‘খোদাকে ওয়াস্তে হামে বাংলাদেশ বানা দো’

প্রভাষ আমিন
 | প্রকাশিত : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১২:০৬

পাকিস্তানের রাজনীতি একদলীয়। এই দলের নাম আইএসআই। তবে পেছনে থেকে আইএসআই দুই দল নিয়ে খেলত- মুসলিম লীগ আর পাকিস্তান পিপলস পার্টি। এই দ্বিদলীয় ধারা ভাঙবে, এমন কথা কেউ ভাবেনি, আমার ধারণা ইমরান খান নিজেও নন। রাজনীতি শুরুর সময় ইমরান নিশ্চয়ই নিজেও ভাবেননি, ক্রিকেট মাঠের মতো রাজনীতিতেও তিনি ছক্কা হাঁকাবেন, একেবারে প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাবেন। অবিশ্বাস্য হলেও সেটি ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারটি যতটা ভাবা হয়, ততটা আরামদায়ক নয়; অন্তত এ মুহূর্তে পাকিস্তানে তো নয়ই।

ইমরান খানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পাকিস্তানের নুয়ে পড়া অর্থনীতিকে চাঙা করা। দায়িত্ব নিয়েই খরচ কমাতে তিনি কিছু চটকদার সিদ্ধান্ত নেন। প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত বাসভবনে না থেকে তুলনামূলক ছোট বাসায় থাকছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের জন্য বিলাসবহুল ও বুলেটপ্রুফ গাড়ি ব্যবহার করছেন না, বহরের গাড়ি কমিয়ে এনেছেন, বাড়তি গাড়ি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লোকবল কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, মন্ত্রীদের বিমানে প্রথম শ্রেণিতে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করেছেন, মন্ত্রিসভার বৈঠকে আপ্যায়ন করছেন চা-বিস্কুট দিয়ে। এসব সিদ্ধান্তে প্রচুর হাততালি কুড়িয়েছেন। কিন্তু এসবই আসলে সামনে দিয়ে উড়ে যাওয়া মশা। ধরতে হবে পেছন দিয়ে যাওয়া দুর্নীতির হাতিটাকে। এসব মশা মেরে হাত নষ্ট হবে, কিন্তু গভীর খাদে পড়া অর্থনীতিকে টেনে তোলা যাবে না। তবে ইমরান খান যে আগাপাশতলা ভণ্ড, তা প্রমাণ করতে বেশি সময় নেননি। গাড়িতে নয়, তিনি ১৫ কিলোমিটার দূরের অফিসে যান হেলিকপ্টারে চড়ে। গাড়ি থেকে নামিয়া মর্দ উড়িয়া চলিল।

অর্থনীতিকে টেনে তোলা তো আছেই, ইমরান খানের সামনে আরো বড় চ্যালেঞ্জ দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা। ধার-দেনা করে অর্থনীতি হয়তো সামাল দেয়া যাবে, কিন্তু ভাবমূর্তি তো আর ধার করে পাওয়া যায় না। সারা বিশ্বে পাকিস্তান মানেই আতঙ্ক, জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষক, ব্যর্থ রাষ্ট্রের উদাহরণ। যুগ যুগ ধরে পাকিস্তানের সব অপকর্মে পাশে থেকেছে যুক্তরাষ্ট্র। লাখ লাখ ডলার দিয়ে গেছে জঙ্গি দমনের জন্য। কিন্তু সেই যুক্তরাষ্ট্রও বুঝে গেছে, পাকিস্তান তাদের চেয়েও বড় ভণ্ড। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থে আইএসআই জঙ্গি দমন নয়, লালন করে আসছে। সীমান্ত এলাকায় আইএসআইয়ের শেল্টারে থেকে জঙ্গিরা আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলা চালায়। তাই এই আত্মঘাতী সামরিক সহায়তা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইতিমধ্যে ৩০ হাজার ডলার আটকে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যে এ ধরনের চরম সিদ্ধান্তে যাচ্ছে, সেটা বোঝা যাচ্ছিল আগেই।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইটারে দেশ চালান, বিশ্ব শাসন করেন। সেই ট্রাম্প টুইটারে লিখেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ১৫ বছর ধরে বোকার মতো পাকিস্তানকে তিন হাজার ৩০০ কোটি ডলার অর্থসহায়তা দিয়েছে। বিনিময়ে তারা আমাদের কিছুই দেয়নি, দিয়েছে প্রতারণা ও মিথ্যাচার। তারা একটি বিষয়ই দিয়েছে, সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল, যার কারণে আমরা আফগানিস্তানে হামলার শিকার হচ্ছি।’ শুরুতেই পুরোনো বন্ধুর এই ধাক্কা ইমরানের কাজ আরো কঠিন করে দেবে নিশ্চয়ই। শুধু মুখের কথা নয়, ইমরানকে সত্যি সত্যি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। কিন্তু এ লড়াই করার ইচ্ছা, সামর্থ্য তার আছে কি না। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে আইএসআইয়ের বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি নিতে হবে ইমরানকে। তেমন হলে তার গদিই উল্টে যেতে পারে।

ক্ষমতা নিয়েই ইমরান পাকিস্তানিদের নানা বাস্তব-অবাস্তব স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। গত সপ্তাহের মন্ত্রিসভার বৈঠকে পাকিস্তানের উন্নয়নে ‘সুইডেন মডেল’ অনুসরণের সিদ্ধান্ত হয়। এ নিয়েই এখন নানা সমালোচনা। সেদিন রাতেই পাকিস্তানের ক্যাপিটাল টিভিতে এক টক শোতে সাংবাদিক জায়গাম খান ক্ষুব্ধ কণ্ঠে সুইডেন নয়, পাকিস্তানকে ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বানিয়ে দেয়ার আকুতি জানিয়েছেন। তবে তিনি এও বলেছেন, তিনি নিজেও জানেন এটা অসম্ভব। আগামী ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় পৌঁছতে পাকিস্তানকে ৯-১০ হারে প্রবৃদ্ধি করতে হবে, যেটা আসলে অসম্ভব। আর পাকিস্তান যখন হাচড়ে-পাচড়ে আমাদের এখনকার অবস্থানে পৌঁছবে, তখন আমরা পৌঁছে যাব আরও ওপরে ধরাছোঁয়ার বাইরে। বাংলাদেশ সারা জীবন পাকিস্তানের আক্ষেপের নাম হয়ে থাকবে। পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে ছয়গুণ বড়। আহা আমরা যদি অত জমি পেতাম, বোমা না ফুটিয়ে ফসল ফলাতাম। তখন খাদ্য রপ্তানি করতে পারতাম। টক শোতে জায়গাম খান পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের এগিয়ে থাকার প্রসঙ্গে টিআইবির দুর্নীতির ধারণা সূচক, শেয়ারবাজার আর রপ্তানির কথা উল্লেখ করেছেন। আমি তাকে এমন আরও অন্তত ৩০টি সূচকের কথা বলতে পারি। আপনি একবার মনে মনে যত সূচক আছে কল্পনা করুন- মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, শিশুমৃত্যুর হার, দারিদ্র্যবিমোচন, ক্ষুধা নিরসন; সবকিছুতে বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। এই পরিসংখ্যান দিয়ে লেখাটিকে ভারাক্রান্ত করতে চাই না। আমার একটু শঙ্কা ছিল ক্রিকেট নিয়ে। এত পুরোনো ক্রিকেট জাতিকে টপকে যাওয়া অত সহজ ছিল না। সেই কঠিন কাজটা মাশরাফি বাহিনী পানির মতো সহজে করে দিয়েছে। দুদিন আগে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ ফুটবল দলও পাকিস্তানকে হারিয়েছে। কদিন আগে তো বাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা তো পাকিস্তানকে রীতিমতো নাস্তানাবুদ করে দিয়েছিল।

বলছিলাম জায়গাম খানের অসহায় আকুতির কথা। বলতে দ্বিধা নেই জায়গাম খানের এ আকুতি আমার মধ্যে অনির্বচনীয় আনন্দের অনুভ‚তি এনে দিয়েছে। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান স্বাধীন হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রটিই ছিল একটি অবাস্তব কল্পনা। পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল এগারো শ মাইল, মানসিক দূরত্ব ছিল অলঙ্ঘনীয়। বর্তমান বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে ২৩ বছর পাকিস্তানের অংশ ছিল। এই ২৩ বছর ছিল শোষণ আর বঞ্চনার। পশ্চিমাদের সব চেষ্টা ছিল বাঙালিদের দাবিয়ে রাখার। কিন্তু দাবিয়ে রাখতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রাম আর ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে বিজয় অর্জিত হয়।

পাকিস্তানিরা সব সময় বাঙালিদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করত, বলত ভূখা-নাঙ্গা। একাত্তরে লজ্জাজনক আত্মসমর্পণের পরও পাকিস্তানের ধারণা ছিল বাংলাদেশ টিকবে না, ভারতের সঙ্গে মিশে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু শকুনের দোয়ায় গরু মরে না। বরং হয়েছে উল্টো। বাংলাদেশ ক্রমাগত এগিয়েছে। আর পাকিস্তান ক্রমাগত পিছিয়েছে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল আর পাকিস্তান প্রায় ব্যর্থ রাষ্ট্র। যারা ২৩ বছর ধরে নির্যাতন, শোষণ আর বঞ্চনায় আমাদের দাবিয়ে রাখতে চেয়েছিল; তারা এখন বাংলাদেশের মতো হতে চায়, তবে তারাও জানে এটা এখন আর সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ভারতের অংশ তো হয়ইনি, বরং কোনো কোনো সূচকে বাংলাদেশ ভারত থেকেও এগিয়ে।

৪৭ বছর পরও বাংলাদেশে দুই ধরনের আটকেপড়া পাকিস্তানি দেখা যায়। শারীরিকভাবে আটকেপড়া পাকিস্তানিরা বিভিন্ন ক্যাম্পে থাকে। আর মানসিকভাবে আটকেপড়া পাকিস্তানিরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে দেশজুড়ে। পাকিস্তানে কিছু হলেই তাদের আহা উহুর জ্বালায় টেকা দায়। ইমরান খান যদি এই দুই ধরনের আটকেপড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নিতেন, তাহলে আমরা একটু স্বস্তি পেতাম, বাংলাদেশের উন্নয়ন আরো বেগবান হতো।

জায়গাম খানের বক্তব্য শুনতে শুনতে আনন্দে আমি হেসেছি, বেদনায় কেঁদেছি। আনন্দের কারণ তো আগেই বলেছি। বেদনার কথা বলি এবার। যতবার পাকিস্তানের পরাজয় দেখি, ব্যর্থতা দেখি, বোমা ফাটতে দেখি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধায়, কৃতজ্ঞতায় আমার মাথা নুয়ে আসে। মুক্তিযোদ্ধারা জীবনের মায়া না করে যুদ্ধ করেছেন বলে, ত্রিশ লাখ মানুষ অকাতরে প্রাণ দিয়েছে বলেই আজ আমরা স্বাধীন। ৪৭ বছর আগেই যে আমরা ব্যর্থ রাষ্ট্র থেকে আলাদা হতে পেরেছি, সে জন্যই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমার শর্তহীন কৃতজ্ঞতা, অন্তহীন শ্রদ্ধা।

প্রভাষ আমিন: বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত