বৈশ্বিক উষ্ণায়নে শীতের দেশেও দাবদাহ

মোহাম্মদ জমির
 | প্রকাশিত : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:৩৫

শীতপ্রধান দেশগুলোয় গরমকাল আসে আনন্দের বারতা নিয়ে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি বদলে গেছে। তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বিপর্যস্ত করেছে ইউরোপের জনজীবনকে। কর্মজীবন, জনস্বাস্থ্য, ফসল উৎপাদনসহ নানা ক্ষেত্রে প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতার। অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হওয়ার ভয়ে আছেন কৃষক। চলতি বছরে ইউরোপে গরমের সময়টা আসলেই ভালো যায়নি। অস্বাভাবিক গরমে কষ্ট করতে হয়েছে জনসাধারণকে। তাপমাত্রার ক্রমশ বৃদ্ধি প্রভাব ফেলছে বিশ্বজুড়েই। দেখা দিচ্ছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। কমে যাচ্ছে ফসল উৎপাদন, সেই সঙ্গে ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির এ প্রভাব আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের।

অন্যদিকে এবার রেকর্ড পরিমাণ গরম পড়েছিল কোরিয়া ও জাপানেও। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, জাপানে মে মাস থেকে গরম পড়তে শুরু করে। জুলাই মাসে দেশটিতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড হয়। অবস্থা এমন অবস্থায় পৌঁছায় যেখানে প্রশাসন থেকে জনগণকে সতর্ক করে নিরাপদ অবস্থানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। বেশ কিছুদিন জাপানে তীব্র দাবদাহ বিরাজ করে। এতে বহু মানুষের মৃত্যুও হয়েছে। সেই সময় বিবিসি জানায়, ২৩ জুলাই রাজধানী টোকিওর নিকটবর্তী কুমাগায়া শহরের তাপমাত্রা ৪১ দশমিক এক ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছে। এতে ২০১৩ সালে হওয়া ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পূর্ববর্তী জাতীয় রেকর্ড ভেঙে গেছে। তখন দেশটির এক ডজনেরও বেশি শহরে প্রায় ৪০ সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করে। লোকজনকে তখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্থানে অবস্থান করার পরামর্শ দেয় জাপানের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা; পাশাপাশি পানি পান করতে ও উষ্ণতাজনিত অবসাদ প্রতিরোধে বিশ্রাম নেওয়ার আহŸান জানিয়েছে। দেশটির আবহাওয়া সংস্থা জানায়, ‘যেসব এলাকায় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি বা তারও বেশি সেসব এলাকার বাসিন্দাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকা উচিত। এর চেয়ে কম তাপমাত্রার এলাকায়ও বিরাজমান উষ্ণতা শিশু ও বয়স্কদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।’

এবারের গ্রীষ্মে উষ্ণতাজনিত কারণে অসুস্থ ১০ হাজারেরও বেশি লোককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জাপানের বার্তা সংস্থা কিয়োদো। তীব্র দাবদাহে হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে সেখানে এর মধ্যে অন্তত ১১৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, এর আগে ২০১৩ সালের আগস্টে জাপানে পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকা কোচিতে রেকর্ড হওয়া ৪১ সেলসিয়াসই ছিল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।

জাপানের প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসেও এবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছে। ১ আগস্ট দেশটির খাংউওন প্রদেশের হোংছন এলাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে ১৯৪২ সালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ছিল দেগুতে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানী সিউলে গত ১১১ বছরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১ আগস্ট ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৩০ দশমিক তিন, যা ১৯০৭ সালের পর সর্বোচ্চ ৩৮ দশমিক চার। ফলে প্রচণ্ড গরমে সেখানকার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অন্তত ২৯ জনের মৃত্যু হয়। গরম থেকে সতর্ক থাকার জন্য জনগণের কাছে বিভিন্নভাবে সচেতনতামূলক প্রচার প্রচারণা চালিয়ে আসছে সরকার। মোবাইলবার্তা পাঠিয়েও প্রশাসন সতর্কবাণী পৌঁছে দেয়। দেশটির প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন এ দাবদাহকে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে আখ্যা দেন। আবহাওয়ার প্রভাব মোকাবেলায় সরকার শহর ও প্রাদেশিক প্রশাসনগুলোর জন্য ৬০০ কোটি উওন (৫৩ লাখ ডলার) বরাদ্দ দেয়।

জলবায়ুর পরিবর্তন গত কয়েক বছরেরই আলোচিত বিষয়। যদিও বিজ্ঞানীরা মনে করেন, জলবায়ুর সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। কারণ তা এক জটিল সমীকরণ। নিশ্চিত হতে আরো অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। তবে বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার যে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে, তাতে আশঙ্কা দিন দিন বাস্তব রূপ পাচ্ছে। কয়েক দশক ধরেই বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার চরমভাবাপন্ন রূপ লক্ষ করা যাচ্ছে। চলতি বছরও অতীতের রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার তোপে পড়ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। যুক্তরাজ্যের ৫০ বছরের ইতিহাসে দিন কয়েক আগেই সর্বোচ্চ ডিগ্রির তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। জুলাই মাসে কানাডার কিউবেকে দাবদাহে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৯০ জনের। গত কয়েক দশকে কিউবেকে এটাই ছিল সবচেয়ে তীব্র দাবদাহ। গ্রিসে ভয়াবহ দাবানলে ৯১ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানলে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। মে মাসের শুরুতে পাকিস্তানের করাচিতে হিটস্ট্রোকে ৬৫ জনের মৃত্যু হয়। ইউরোপে এমনিতেই গরমের সময়টা অনেক বেশি আনন্দের। কিন্তু এবার যেন ছন্দপতন হয়েছে। গোটা ইউরোপে প্রখর দাবদাহে কোথাও খরার আশঙ্কা, কোথাও হিটস্ট্রোকে মৃত্যুর ঘটনা, কোথাও আবার হিমবাহ গলে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। আসল কথা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অস্বাভাবিক গরমে পুড়ছে বিশ্ব। এ বছর তার সাক্ষী হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং এশিয়ার মানুষ। ইউরোপের অনেক দেশ এখন খরার কবলে। অন্যদিকে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রায় দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ দুটি দেশের কথা আগেই আলোচনা করেছি।

তথ্য-উপাত্তে দেখা যাচ্ছে, গত আড়াই শ বছরের তাপমাত্রার সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে চলতি গ্রীষ্ম। বিজ্ঞানীরা এই মর্মে সতর্ক করছেন যে, পৃথিবীর তাপমাত্রা যদি এভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে এর ভ‚-স্তর ‘হটহাউসে’ পরিণত হবে। বিশেষ করে প্রাক-শিল্পস্তরে যদি তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে বাড়ে, তাহলে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে এই নীলগ্রহ। সম্প্রতি গবেষকরা এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এর মধ্যেই পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। আর প্রতি দশকে তাপমাত্রা শূন্য দশমিক এক-সাত ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পৃথিবীর আবহাওয়ার পরিবর্তন, সমুদ্র স্রোতের পরিবর্তন, মেরু তুষারপাত, সাগরের বরফ গলার পরিবর্তন, ভ‚মিক্ষয় এবং উদ্ভিদের বিকাশ ও বিনাশের মধ্যে যে এক বার্ষিক চক্র কাজ করছে, এর কারণেই পৃথিবী বদলে যেতে থাকে। এই পরিবর্তন প্রক্রিয়ার কারণেই আমরা সারা বিশ্বে চরম আবহাওয়ার সামনে পড়ছি।

এতদিন শীতপ্রধান শহর হিসেবে পরিচিতি ছিল ফিনল্যান্ডের রোভানিইমি। তবে এবার রুদ্ররূপ ধারণ করেছে এখানকার তাপমাত্রা, পারদ চড়েছে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই রকম তাপমাত্রা সুইডেনেও। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় গ্রিস থেকে সুইডেন পর্যন্ত খরা ও দাবানলের আশঙ্কা আবহাওয়া বিভাগের। স্পেনে ও পর্তুগালেও তাপমাত্রা রেকর্ড ছাড়িয়েছে। আগস্টের প্রথমদিকে স্পেনের ৫০টি প্রদেশের ৪০টিরই তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে পর্তুগালের বেশকিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। গেল আগস্ট মাসেই ব্রিটিশদের দাবদাহকবলিত এলাকা সফরে সতর্ক করে যুক্তরাজ্য।

চলতি বছরে গ্রীষ্মকালীন খরার কারণে ফসল উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে যুক্তরাজ্যে। দেশটির জাতীয় কৃষক ইউনিয়ন এ অবস্থাটিকে শুষ্ক খড়কুটার বাক্সের সঙ্গেই তুলনা করেছেন। গণমাধ্যম যুক্তরাজ্যের দাবদাহে আক্রান্ত মানুষের সাক্ষাৎকার নেয়। তারা তখন জানায়, গরম সহ্য করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। রাতেও ভয়ংকর সময় পার করতে হচ্ছে। রাতে এসি চালু না করে কোনোভাবেই ঘুমাতে পারছেন না। তাদের মত হচ্ছে, এই তাপমাত্রা স্বাভাবিক না। এ গরম বেশি দিনের পর আবহাওয়া স্বাভাবিক হবে। শীতপ্রধান দেশে গরমের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া খুব কঠিন।

তীব্র গরমে চরম ভোগান্তিতে পড়ে জার্মানির মানুষ। অস্বাভাবিক তাপমাত্রায় হুমকির মুখে পড়ে অন্যান্য প্রাণীকূল। গরমে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় হামবুর্গের আলস্টার নদীর সব মাছ মারা যায়। দাবদাহের কারণে ফ্রান্সের হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে বেড়ে যায় রোগীর সংখ্যা। ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় ৪টি নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ।

পৃথিবীর ভৌগোলিক ইতিহাসে জলবায়ুর পরিবর্তন অতি স্বাভাবিক এক প্রাকৃতিক ঘটনা। প্রাকৃতিক কারণেই লাখ লাখ বছরের ব্যবধানে পর্যায়ক্রমে বরফ যুগ ও উষ্ণযুগ এসেছে। তবে এখন আমরা এমন এক নতুন ভূতাত্ত্বিক যুগে যাচ্ছি যেখানে এই গ্রহের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে মানুষ সরাসরি ভ‚মিকা রাখছে। সেই ভ‚মিকা যাতে সহনীয় হয়, সেদিকে মানুষকেই কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আবহাওয়ার এই চরমভাবাপন্ন রূপ এমনই এক অশনি সংকেত; যাকে বিশ্বের জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য অতি বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। মানুষও কিন্তু এর বাইরে নয়।

তবে আশার দিক হচ্ছে তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি প্রতিরোধে নানা উদ্যোগ আছে বেশ কয়েক বছর ধরে। বৈশি^ক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে কাজও হচ্ছে। কিন্তু তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ২০১৫ সালে যে ‘প্যারিস চুক্তি’ হয়েছিল গত বছর তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি তখন বলেন, এটি এমন একটি চুক্তি যার কারণে আমেরিকা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কিন্তু লাভবান হবে অন্য দেশ। এমন চুক্তি তিনি চান যা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরো বেশি ‘ন্যায্য’। আমরা জানি, প্যারিস চুক্তিতে আমেরিকাসহ আরো ১৮৭টি দেশ মিলে অঙ্গীকার করেছিল যে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মাত্রা তারা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম রাখবে; এমনকি দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি নামিয়ে আনত চেষ্টা করবে। যুক্তরাষ্ট্রের কারণে এই শুভ উদ্যোগ অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়েছে। অন্যান্য দেশ অবশ্য পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

এদিকে সাম্প্রতিক এক গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, প্যারিস চুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়ন হলেও বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। এই সতর্ক সংকেত দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, এটা হলে নিউইয়র্ক ও সিডনির মতো উপক‚লীয় অনেক শহর-দ্বীপে আর মানুষের বসতি থাকবে না। জার্মানি, সুইডেন, ডেনমার্ক ও অস্ট্রেলিয়ার একদল বিজ্ঞানীর একটি যৌথ গবেষণায় হতাশাজনক এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তারা বলেছেন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্য অর্জন হলে এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তন বিপর্যয়কর পর্যায়ে চলে যেতে পারে। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও সুইডিশ রিসার্চ ইনস্টিটিউট স্টকহোম রেজিলিয়েন্স সেন্টারের জলবায়ু গবেষক উইল স্টেফেন এই গবেষক প্রতিবেদনের লিড অথোর। তিনি বলেন, “মানুষ যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করে সেটাই পৃথিবীর তাপমাত্রার মূল নিয়ামক নয়। আমাদের গবেষণা বলছে, মানবসৃষ্ট কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে তা পৃথিবীর অন্যান্য ব্যবস্থায়ও প্রভাব ফেলবে, যাকে ‘ফিডব্যাক’ বলা হয়। এটা আরও উষ্ণতা তৈরি করতে পারে, এমনকি আমরা গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ বন্ধ করলেও তা হতে পারে।’’

এ ঘটনায় বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দীর্ঘমেয়াদে প্রাক-শিল্পযুগের চেয়ে ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে বলে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, উষ্ণতা এভাবে বাড়লে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা ১০ থেকে ৬০ মিটার বাড়বে। ভেনিস, নিউইয়র্ক, টোকিও ও সিডনির মতো উপক‚লীয় অনেক শহর প্লাবিত হবে। এ ধরনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ শহরে আর মানুষের বসবাস থাকবে না। বিজ্ঞানীরা একে ‘হটহাউস আর্থ’ ক্লাইমেট সিনারিও বলছেন। সম্প্রতি প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস বা পিএনএএসে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বৈষ্ণিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি বৃদ্ধিতে ক্লাইমেট সিস্টেম কেমন হবে তা বেশ কয়েকটি মডেলে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হিমবাহের গলন, হিমৈশল গলে যাওয়া, সমুদ্রে ব্যাকটেরিয়া ও কার্বন সিংক দুর্বল হয়ে পড়ার মধ্যে সম্পর্ক ও চেইন রিঅ্যাকশন দেখা গেছে। ফিডব্যাক প্রক্রিয়া হিসেবে জলবায়ুর পরিবর্তন, বনের ওপর প্রভাব ও হিমৈশলের গলনে তাতে বিদ্যমান কার্বন ডাই-অক্সাইড ও মিথেনের মতো গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ ঘটে তা পরিবেশের অন্য ‘শত্রুদের’ ওপর প্রভাব ফেলে। এতে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিভিন্ন উপাদানে সংরক্ষিত কার্বন নিঃসরণ ঘটে তা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে।

ফিডব্যাক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তুষারপাত, বজ্রঝড় হয়ে থাকে বলে জানান স্টকহোম রেজিলিয়েন্স সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক জোহান রকস্ট্রম। তিনি বলেন, ‘এ সব টিপিং এলিমেন্ট সারিবদ্ধ ডোমিনোর মতো আচরণ করে। একবার কোনোটা দুর্বল হলে সেটা পৃথিবীর সিস্টেমের আরেকটিকে আঘাত করে। সব ডোমিনোকে ধসের হাত থেকে রক্ষা করা খুব কঠিন বা অসম্ভব হয়ে ওঠে।’ এরপর পৃথিবী ক্রমশ বাড়তে থাকা তাপমাত্রায় উষ্ণ হতে থাকে। এমনকি মানুষ পুরোপুরি গ্রিন হাউস নিঃসরণ বন্ধ করলেও তা হতে থাকবে। ‘যদি হটহাউস আর্থ বাস্তবে হয়, তাহলে পৃথিবীর অনেক জায়গা বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে’- বলেন রকস্ট্রম।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষিত হলেই কেবল পৃথিবী মানুষের থাকবে। তার জন্য বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা প্রয়োজন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানোর বিষয়টি ক্ষমতা, অর্থ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। সে কারণে এ নিয়ে রাজনীতির সর্বস্তরে আলোচনা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। তখন একে কাগুজে চুক্তি থেকে বাস্তবায়নের পথে নেওয়া যাবে। সবাই মিলে কাজ করলে মানুষের জন্য পৃথিবী নামক গ্রহের সুরক্ষা অবশ্যই সম্ভব। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই এটা করতে হবে।

মোহাম্মদ জমির: সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং প্রধান তথ্য কমিশনার

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত