‘স্যারের জন্য প্রতি রাতে এখনো কাঁদি’

শহিদুল ইসলাম শ্যামল, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৪:৩৫ | প্রকাশিত : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৬:৪৩

‘আজ ছয় বছরের বেশি হয়ে গেছে স্যার (হুমায়ূন আহমেদ) নেই। কিন্তু একটি দিনের জন্যও স্যারকে ভুলতে পারি না। প্রায় রাতেই তার কথা ভেবে নিরবে কাঁদি’- কথাগুলো বলছিলেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহচর মো. মোশারফ হোসেন। তিনি হুমায়ূন আহমেদের বাগান বাড়ি নুহাশ পল্লীর দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মচারীদের একজন।

গাজীপুর সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের পিরুজালী গ্রামে ৪০ বিঘা জমিতে বিশাল আয়তনের নুহাশ পল্লী। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণের পর থেকেই জনসাধারণের জন্য এই বাড়িটি উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। নুহাশ পল্লীর প্রতিটি বৃক্ষ, ভাস্কর্য, স্থাপনায় লেগে আছে হুমায়ূন আহমেদের স্পর্শ, ভালোবাসা, আন্তরিকতা।

বৃহস্পতিবার আমরা তিন সহকর্মী গিয়েছিলাম নুহাশ পল্লীতে। সেখানে গিয়ে জানা গেল নুহাশ পল্লী তৈরির ইতিহাস ও লেখক হুমায়ূন আহমেদের অনেক স্মৃতি। নুহাশ পল্লীর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ১২ জন কর্মচারী। তাদের মধ্যে একজন মো: মোশারফ হোসেন। তিনি পিরুজালী গ্রামেরই বাসিন্দা।

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আপনার কিভাবে পরিচয় জানতে চাইলে মোশারফ বলেন, ‘১৯৯৬ সালে আমি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন(বিএফডিসি)-তে একটি প্রডাকশন হাউসে কাজ করতাম। প্রতিদিন ২০ টাকা মজুরি পেতাম।’

‘এফডিসিতে একদিন হুমায়ূন স্যারের একটি চলচ্চিত্রের শুটিং চলছিল। স্যার আমাকে ডাক দিয়ে বললেন, এই শোনো, আমাকে এক কাপ চা খাওয়াও। আমি স্যারকে চা এনে দিই। এরপর স্যার আমাকে বললেন, আমাকে তুমি চেন? আমার নাম হুমায়ূন আহমেদ। লেখালেখি করি, সিনেমা বানাই। তুমি আমার সঙ্গে পরে দেখা করো। আমি স্যারের সঙ্গে পরের দিন আবার দেখা করি। স্যার বললেন, তুমি এখন থেকে আমার প্রডাকশনে কাজ শুরু করো। তারপর থেকে আমি স্যারের সঙ্গে কাজ শুরু করে দেই। উনি আমাকে প্রতিদিন ৫০ টাকা দিতেন। এভাবে বেশ কিছু দিন কাজ করি।’

মোশারফ বলেন, ‘অনেক দিন ধরে এফডিসিতে যাওয়া হয় না। স্যার তখন নুহাশ পল্লী কিনে ফেলেছেন। আমি এই গ্রামেরই বাসিন্দা। নুহাশ পল্লীর খুব কাছেই আমার বাড়ি। একদিন আমি মাঠে গরু দিয়ে আসার সময় পথে হুমায়ূন স্যারের সঙ্গে দেখা। তিনি আমাকে দেখেই অবাক হলেন।’

‘স্যার বললেন, এই তুমি না আমার সঙ্গে এফডিসিতে কাজ করতে। হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেলে। আমি বললাম, স্যার আমার বাড়ি তো এখানেই। এফডিসিতে আর যাই না। হুমায়ূন স্যার বললেন, এখন কোথায় থেকে আসলা? স্যার গরু মাঠে দিয়ে আসলাম। শোনো, গরু-টরু বাদ দাও। তুমি আজকে থেকে আমার এখানে কাজ শুরু করে দাও। এখানেই থাকবে। এরপর থেকেই স্যারের সঙ্গে নুহাশ পল্লীতে কাজ শুরু করে দেই।’

        মো: মোশারফ হোসেন

জননন্দিত লেখক হুমায়ূনের আহমেদের সঙ্গে মোশারফ হোসেনের অনেক স্মৃতি। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকা অবস্থায় মাসের ১৫ দিনই তিনি নুহাশ পল্লীতে কাটাতেন বলে জানালেন মোশারফ। কিভাবে নুহাশ পল্লীর খোঁজ পেলেন হুমায়ূন আহমেদ?

মোশারফ জানালেন, ‘অভিনেতা এজাজুল ইসলামের এখানে একটি বাংলো আছে। হুমায়ূন স্যার নাটকের শুটিং করতে মাঝে মধ্যে এখানে আসতেন। পরে তিনি এখানে জমি কেনার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে ১০ বিঘার মতো জমি কেনেন। এরপর তিনজনের কাছ থেকে ৪০ বিঘা জমি কিনে নুহাশ পল্লী বানান তিনি।’

হুমায়ূন আহমেদের কেমন ঘনিষ্ঠ ছিলেন আপনি? জবাবে মোশারফ হোসেন বলেন, ‘এখানে যত কর্মচারী আছে সবার চেয়ে আমিই স্যারের খুব কাছের মানুষ ছিলাম।আমি স্যারের নাটক-সিনেমায়ও অভিনয় করেছি। এখানে আসলে প্রায়ই রাতেই স্যার গানের আসর বসাতেন। আমিও গান গাইতাম। স্যারের সঙ্গে আমি ছায়ার মতো থাকতাম।’

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে মোশারফ বলেন, ‘স্যার এখানে কোনো অনুষ্ঠান হলেই আমাকে সবার সঙ্গে পরিচয় করে দিতেন। তিনি বলতেন, এখানে সবচেয়ে গুণী ও পরিশ্রমী ব্যক্তি হচ্ছে মোশারফ। সে পারে না এমন কোনো কাজ নেই। মোশারফ গান গাইতে পারে, যন্ত্র ছাড়া মুখে সুর তুলতে পারে, অভিনয় পারে। যত পরিশ্রমের কাজ হোক না কেন মোশারফ চেয়ে ভালো কেউ পারে না।’

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আপনার শেষ দেখা কবে? জানতে চাইলে মোশারফ বলেন, ‘২০১২ সালে আমেরিকাতে যাওয়ার আগে একবার নুহাশ পল্লীতে এসেছিলেন স্যার। সবার কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়ে বলছিলেন, তোমরা চিন্তা করো না, আমি আবার ফিরে আসব। চিকিৎসার জন্য আমেরিকার যাচ্ছি। আবার তোমাদের মাঝে ফিরে আসব। স্যার যাওয়ার সময় আমি সবসময় পা ছুঁয়ে ছালাম করতাম। ঐ দিনই তাই করলাম। আমার অজান্তেই চোখের পানি স্যারের পায়ের ওপর পড়ল। স্যার আমাকে বললেন, মোশারফ কেঁদো না। আমি আবার ফিরে আসব। এই যে স্যার গেলেন আর ফিরলেন না। ফিরে এল তার লাশ।’

‘স্যারের মতো এত বড় মাপের মহান মানুষ আমার জীবনে আর দেখি নাই। উনাকে বাবার মতো শ্রদ্ধা করতাম। স্যারের লাশ দাফন করার পর টানা ৪০ রাত পাহারা দিয়েছিলাম। আমাকে কেউ বলে দেয়নি। শুধু ভালোবাসা, আন্তরিকতার কারণেই করেছিলাম। আজ ছয় বছর পেরিয়ে গেছে স্যার নেই। মাঝে মাঝে কষ্টে বুকটা ফেটে যায়। এখনো প্রায় রাতেই স্যারের জন্য কাঁদি।’

(ঢাকাটাইমস/২১সেপ্টেম্বর/এসআই)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত