টিভিতে মানহীন কাজই বেশি

সৈয়দ ঋয়াদ
| আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:৫৯ | প্রকাশিত : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:৫৩

দুই যুগেরও বেশি সময় থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত। টিভি নাটকে পার করেছেন দুই দশক। মঞ্চ আর ছোটপর্দাÑ দুই মাধ্যম মিলিয়ে বর্ণাঢ্য তার ক্যারিয়ার। বড়পর্দায়ও সিরিয়াস কিছু কাজ করেছেন। তিনি জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী বন্যা মির্জা। অভিনয়জীবনের নানা বিষয় নিয়ে ঢাকাটাইমসের-এর মুখোমুখি হয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সৈয়দ ঋয়াদ। ছবি তুলেছেন শেখ সাইফ|

থিয়েটারে শুরু কীভাবে?
সময় কিভাবে যেন চলে যায়! আমি থিয়েটার শুরু করি ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে। তখন আমি ম্যাট্রিক পাস করেছি। ভাবলাম কিছু একটা করতে হবে। তখন ‘দেশ নাটক’ দলে আমার পরিচিত কিছু মানুষ ছিল। আমিও ভেবেছি এমন একটি জায়গায় কাজ শুরু করা আমার জন্য ভালো হবে, যেখানে নিজেকে খুব সহজে মানিয়ে নেওয়া যাবে। সে কারণেই এই দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া।

আপনার সব কিছু তো অনেকটা পরিকল্পনামতোই এগিয়েছে।

আরে না, তা আর হয় নাকি? কোনো কিছুই কিন্তু একেবারে অত ভেবে করা হয়নি। থিয়েটারে কাজ করা, নাট্যকলায় পড়া কিংবা টেলিভিশন বা সিনেমায় কাজ করা। থিয়েটার আমাদের এখানে আগেই শুরু হয়েছিল। একাত্তর-পরবর্তী যারাই থিয়েটার করেছে এটা একটা পরম্পরার অংশ। আমরা তাদেরই উত্তরসূরি।

নাট্যতত্ত্বে পড়াশোনার পেছনেও কী তাহলে পরিকল্পনা ছিল না?

আমি যখন থিয়েটার করি তখন তো ম্যাট্রিক পাস করেছি। ইন্টারমিডিয়েটের পর যেহেতু থিয়েটার করছি তাই এই বিষয়ে পড়াশোনা করার তাগাদা অনুভব করি। থিয়েটার করার কারণেই নাটক ও নাট্যতত্ত্বে পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নতুন একটি সাবজেক্ট, মনে হলো পড়ব তাই পড়েছি। এখানে ক্যারিয়ার গড়ব এমন চিন্তাও ছিল না। একটা সময় থাকে না মানুষ এত সাত-পাঁচ ভেবে কোনো কিছু করে না। খানিকটা নিজের ইচ্ছেমতো চলার চেষ্টা করে, আমি সেভাবেই চলি।

মঞ্চ থেকে টিভিতে। পরিকল্পনা করেই এসেছেন?

না একেবারেই না। তাই কি আর থাকে। কারোরই থাকে না। আর ওই বয়সে আমরা কি ভেবেছি এই করব, সেই করব। বললাম না, আমরা ভাবি না আসলে। অনেক কিছু না ভেবেই করে ফেলি। থিয়েটার আমাদের পরম্পরার অংশ। বাংলাদেশে যারাই থিয়েটার করেছে, পরে তাদের প্রায় সবাই টেলিভিশনে কাজ করতে গিয়েছে।
টেলিভিশন নিয়ে আগ্রহ নিশ্চয়ই।

আমি কিন্তু টেলিভিশনে কাজ করতে নিজে থেকে যাইনি। যাব এই ধরনের চেষ্টাও করিনি। আমি বা আমরা থিয়েটারটাই করছিলাম। ওই সময় ভাবতাম থিয়েটার করব আর অন্য একটা কিছুকে পেশা হিসেবে নেব। যেটা ঠিক এই মুহূর্তে আমি করছি। আমি দলের একটি প্রোডাকশনে কাজ করছিলাম। সাইদুল আনাম টুটুল এসেছিলেন আমাদের নাটক দেখতে। তিনি এই নাটকটি বানাতে চাইছিলেন। আমাকেও বললেন। আমি তখন বিষয়গুলো বুঝি না এরকম একটা ব্যাপারই ছিল। তখন আমাদের দলের লাভলু ভাই (সালাহউদ্দিন লাভলু) বললেন কেন করবে না? করাই তো উচিত। তখন সুখের নোঙর (১৯৯৭) নাটকে অভিনয় করি।

তখনও পেশাদার হওয়ার ভাবনা ছিল?

আমাদের বেলায় কিন্তু এটা হয়নি। আমরা শুরুতে টুকটাক কাজ করতাম। কারণ তখন পড়াশোনার চাপও আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব ডিপার্টমেন্ট তো অনেক বেশি স্ট্রং, ফলে অন্য কিছু করা যায় না। পড়াশোনা শেষ করে ২০০০ সালের দিকে প্রফেশনালি অভিনয় শুরু করি। তার আগে এমন ভাবনাই ছিল না।

এখন তো ছোটপর্দায় আপনাকে কম দেখা যাচ্ছে।

এখন আগের চেয়ে কাজ অনেক কম করছি। নিয়মিত থিয়েটার করছি। এর পাশাপাশি একটি অর্গানাইজেশনে চাকরি করছি। সে কারণে কাজ কমাতে হয়েছে। সামনে কিছু কাজ করব, সে জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছি। কারণ অফিসের বাইরে সময় বের করে কাজ করতে হচ্ছে। কাজ কমানোর আরো একটা বড় কারণ আমাদের সব কিছু উত্তরা বেইজড। ওখান থেকে শিল্পকলায় এসে রিহার্সেল করা আমার জন্য ভেরি ডিফিকাল্ট।

আগে তো মঞ্চ ও টিভি- দুই মাধ্যমেই পাশাপাশি কাজ করেছেন।

আগে কিন্তু আমরা পেরেছি। অদ্ভুত ব্যাপার, আগে সব ডিরেক্টর রিহার্সেলের জন্য ছেড়ে দিয়েছেন। এখন কোনো ডিরেক্টর রিহার্সেলের জন্য ছাড়তে বললে ছাড়বেন আপনাকে? এটা অসম্ভব। রিহার্সেল! শোয়ের জন্যই ছাড়বেন না। থিয়েটার আমাদের কাছে সব সময় সুপার প্রায়োরিটি ছিল। আমরা শোয়ের দিন কখনো তিনটার পরে কাজ করিনি। ওই দিন আমরা শুটিং রাখিইনি। কিন্তু আমি যখন করেছি শোয়ের দিন শুটিং বাধ্য হয়ে তখন আমার ডিরেক্টর যিনি তিনি বলেছেন ওকে তাড়াতাড়ি ছাড়ো, আজকে শো আছে।

এখনকার টিভি নাটক নিয়ে কী বলবেন?

এই প্রশ্নের তো উত্তর আছে। সেটা আমাদের সবার জানা। সেই জায়গা থেকে স্কিপ করার সুযোগ নেই। আমি বলতে চাই না খুব ভালো কাজ হচ্ছে। আর এভাবেও বলতে চাই না, মানহীন কাজ যেমন হচ্ছে ভালো কাজও হচ্ছে। আমি তো বলব মানহীন কাজের সংখ্যাই বেশি। এমন একটি জায়গায় এসে আত্মতৃপ্তি পাওয়ার খুব একটা কারণ দেখি না। একটা সেক্টরে অদক্ষ লোক ভরে গেলে সেখানে খুব একটা ভালো কাজ আশা করা যায় না। কিছু ভালো কাজের জন্যই হয়তো আমাদের প্রত্যাশা টিকে থাকবে।

এক রাতের মধ্যে লাখ টাকায় নাটক তৈরি হচ্ছে। কীভাবে দেখছেন? 

আপনি তো লাখ টাকার কথা বলছেন। আমি তো নিশ্চিত, ৫০ হাজার টাকা দিয়েও নাটক বানানো যাবে। কালকেই করা সম্ভব। এর কারণ সব কিছুতেই স্বেচ্ছাচারিতা। সবার আগে নীতিমালা থাকতে হবে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। কিন্তু সেসবের বালাই নেই।

চলচ্চিত্রেও আপনাকে দেখা যাচ্ছে না।

আমি চার-পাঁচটা ছবি করেছি। সেটা কিন্তু এমন বেশি কাজ নয়। আমি যতটুকু সুযোগ পেয়েছি ততটুকুই কাজে লাগাবার চেষ্টা করেছি। আমি করিনি এটা বলা ভীষণ অন্যায় হবে। আমি বেশিরভাগই মুক্তিযুদ্ধ এবং অনুদানে নির্মিত ছবিতে কাজ করেছি। ওনারা ডেকেছেন আমাকে। আমি ওইটুকু সুযোগই পেয়েছি। আর এর ওপর আমার কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নেই। আমি চাইলেই তো যুক্ত হতে পারব বিষয়টা ঠিক তেমনও নয়। সেই সিনেমাটিতে আমার ক্যারেক্টার প্লে করার মতো স্কোপও থাকতে হবে। 

এই সময়ের ঢাকার ফিল্মকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আপনাকে যদি বলা হয় আপনার পছন্দের ডিরেক্টর কে? আপনি হয়তো বলবেন ঋত্বিক ঘটক। করণ জোহরের কথা তো আর বলবেন না। অনেকেই বলবেন করণ জোহর। তাহলে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা কি যোগ করেছিল ছবির আন্দোলনে! এই সময়ের ছবিগুলো ছবির আন্দোলনে কিছু যোগ করতে পারবে? আমার মনে হয় কিছুই যোগ করবে না।

কিছু সিনেমায় হল হাউজফুল হচ্ছে?

দর্শক হলে আনাই কি ছবির মূল উদ্দেশ্য? ‘ঢাকা অ্যাটাক’ তো খুব পপুলার ছবি। আমার বেশ ভালো লেগেছে। আমি ওরকম ছবি দেখি। ঢাকা অ্যাটাক কি ছবির আন্দোলনে কোনো ভূমিকা রাখে? তা তো না। একটা আইটেম গান থাকবে, এটা থাকবে, ওটা থাকবে। তাই যদি হয়ে থাকে জনপ্রিয়তা বা ভালো সিনেমার মাপকাঠি, তাহলে এই সময়ের ছবি আমাদের চলচ্চিত্রে নতুন কি যোগ করছে? মানুষ হলে গিয়ে ছবি দেখছেন সেটাই নাকি তাদের কাছে খুব দারুণ ব্যাপার। কিন্তু এই সময়ের ছবি ১০-২০ বছর পরে কেবল হলে যাওয়ার জন্য কিছু যোগ করবে সেটা আমার মনে হয় না। এই ছবিগুলোতে আমাদের সংস্কৃতির কোনো ভাবনার খোরাক আছে তাও মনে হয় না। আমি বলছি না এমন ছবির দরকার নেই। এই ছবিটা যেমন হতে হবে, অন্যরকম আরেকটা ছবিও হতে হবে।

সেটা কেমন?

সেক্ষেত্রে আমি মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ডুব’ ছবির কথা বলব। এমন ছবি আমরা খুব একটা দেখতে পাচ্ছি না। অথচ এই ধরনের ছবিও আমরা দেখতে চাই। ‘ডুব’ আমার খুব পছন্দের ছবি। আমার ভালো লেগেছে ছবিটা। কারণ এত ভালো ছবি, সাইলেন্ট ট্রিটমেন্টের ছবি আমি বাংলাদেশে এর আগে কখনো দেখিনি। গল্প কাকে নিয়ে সেটা আমার কাছে কোনো ম্যাটার করে না। ছবির আন্দোলনে কিন্তু ‘ডুব’ অনেক ভূমিকা রেখেছে।
 

অন্য প্রসঙ্গে আসি, সামাজিক অনেক বিষয়ে আপনি সক্রিয়।

এটা আমার সামাজিক দায়িত্ব থেকে করি। আমাকে যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন যে, ছাত্র আন্দোলনে আমার ভূমিকা কি? আমি সেখানে দাঁড়াব কি না? আমি দাঁড়াব না। আমি এই শো অফটা চাই না, অন্য সাপোর্ট সিস্টেম তৈরি করার চেষ্টা করব।

এবার শেষ করব। আপনার কাছে অভিনয়ের সংজ্ঞা কী?

আমার কাছে অভিনয় বিষয়টা হলো মানুষের ভেতরে বসবাস করার মতো। আমি বন্যা মির্জা তো একজনই। কিন্তু আমি যখন কোনো চরিত্রে অভিনয় করি আমি পুরোপুরি সেই চরিত্র হতেই চেষ্টা করি। এই যে একজন মানুষ থেকে অন্যজন হয়ে যাওয়া। রূপান্তর, অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে অন্য একজনকে আবিষ্কার করা। জীবনবোধও বটে। এই পুরো বিষয়টাই আমার কাছে অভিনয়। আমি আদতে যা নই অভিনয় করতে গেলে আমি সেটাই। আমার কাছে অভিনয় বিষয়টা এমন।

আপনাকে ধন্যবাদ।

আপনাকে এবং ঢাকাটাইমস পরিবারকেও ধন্যবাদ।  

(ঢাকাটাইমস/৪সেপ্টেম্বর/এজেড)                                                                                                  

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিনোদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
Close