ঘুষ ছাড়া কোনও কাজ হয় না দুই বন্দরে: টিআইবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৯:১৪

বুড়িমারী স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন এবং মোংলা বন্দর ও কাস্টম হাউজের আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ায় সব ক্ষেত্রে শতভাগ ঘুষ বাণিজ্য হয় বলে নিজেদের করা প্রতিবেদনে দাবি করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি।

রবিবার রাজধানীর নিজেদের কার্যালয়ে ‘মোংলা বন্দর ও কাস্টম হাউজ এবং বুড়িমারী স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন: আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়ায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানায় টিআইবি।

দেশের অর্থনীতিতে বুড়িমারী স্থলবন্দর ও মোংলা বন্দর ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই দুই বন্দরের সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরনের উপায় নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় ব্যাপক দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে টিআইবির প্রতিবেদনে।

সংস্থাটি বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বুড়িমারী স্থলবন্দরের শুল্ক স্টেশনে ঘুষের লেনদেন হয়েছে দুই কোটি ৮৫ লাখ টাকা। আর বন্দর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হয়েছে ৪৮ লাখ টাকা। এ ছাড়া শ্রমিক ইউনিয়নের মাধ্যমে বছরে ট্রাক থেকে চাঁদা তোলা হয় পাঁচ কোটি চার লাখ টাকা। অন্যদিকে মোংলা বন্দরের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ২০ কোটি টাকার  ঘুষ লেনদেন হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মোংলা বন্দরের কাস্টম হাউজে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও কমপক্ষে ৩৫ হাজার ৭০০ টাকা হিসাব বহির্ভূতভাবে আদায় করা হয়। অন্যদিকে গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৪ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়।

একইভাবে বুড়িমারী বন্দরে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধাপে গড়ে কমপক্ষে ২ হাজার ৫০ টাকা ঘুষ দিতে হয়। একইভাবে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে  কমপক্ষে ১ হাজার ৭০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়।

সেবাগ্রহীতারা বন্দরের দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির শিকার হওয়ার ভয়েই ঘুষ দিয়ে থাকে বলে জানায় টিআইবি। সেই সঙ্গে শুল্কফাঁকির জন্যও অনেকে অনিয়মের পথ বেছে নিচ্ছে।

তবে বন্দরের ডিজিটাইজেশন এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা নিরসন করা গেলে দুর্নীতি অনেকাংশেই কমানো সম্ভব বলে মনে করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলেন, ‘দুই প্রকার দুর্নীতি। একটি যোগসাজশের দুর্নীতি, অন্যটি বলপূর্বক অর্থ আদায়ের দুর্নীতি, যেটি হয় ঘুষ আদায়ের মাধ্যমে। তা উভয় বন্দরেই দেখতে পেয়েছি। এটা এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিকতায় রূপ নিয়েছে। সেখানে যারা অংশীজন তাদের সবারই এক ধরনের সিন্ডিকেটের মতো যোগসাজশ আমরা দেখতে পাই।’

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘যদি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সত্যিকার অর্থে আমরা চাই, কর্তৃপক্ষ চায় তাহলে সেটা সম্ভব, শুধু যেটা দরকার সেটা হলো সদিচ্ছা। যারা দুর্নীতির সাথে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে এ ধরনের বার্তা পৌঁছানো যে অনিয়ম করলে, দুর্নীতি করলে শাস্তি পেতে হয়।’

প্রতিবেদনটির গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দীর্ঘ অনুসন্ধান ও গবেষণায় আমরা বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। বন্দর দুইটিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং কাস্টমসের সব পর্যায়ে শতভাগ দুর্নীতি রয়েছে।’

তবে এর পক্ষে টিআইবির কাছে শত-শত তথ্য প্রমাণ থাকলেও আইনিভাবে সেসব প্রমাণের কোনও সুযোগ টিআইবির নেই বলে দাবি ইফতেখারুজ্জামানের।

তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর এমন কোনও দেশ নেই যেখানে দুর্নীতি বন্ধ হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতিবাজরা অন্তত শাস্তি পায়। আমাদের দেশেও এমন নজির দরকার। দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের কার্যক্রম আরও জোরদার করা দরকার।’

তবে দুর্নীতি কমাতে রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত না নেওয়া হলে তা কমবে না বলেও মন্তব্য তার।

টিআইবির ৮ সুপারিশ:

এই দুই জায়গায় দুর্নীতি রোধে আটটি সুপারিশও করেছে সংস্থাটি। তা হলো- ১. পণ্যের শুল্কায়ন, পণ্য-ছাড় এবং জাহাজের আগমন-বহির্গমন প্রক্রিয়ায় কার্ষকর ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রদান নিশ্চিত করতে সকল পর্যায়ে অটোমেশন চালু করতে হবে। ২. শুল্কায়ন দ্রুত ও সহজতর করতে মংলা বন্দর এলাকায় কাস্টম হাউজের পূর্ণাঙ্গ কার্যালয় স্থাপন করতে হবে। ৩. প্রযুক্তির ব্যবহারকে প্রাধান্য দিয়ে পণ্যের শতভাগ কায়িক পরীক্ষণের পরিবর্তে দৈবচয়নের ভিত্তিতে আংশিক (১০%-২০%) পণ্যের কায়িক পরীক্ষণ করতে হবে। ৪. শূন্য পদে নতুন জনবল নিয়োগ দিতে হবে। ৫. প্রতি বছর সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয় ও সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করতে হবে। ৬. নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ লেনদেন বন্ধে বন্দর ও কাস্টমসের পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনতে হবে এবং দৃশ্যমান মনিটর স্থাপন করতে হবে। ৭. জাহাজের ঝুঁকিপূর্ণ নেভিগেশন নিশ্চিত করতে নেভিগেশনাল সরঞ্জাম স্থাপন ও তার রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। ৮. বন্দর এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকাটাইমস/২৩সেপ্টেম্বর/এনআই/ডিএম

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত