তা একটু সাহায্য করতে চেষ্টা করেছে, তাদেরকে সরকারের পক্ষ থেকে, বিএনপির পক্ষ থেকে তিরস্কার করা হয়েছে। তাদেরকে সরে যেতে বলা হয়েছে।’

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সভা-সমাবেশ করতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পুলিশের সব সময় ঘিরে থাকা, দলীয় কার্যালয়ের সামনে আমাদের দাঁড়াতে না দিলেও সেদিন পুলিশ নির্বিঘ্নে তাদেরকে আসতে দেয়ার মধ্যেও চক্রান্ত ছিল বলে মনে করেন শেখ হাসিনা।

বলেন, ‘তারা এখানে এসে যেভাবে হামলা করল, তাতে খুব স্বাভাবিকভাবে সকলেই বুঝতেই পারে এই হামলার পেছনে কারা ছিল, কে ছিল।’

আলামত নষ্ট, নির্দোষকে আসামি করা

গ্রেনেড হামলার পর কোনো আলামত সংগ্রহ না করে সিটি করপোরেশনের গাড়ি দিয়ে সব ধুয়ে মুছে দেয়ার বিষয়টিকেও বিএনপির সম্পৃক্ততার অকাট্ট প্রমাণ বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রশ্ন তোলেন কেন সব আলামত নষ্ট করা হয়েছে।

‘এই ধরনের ঘটনা ঘটলে আলামত সংরক্ষণ করতে হয়। এখানে দুইটা গ্রেনেড ফোটেনি। একটা আমার গাড়িটা এখানটায় পার হয়ে যাওয়ার পরেই বার্স্ট (বিস্ফোরিত) করল আর রমনা ভবনের পাশে আরেকটা গ্রেনেড পাওয়া গেছে।’

‘যে গ্রেনেডটা পাওয়া গিয়েছিল, সেটাও কিন্তু তারা সংরক্ষণ করে নাই। বরং সে সেনাবাহিনীর অফিসার এটা সংরক্ষণ করার চেষ্টা করেছিল, বলেছিল ওটা লাগবে, তখন তাকে সাজা পেতে হয়েছিল। তাকে তিরস্কার করা হয়েছিল।’

নির্দোষ জজ মিয়াকে আসামি করার বিষয়টিও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। বলেন, ‘১৫ আগস্টের পর যেমন খুনিদেরকে রক্ষা করে পুরস্কৃত করেছে জিয়াউর রহমান, ঠিক তেমনি ২১ আগস্টের ঘটনার পরও দেখলাম প্রকৃত খুনি কারা তাদেরকে খুঁজে বের না করে সাধারণ একজন মানুষ, গ্রামের মানুষ তাকে নিয়ে এসে…’

‘সেই জজ মিয়া নাকি কনস্পিরেসি (ষড়যন্ত্র) করেছে, জজ মিয়া মেরেছে, জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে এই ঘটনার দৃষ্টিকে অন্যদিকে ফেরাতে চেষ্টা করল।’

চিকিৎসাতেও সরকারের অসহযোগিতা

গ্রেনেড হামলায় আহতদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ও সময় বিএনপি সরকার অসহযোগিতা করেছিল বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

‘আহতরা হাসপাতালে যখন গেছে, বিএনপির লাইনে একটা ডাক্তারও তারা সেখানে ছিল না, কোনো চিকিৎসায় তারা সহযোগিতা করেছি। বঙ্গবন্ধু মেডিকেললে তো কোনো আহত ঢুকতেই পারেনি। আর ঢাকা মেডিকেল কলেজে কেউ ছিল না।’

‘ঢাকা শহরে কতটা ক্লিনিক আছে, কতটা হাসপাতাল আছে, ২১ আাগস্ট গ্রেনেড হামলার পরে আমরা তখন জানতে পারি।’

‘সাথে সাথে আমি চারদিকে লোক পাঠিয়ে দেই, কোথায় কোথাও আহতদের চিকিৎসা, রক্তের ব্যবস্থা আমরাই করি।’

ঠাট্টা, তামাশা করেছে বিএনপি সরকার

শেখ হাসিনা জানান, হামলার পর তার এ নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে গেলে তা করতে দেয়া হয়নি।

‘পার্লামেন্টে আমাদের বক্তব্য পর্যন্ত দিতে দেয়নি। আর কেউ বক্তব্য দিতে চাইলেই মাইক বন্ধ আর তারপর তাদের ব্যাঙ্গোক্তি -সেটাও আমাদের স্মরণে আছে।’

“এই ধরনের ঘটনা ঘটলে পার্লামেন্টে সাধারণত একটা রেজুলেশন নেয়া হয়। সেই পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে তার দলের লোকেরা কী বলেছিল? সোজা বলে দিল, ‘না ওনাকে আবার কে মারতে যাবে’।”

‘আমার ওপর অপবাদ দিল, আমি নাকি ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে এসে নিজেই গ্রেনেড মেরেছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম আমরা আবার গ্রেনেড মারায় পারদর্শী কবে হলাম আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে আমি কি সুইসাইড করতে গিয়েছিলাম নাকি?’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘গুজব ছড়ানো ও মিথ্যা কথা বলায় বিএনপির থেকে পারদর্শী কেউ নয়। সব জায়গায় এটা ছড়ালো, স্কুলে স্কুলে পর্যন্ত বাচ্চাদের কাছে পৌঁছে দিল যে এই গ্রেনেড আমি ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড মেরেছি। আমি নিজে নিজে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছি। এদের চরিত্রটা দেশবাসীর মনে রাখা উচিত।’

তারেকের শ্বশুর বাড়িতে কী হয়েছিল?

ওই বছর ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে আরও একটি হত্যা চেষ্টা হয়েছিল বলে পরে জানতে পেরেছেন প্রধানমন্ত্রী। সেটি উল্লেখ করে তারেক রহমানের শ্বশুর বাড়িতে রাতের আঁধারে কিছু ‘ষড়যন্ত্র’ এর কথা তুলে ধরেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারেক জিয়া তখন শ্বশুর বাড়িতেই থাকে। সে প্রায় নয় মাস ওখানেই ছিল। তারপর ১ আগস্ট চলে যায় কিন্তু ওই বাড়িতে আবার আসে।’

‘গভীর রাতে ওখানে একটা গাড়ি আসে এবং সেখান থেকে কিছু বড় বড় পেটি নামায় ১২টার দিকে এবং আড়াইটা তিনটার দিকে বোরকা পরা কিছু লোক জিপে করে এসে পেটিগুলো নিয়ে চলে যায়।’

‘এই খবরটা পড়ে আমার সাথে জাফরউল্লাহ সাহেব ছিলেন, তাকে বললাম, ‘জাফর ভাই, আমার কাছে একটা খবর আসছে, তো ওই বাড়িটায় কী হচ্ছে? মাহবুব সাহেবের স্ত্রী (তারেক রহমানের শাশুড়ি) কোথায়? ওখানে বসে কিছু একটা কনস্পিরেসি হচ্ছে। একটু খোঁজ নেন।’

‘ওনি বললেন, কালকে র‌্যালিটা আছে, র‌্যালিটা শেষ হোক, তারপরে আমি খবর নেব। তারপরে র‌্যালিতে যা ঘটার তাই ঘটল।’

ঢাকাটাইমস/২১আগস্ট/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত