সেদিন স্বয়ং আল্লাহ শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়েছিলেন

ড. কাজী এরতেজা হাসান
 | প্রকাশিত : ২১ আগস্ট ২০১৮, ১৪:১৬

পঁচাত্তরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জেনারেল জিয়াউর রহমান যেমন জড়িত ছিলেন, তেমনি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা জড়িত ছিলেন। জিয়া পরিবার খুন, হত্যা ও ষড়যন্ত্র বিশ্বাসী রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল।

ভয়াল ২১ শে আগস্টের প্রধান লক্ষ্যই ছিল শেখ হাসিনার হত্যার চেষ্টা। শুধু এই একটি উদ্দেশ্যেই সেদিন গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। এ হামলায় জননেত্রী শেখ হাসিনার কোনভাবেই বেঁচে থাকার কথা ছিল না। স্বয়ং আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন। এর আগেও একাধিকবার জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ'র রহমতে এবং জনগণের ভালবাসায় তিনি বারবার রক্ষা পেয়েছেন। যে কারণে জননেত্রী শেখ হাসিনা বারবার বলে থাকেন ‘মৃত্যুকে আমি ভয় করি না’। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দাবি করেন একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নত করবো না। কারণ, তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন জীবন দেয়া ও নেয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ।

নিশ্চয়ই কাকতালীয় নয়, এই হামলার আগে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এক বক্তৃতায় বলেছিলেন আওয়ামী লীগ আগামী একশ' বছরেও আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না। এমন ভবিষৎবাণী তিনি কিভাবে বলেছিলেন সেটাই দেশবাসীকে ভাবিয়ে তুলছে। তিনি কোন পরিকল্পনা থেকে এই ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন? এরপর কিছু দিনের মধ্যই গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটেছিল। ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মূলপরিকল্পনায় ছিলো তারেক রহমান।

অবশ্য তিনি ওই দিন ধানমন্ডিতে শ্বশুর বাড়িতেই ছিলেন। কিন্তু গ্রেনেড হামলার ঘটনার আগেই তিনি ধানমন্ডির ওই বাসা ছেড়ে ক্যান্টনমেন্টের বাড়িতে গিয়ে উঠেছিলেন। এই হামলার সঙ্গে খালেদা জিয়া, তাঁর পুত্র ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা যে জড়িত ছিলেন তা আজ দিবালোকের মতো পরিষ্কার।

কি ঘটেছিল সেইদিন? বলতে গেলে, একুশে আগস্ট মানেই গা শিউরে ওঠা। একুশে আগস্ট মানেই থমকে যাওয়া। ২১ আগস্ট বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া জাতির জন্য রক্তাক্ত ও এক কলঙ্কিত অধ্যায়। ঘটনার সময়টি ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট, বিকাল ৫টা ২২ মিনিটে। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দলের সন্ত্রাসবিরোধী সভা চলছিল। খোলা ট্রাকে বানানো উন্মুক্ত মঞ্চে জননেত্রী শেখ হাসিনা বক্তৃতা শেষ করে সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রার উদ্বোধন ঘোষণা করবেন; ঠিক সেই সময় তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে শুরু হয় একের পর গ্রেনেড নিক্ষেপ।

মুহূর্তের মধ্যেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল গোটা বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা সেদিন অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেলেও নিহত হন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিনী ও আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভী রহমানসহ আরো ২৪ জন নেতাকর্মী। আহত হয়েছিল আরো পাঁচ শতাধিক মানুষ। দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে বাঁচানোর জন্য নিজেদের জীবন বাজি রেখেও ট্রাকের ওপর মানববর্ম রচনা করেছিলেন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ।

সেই গ্রেনেড হামলায় একের পর এক ১৩টি গ্রেনেড বিস্ফারণ ঘটানো হয়েছিল। জীবন বাজি রেখেই সেই মুহুর্তে প্রয়াত সাবেক ঢাকা সিটি মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা অফিসার মামুন মানবঢাল রচনা করে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রক্ষা করেছিলেন।

শুধু গ্রেনেডই নয়, হত্যার জন্য প্রধানমন্ত্রীর গাড়িকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলিও ছোঁড়া হয়েছিল। সেই গুলিতেই নিরাপত্তা সদস্য মাহাবুব গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, হামলার পর তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার উদ্ধারের কাজ তো দূরের কথা, উল্টো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ চালিয়েছিল। এর চেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনা কি হতে পারে আমার জানা নেই। এমনকি সত্য'কে ধামাচাপা দিতে গিয়ে গ্রেনেড হামলার সকল আলামত ধুয়েমুছে নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল।

ঘটনার পরবর্তী সময়ে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম জিয়াসহ বিএনপি জামাত জোটের অন্যরা দাবি তুলেছিল- জননেত্রী শেখ হাসিনাই নাকি ভ্যানিটি ব্যাগে করে ১৩টি গ্রেনেড নিয়ে গিয়ে ওই সভাস্থলে হামলা করেছিল। এমন সব শুধু অপপ্রচার ও মিথ্যাচারই নয়, হামলার ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে নানা অপকর্ম চালিয়েছিল তৎকালীন বিএনপি ও জামাত জোট সরকার পক্ষ থেকে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আজ জাতির সামনে স্পষ্ট হয়েছে এবং তদন্তেও বেরিয়ে এসেছে যে উক্ত হামলার সঙ্গে খালেদা জিয়া, পুত্র তারেক রহমান ও তাঁর মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যই সরাসরিভাবে জড়িত।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়া যেমনটি জড়িত ছিল, তা আত্মস্বীকৃত খুনি ফারুক-রশিদ বিবিসির এক সাক্ষাৎকালে স্বীকারোক্তি দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করে নরঘাতক ফারুক-রশিদ বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিকল্পনার কথা তারা জিয়াউর রহমান'কে জানিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান তখন তাদের'কে উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন, সরাসরি নিজে থাকতে না পারলেও পরিকল্পনা সফল হলে তাদের (ফারুক-রশিদ) সব ধরনের সহযোগিতা করবেন। বঙ্গবন্ধু সপরিবার হত্যাকান্ডের পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান ঠিক তার দেওয়া কথা মতোই নরঘাতক ফারুক-রশিদদের সহযোগিতা করেছিলেন। খুনিদের দেওয়া কথা রেখেছিলেন। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের বিচার বন্ধ করেছিলেন। এমনকি তাদের পুরস্কৃত করেছিলেন। যা ছিলো বিশ্বে একপ্রকার নজীরবিহীন ঘটনা।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ক্ষমতা দখলকারীরা বাংলাদেশকে ধ্বংস করে দিয়ে এদেশকে পাকিস্তানের একটি প্রদেশ বানাতে চেয়েছিল, বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন পর্যন্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু জনগণের প্রবল প্রতিবাদের মুখে তারা তা করতে পারেনি। কারণ কোনো প্রকার ষড়যন্ত্রই আলোর পথ দেখে না।

একাত্তরের পরাজিত শক্তির পদলেহনকারী ও তোষামদকারীরা সুযোগ পেলেই বাঙালি জাতির ওপর আঘাত হেনেছে। বাংলাদেশ যাতে এগিয়ে যেতে না পারে সেজন্য এখনও চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি আজো চলছে।

১৫ আগস্টের হত্যাকান্ডের শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদিন পর বিচার সম্পন্ন ও কার্যকর হলেও ২১ শে আগস্টে বিচার এখনো পায়নি জনগণ। দেশবাসীর প্রত্যাশা যতদ্রুত সম্ভব ২১ শে আগস্টের ন্যায় বিচারের মধ্যদিয়ে বাংলার মাটি থেকে জঙ্গিবাদ, হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি চিরতরে বিলুপ্ত হোক। আশা করা যাচ্ছে আগামী মাসেই এই মামলার রায় হবে। রায়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।

লেখক: আওয়ামী লীগের শিল্প-বাণিজ্য ও ধর্ম বিষয়ক উপ কমিটির সদস্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত