জন্ডিস নিয়ে যত ভুল ধারণা

ডা: ফয়েজ আহমদ খন্দকার, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১:১৯ | প্রকাশিত : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১:১২

রক্তে বিলিরুবিন নামক পদার্থের মাত্রা বেড়ে চোখসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ হলুদ হয়ে গেলে একে জন্ডিস বলে। আমাদের শরীরে রোগব্যাধী হলে নানান উপসর্গ ও লক্ষণ দেখা দেয়। জন্ডিস ও তেমনি একটি উপসর্গ এবং লক্ষণ। একই উপসর্গ বা লক্ষণ বিভিন্ন রোগের কারণে হতে পারে।

জন্ডিস কি, কেন হয়?

জ্বর যেমন- টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, সাধারণ ভাইরাসের সংক্রমণসহ নানা রোগের কারণে হতে পারে। তেমনি জন্ডিসও হতে পারে বিভিন্ন রোগের কারণে। ভাইরাল হেপাটাইটিস, পিত্ত নালির পাথর বা টিউমার, অন্ত্রের টিউমার, রক্তের বিভিন্ন রোগ যেমন থ্যালাসেমিয়াসহ অনেক রোগে রক্তে বিলিরুবিন নামক পদার্থের মাত্রা বেড়ে গেলে জন্ডিস দেখা দেয়। জন্মগত কিছু রোগের কারণেও জন্ডিস হয়।

জন্ডিস কিভাবে বুঝবেন?

মূলত চোখের সাদা অংশ হলুদ হলেই ওই অবস্থাকে জন্ডিস বলা হয়। জন্ডিসের মাত্রা আরো বাড়লে হাত-পা এমনকি পুরো শরীর হলুদ বর্ণ ধারণ করে। প্রস্রাবের রঙ হালকা থেকে গাড় হলুদ হয়ে যায়। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু মাত্র প্রস্রাব হলুদ হলেই একে জন্ডিস বলা হয় না। এর পাশাপাশি জন্ডিসের কারণ অনুযায়ী অন্যান্য উপসর্গ থাকে, যেমন- ক্ষুদামন্দা, বমির ভাব, পেট ব্যথা, চুলকানি ইত্যাদি। 

ভাইরাল হেপাটাইটিস

জন্ডিসের প্রধান কারণ ভাইরাল হেপাটাইটিস। হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ই ভাইরাস এর সংক্রমণে লিভারে প্রদাহের কারণে এটি হয়। এতে প্রথমে হালকা জ্বর, বমির ভাব বা বমি, খাবারে অরুচি দেখা দেয়। তারপর ধীরে ধীরে চোখ ও প্রস্রাবের রঙ হলুদ হতে থাকে। প্রথম দেড় থেকে দুই সপ্তাহ জন্ডিসের মাত্রা বাড়তে থাকে, পরবর্তী দেড় থেকে দুই সপ্তাহে এটি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এ সময় বিশ্রামে থাকা জরুরি।

স্বাভাবিক খাবার খেতে হয়। প্রথম দিকে রুচি কম  থাকে বলে খেতে অসুবিধা হতে পারে। কোন বিশেষ খাবার কম খাওয়া কিংবা কোন বিশেষ খাবার বেশি বেশি খাওয়া এমনটির ভিত্তি নেই। বমি বেশি হলে কিংবা খাবার না খেতে পেরে দুর্বল হয়ে গেলে এবং আরো কিছু জটিলতায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দরকার দেখা দিতে পারে। সাধারণত ৩-৪ সপ্তাহের মধ্যে এটি ভালো হয়ে যায়। তবে দুই থেকে তিন শতাংশ ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে এই জটিলতার হার ২০-৩০ শতাংশ।

জন্ডিস নিয়ে যত ভুল ধারণা

জন্ডিস হলেই দেখা যায় আশে পাশের অনেকেই  জন্ডিস বিশেষজ্ঞ হয়ে যান- যারা আক্রান্ত রোগীকে বিভিন্ন উপদেশ দিতে থাকে যার বেশির ভাগ ভুলে ভরা, বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন ও কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিকর।

ভুল তথ্য-১

জন্ডিসের কোন অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা নেই, তাই চিকিৎসকের  কাছে যাওয়ার দরকার নেই।

সঠিক তথ্য: জন্ডিস হলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। চিকিৎসক প্রথমত আপনার কী কারণে জন্ডিস হলো তা নির্ণয় করবেন এবং কারণ অনুযায়ী উপদেশ ও চিকিৎসা প্রদান করবেন। হেপাটাইটিস ভাইরাসের কারণে জন্ডিস হলে বিশ্রাম নেয়ার উপদেশের পাশাপাশি উপসর্গ অনুযায়ী ঔষধ দিবেন। লিভার ফেইলুর এর মত কোন জটিলতা দেখা দিচ্ছে কিনা সে জন্য  চিকিৎসকের ফলোআপ-এ থাকতে হবে।

ভুল তথ্য-২

মাথা ধোয়া, হাত ধোয়া, ডাব পড়া, মালা পরা, শরীরে গরম পয়সা বা লোহা দিয়ে ছ্যাঁক দেয়া (লিভার খিলানো), কবিরাজি ঔষধ সেবন ইত্যাদি জন্ডিস নিরাময় করে।

সঠিক তথ্য: এসব পদ্ধতি কোনো উপকার করে না। বরঞ্চ কিছু কিছু ক্ষেত্রে শরীরের ক্ষতি হয়। দুই সপ্তাহ পর থেকে জন্ডিস যখন স্বাভাবিক নিয়মে কমতে থাকে, তখন এটাকে মাথা ধোয়া বা মালা পরার সুফল হিসেবে মনে করে অনেকে পুলকিত হয়ে থাকেন।

ভুল তথ্য-৩

জন্ডিস হলে বার বার পানি খেতে হবে, বিশেষ করে ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি।

সঠিক তথ্য: অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি জন্ডিসের কোনো উপকার করে না। বরং অনেকেই এতে কাশি ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। বার বার পানি খেলে প্রস্রাবের রঙ কিছুটা হালকা হয়। কিন্তু এর মানে এটা নয়, জন্ডিস কমে গেছে। একজন মানুষের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় দৈনিক ২-২.৫ লিটার পানি পান করতে হবে।

ভুল তথ্য-৪

বার বার গোসল করলে জন্ডিস দ্রুত কমে।

সঠিক তথ্য: এটি ঠিক নয়।

ভুল তথ্য-৫

আখের শরবত, ডাবের পানি বার বার খেলে জন্ডিস সারে।

সঠিক তথ্য: এগুলো জন্ডিসের কোনো পথ্য নয়। খেতে ইচ্ছে করলে খেতে পারেন। কিন্তু অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে পেটে গ্যাস হয়।  ফলে অন্য খাবার খাওয়ার রুচি কমে যায়।

ভুল তথ্য-৬

জন্ডিস হলে হলুদ দিয়ে রান্না করা তরকারি খাওয়া যাবে না। সিদ্ধ খাবার খেতে হবে।

সঠিক তথ্য: হলুদ এবং জন্ডিসের হলুদ বর্ণ এক নয়। তাই, হলুদ যুক্ত রান্না খেলে জন্ডিস বাড়ে না। ভাইরাল হেপাটাইটিসজনিত জন্ডিসে খাওয়ার রুচি এমনিতেই কম থাকে। হলুদ ছাড়া সিদ্ধ খাবারে রুচি আরো কমে যায়। ফলে অপুষ্টি  দেখা দিতে পারে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

লিভার বিভাগ

শহীদ সোহরাওয়ারদী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

(ঢাকাটাইমস/২১সেপ্টেম্বর/এসআই)

সংবাদটি শেয়ার করুন

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত