রাজবাড়ীতে ফের পদ্মায় ভাঙন, ঝুঁকিতে শহর রক্ষা বাঁধ

রাজবাড়ী প্রতিনিধি, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২০:৩১

পদ্মায় পানি বাড়ার ফলে আবারো রাজবাড়ী সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া, দেবগ্রাম ও ছোটভাকলা ইউনিয়নের পদ্মা নদীর তীরবর্তী এলাকায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। তিন সপ্তাহ ধরে অতিমাত্রায় ভাঙনে মানুষের মাঝে হাহাকার দেখা দিয়েছে।

রাজবাড়ীতে দুই সপ্তাহ ধরেই ভাঙছে পদ্মার তীর সংরক্ষণ বাঁধ। সদর উপজেলার গোদার বাজারে নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে সোমবার রাত থেকে। এ সময় পদ্মার তীব্র স্রোত ও ঘূর্ণিতে নিমিষে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় শহররক্ষা বাধের স্থায়ী তীর সংরক্ষণ বাঁধে প্রায় ২০০ মিটার এলাকা। একই সঙ্গে বিলীন হয় ৩০টি বসতবাড়ি। এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে শতাধিক বসতবাড়ি, দুইটি স্কুল, মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

ভাঙনকবলিত স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, পাউবো কর্মকর্তাদের বারবার বলা সত্ত্বেও তারা কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না। সকাল থেকে দুটি ট্রলারে বালি এনে বস্তায় ভরছে। কিন্তু যেখানে ভাঙন, সেখানে বস্তা ফেলছে না। তাছাড়া তাদের কাজের গতিও খুব ধীর। অথচ ভাঙন আতঙ্কে তাদের ঘুম হচ্ছে না। ঘরবাড়ি, গাছপালা সব ভেঙে যাচ্ছে। যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। এভাবে চলতে থাকলে শত শত বসতবাড়িসহ বিদ্যালয়, মসজিদ নদীগর্ভে চলে যাবে। এমনকি রাজবাড়ী শহররক্ষা বাঁধও রক্ষা পাবে না।

রাজবাড়ীর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কার্যালয়ের তথ্য মতে, ৮৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে সদর উপজেলার গোদার বাজার থেকে বোতলা স্লুইস গেট পর্যন্ত পদ্মার তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়। রাজবাড়ী শহররক্ষা বাঁধ (ফেজ-১) প্রকল্পের আওতায় ২ দশমিক ২৪ কিলোমিটার এলাকায় সম্পন্ন করা হয় পদ্মার তীর সংরক্ষণের কাজ। গত দুই সপ্তাহে এ আড়াই কিলোমিটারে পাঁচবার ভাঙন দেখা দেয়। এ অবস্থায় শহররক্ষা বাঁধটি মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি রক্ষায় আপাতত জরুরি ভিত্তিতে বালির বস্তা ফেলা হচ্ছে। দুই সপ্তাহে ওই পাঁচ এলাকায় ১০ হাজার বালুর বস্তা ফেলা হয়েছে বলে জানায় পাউবো কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার গোদার বাজার এলাকায় সরজমিন দেখা গেছে, ভাঙন আতঙ্কে দিশেহারা স্থানীয়রা। সবাই যার যার ঘরের আসবাবপত্র সরাতে ব্যস্ত।

স্থানীয় বাসিন্দা মালেক মণ্ডল জানান, চোখের সামনেই তার বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। দুই সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন শহররক্ষা বাঁধে। এখন বাঁধটিও ঝুঁকির মুখে। এটি ভেঙে গেলে তাদের আশ্রয়ের আর জায়গা থাকবে না।

রাজবাড়ীর ধুঞ্চি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দোলনা সুলতানা জানান, ভাঙনের কারণে বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আপাতত পাশের গোদার বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ বিদ্যালয়ের আসবাব রাখা হয়েছে।

পদ্মায় বিলীন হতে বসেছে বাবা-মায়ের কবর। শেষবারের মতো জিয়ারত করছেন মো. ইউনুস আলী শেখ। ভাঙনের খবর শুনে ছুটে এসেছেন ব্যবসায়ী মো. ইউনুস আলী শেখ। তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন গোয়ালন্দে। এসেই দ্রুত বাবা-মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে জিয়ারত করলেন। জিয়ারত শেষে বলেন, ‘বড় ভাই, চাচারা সবাই এখানে থাকতেন। নদীতে ভাঙনের খবর পেয়ে ছুটে এসেছি। মনে হয়ে আজকের মধ্যে সব নদীতে যাবে। বাবা-মায়ের কবর হয়তো আর জিয়ারত করতে পারব না। তাই শেষবারের মতো কবর জিয়ারত করতে এলাম।’

ইউনুস আলীর মতো এমন হাহাকারের গল্প এখন ওই এলাকাজুড়ে। আরেক ব্যবসায়ী ভাঙনের হাত থেকে আসবাবপত্র বাঁচাতে বসতবাড়ি ফাঁকা করেছেন। কিন্তু ভিটায় থাকা অর্ধশত গাছ কী করবেন? রাতারাতি তো কিছু করা সম্ভব না। তাই নামমাত্র মূল্যে লাখ খানেক টাকায় বিক্রি করে দিলেন গাছগুলো।

একই এলাকার বাসিন্দা জয়নাল মণ্ডল জানান, রবিবার রাত ১টার দিকে বিকট শব্দে ভাঙন শুরু হয়। ঘুম থেকে উঠে দেখেন তার ঘরের পেছনের বাঁশঝাড়টি আর নেই। নদীর অবস্থান মূল ঘর থেকে মাত্র ১০ হাত দূরে। ওই অবস্থায়ই ঘর ভেঙে জিনিসপত্র নিয়ে শহররক্ষা বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন।

ভাঙন পরিস্থিতি নিয়ে কথা হলে পাউবো রাজবাড়ীর নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকাশ কৃষ্ণ সরকার বলেন, রাজবাড়ীর নদীপথের ৮৫ কিলোমিটারের মধ্যে ২৩ কিলোমিটার পাউবোর আওতাভুক্ত। এর মধ্যে ১৯টি পয়েন্টে ভাঙন চলছে। গত দুই সপ্তাহে রাজবাড়ী সদর, গোয়ালন্দ ও কালুখালী উপজেলায় অন্তত পাঁচ হাজার বিঘা ফসলি জমি ও অসংখ্য বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে শহররক্ষা বাঁধের গোদার বাজার অংশ। এ নিয়ে আমরা নিজেরাও চিন্তিত। আপাতত বালির বস্তা ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া, দেবগ্রাম ও ছোটভাকলা ইউনিয়নের পদ্মা নদীর তীরবর্তী এলাকায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। তিন সপ্তাহ ধরে অতিমাত্রায় ভাঙনে মানুষের মাঝে হাহাকার দেখা দিয়েছে। দেবগ্রাম ও ছোটভাকলা ইউনিয়নের পর দৌলতদিয়ায় ব্যাপক আকারে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় লোকজনের মতে, গত দুই সপ্তাহে প্রায় ৪০০ পরিবারের বসতভিটা পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। ঘর হারিয়ে মানবেতরভাবে জীবন যাপন করছে লোকজন।

এছাড়া ঝুঁকিতে বসবাস করছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবার।

মঙ্গলবার দৌলতদিয়ার ঢলাপাড়া গ্রামে দেখা যায়, পদ্মার পাড়ে ঢলাপাড়া জামে মসজিদের কিছু অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয় লোকজন আশঙ্কা করছেন, আজকের মধ্যে পুরো মসজিদটি নদীগর্ভে চলে যাবে। আগের দিন সোমবার মসজিদ থেকে কয়েক গজ দূরেই ছিল ঢলাপাড়া মাজার শরিফ। গতকাল সন্ধ্যার পর সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়। ওই মসজিদের অদূরে এই প্রতিবেদকের পৈত্রিক বসতবাড়ি ছিল।যা দুই বছর আগেই নদী ভাঙনে বিলীন হয়েছে। অনেকে তাদের বাড়িঘর দ্রুত সরিয়ে ফেলছেন। নদীর কাছে অধিকাংশ বসতভিটা শূন্য পড়ে আছে।

দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মন্ডল বলেন, এক মাস ধরে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। দুই সপ্তাহ ধরে ব্যাপক ভাঙন শুরু হওয়ায় ২ নম্বর ওয়ার্ড ঢলাপাড়া, ৩ নম্বর ওয়ার্ড আফছের শেখেরপাড়া ও লালু মন্ডলপাড়ার প্রায় ৩০০ পরিবারের বসতভিটা বিলীন হয়েছে। চলতি সপ্তাহে ১০০ পরিবার ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে অন্যত্র গেছে। প্রতিদিন অনেক পরিবার সরে যাচ্ছে। এছাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্তার মেম্বারপাড়া, সিদ্দিক কাজীপাড়া ও মজিদ শেখেরপাড়ার প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবার ভাঙনের আতঙ্কে রয়েছে। তিনি জানান, ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী এবং জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবু নাসার উদ্দিন বলেন, দৌলতদিয়ায় বন্যা ও নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ১ হাজার ৭০০ পরিবারের তালিকা পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে জিআরের চাল ও শুকনা খাবার বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

(ঢাকাটাইমস/১৮সেপ্টেম্বর/প্রতিনিধি/এলএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত