গ্রেনেড হামলার হোতাদের ফাঁসি চান জজ মিয়া

আশিক আহমেদ, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১০ অক্টোবর ২০১৮, ০০:৩৪

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের জনসভায় শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে করা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায় হবে আজ বুধবার। এইদিনের অপক্ষোয় রয়েছেন তৎকালীন সময়ে পুলিশের মামলায় সাজানো আসামি গ্রামের নিরীহ চা দোকানদার মো. জালাল। যিনি জজ মিয়া নামে পরিচিত। জজ মিয়া চান গ্রেনেড হামলার প্রকৃত হোতাদের যেন ফাঁসি দেয়া হয়।

বিএনপি সরকারের আমলে জজ মিয়া নামের এই লোককে দিয়ে ঘটনার দায় স্বীকার করানো হয়। এ মামলার তদন্তে নিয়োজিত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তিন পুলিশ কর্মকর্তা তাকে হামলার হোতা বানিয়ে নাটক নাটক সাজান।

রায়ে আগের দিন ঢাকাটাইমসকে সেই ঘটনার বর্ণনা দিলেন ভুক্তোভোগী মো. জালাল। তিনি বলেন, সিআইডি কর্মকর্তারা তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুই নিজে বাঁচ, পরিবারকে বাঁচা, আমাদেরও বাঁচা।’

জজ মিয়াকে কীভাবে আটক করা হয়, কীভাবে তাঁকে দিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়, কী শর্তে তিনি তাঁদের প্রস্তাবে রাজি হন, আদালতে তা বলেছেন।

২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দিতে জজ মিয়া এসব কথা বলেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড বোমা হামলার ঘটনায় সাক্ষী হিসেবে তিনি এই জবানবন্দি দেন।

২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালী থেকে জজ মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তের নামে তাঁকে ১৭ দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে সিআইডি। পরে আদালতে ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা হয়। তদন্তের নামে নাটক তৈরি করেন মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এএসপি আবদুর রশীদ ও তৎকালীন বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন। সিআইডির এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনিও সাজানো ছকে কথিত তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যান। এই গল্প সাজানোর ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তাদের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর।

মো. জালাল ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘ওইদিন দুপুরের দিকে সেনবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই কবির আমাকে গ্রেপ্তার করে সেনবাগ থানায় নিয়ে আসেন। পরে সন্ধ্যার দিকে সিআইডি পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (এসপি) আবদুর রশীদ সাহেব আমাকে সেনবাগ থানায় মারধর করেন। আমাকে রশীদ সাহেব বলেন, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে গ্রেনেড হামলার সঙ্গে আমি জড়িত, সেই বিষয় যেন আমি স্বীকার করি। যদি স্বীকার না করি, তবে আমাকে ক্রসফায়ারে দেয়া হবে। যদি স্বীকার করি, তবে আমাকে মারা হবে না।’

তারপর তাকে চোখ বেঁধে গাড়িতে করে নিয়ে ঢাকায় আনা হয় বলে জানান। বলেন, ‘ঢাকায় নিয়ে আসার পর আমার চোখ খোলা হলে দেখি, আমি একটা রুমের ভেতর রয়েছি।’

মো. জালাল বলেন, ‘রশীদ সাহেব আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, আমি তাঁদের কথামতো রাজি আছি কি না। অন্যথায় আমাদের ক্রসফায়ারে দেয়া হবে। আমাকে আরও বলা হয়, আমার মা, ভাই, বোন, অর্থাৎ, পরিবারের সদস্যদের ক্রসফায়ারে দেয়া হবে। আমি বলেছিলাম, আমি ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। তখন আমাকে বলা হয় যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবে স্বীকার করার জন্য। এসপি রশীদ সাহেব বলে, তাদের কথামতো কাজ করলে আমি ও আমার পরিবার বেঁচে যাব।

“আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমাকে কীভাবে বাঁচানো হবে। আমাকে বলা হয়েছে, ‘আমাকে এই মামলায় রাজসাক্ষী মান্য করা হবে। আমার পরিবার তারা দেখবে। পরবর্তীতে রশীদ সাহেব আমাকে তার বড় অফিসারের কাছে নিয়ে যায়। তার নাম বড় অফিসার রুহুল আমিন। রুহুল আমিন সাহেবও বলেন, ‘রশীদ সাহেব যেভাবে বলেছেন সেভাবে কাজ করার জন্য। তাতে আমার ও আমার পরিবারের ভালো হবে’।

‘আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমাকে তো আসামি বানানো হয়েছে। এতে কি আমার ভালো হলো? তখন আমাকে জানানো হয়, আমাকে অত্র মামলায় আসামি করা হয় নাই। রাজসাক্ষী বানানো হয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, রাজসাক্ষী হয়ে আমার কী হবে। তখন আমাকে জানানো হয়, রাজসাক্ষী দিয়ে কথামতো সাক্ষী দিলে আমার ভালো হবে। অন্যথায় “ক্রসফায়ারে” দিয়ে আমাকে হত্যা করা হবে।’

মো. জালালা বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, আপনারা আমাকে বাঁচাতে পারেন, মারতেও পারেন। তখন রুহুল আমিন সাহেব বলে, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে। আমাকে বাঁচতে হবে। আমার মা, বোন, ভাইকে বাঁচাতে হবে। তখন আমি পুলিশ অফিসারদের কথা রাজি হই। আমাকে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের গ্রেনেড হামলা মামলার ভিডিও দেখানো হয়। আমাকে কিছু ছবি দেখায়। পরে আমাকে বলে, যেভাবে আমাকে বলা হয়েছে, সেভাবেই আমি যেন আদালতে আমার বক্তব্য দিই।

‘রুহুল আমিনের রুমে আসেন মুন্সি আতিকুর রহমান। মুন্সি আতিকুর রহমান রুহুল আমিন সাহেবকে বলে, জজ মিয়া কোনটি? মুন্সি আতিক সাহেব আমাকে বলেন, এরা ভালো লোক। এদের কথায় কাজ করলে আমার ভালো হবে। আমি বলেছিলাম, আমি রাজসাক্ষী হয়েছি। তাদের কথামতো জবানবন্দি করব। আমাকে দিয়ে অনেকের নাম বলানো হয়। আরও বলা হয়, ওই সব ব্যক্তিদের সঙ্গে আমাকেও দুই-একটি মামলায় জড়ানো হবে, যাতে লোকজন ঘটনা বিশ্বাস করে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, আরও মামলায় আমাকে জড়ালে আমার কী হবে। তখন আমাকে জানানো হয়, মামলার বিষয়ে তারা ফাইট করবে। পরবর্তী সময়ে মুন্সি আতিক রুম থেকে চলে যান। রুহুল আমিন সাহেব আমাকে বলে, “তুই নিজে বাঁচ, পরিবারকে বাঁচা, আমাদের বাঁচা।”

‘আমাকে সিআইডি মালিবাগ অফিসে হলরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। রুহুল আমিন সাহেব হলরুমে সব অফিসারদের সামনে আমাকে দেখিয়ে বলে, এই হলো জজ মিয়া। এই লোক বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ২১ আগস্ট গ্রেনেড মামলায় গ্রেনেড হামলা করেছে। অন্য কোনো অফিসার আমার সামনে কোনো কথা বলে নাই।

সিআইডি অফিসে থাকাকালে রুহুল আমিন সাহেবের মোবাইল ফোন দিয়ে সেনবাগ থানার কবির দারোগার মাধ্যমে আমার মা-বোনের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেন বলে জানান মো জালাল। বলেন, আমার মা তাদের সঙ্গে দেখা করলে রশীদ সাহেব আমার মাকে বলেন, সংসারের খরচ যা লাগে আমার মাকে দেওয়া হবে। মুন্সি আতিক আমার সঙ্গে জেলগেটে দেখা করেন। আমাকে বলা হয়, আমার কথা তারা রেখেছে, আমি যেন তাদের কথা রাখি। পরে মুন্সি আতিক সাহেব আবার জেল গেটে আমার সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করে, আমি কী জানি? তাঁর নাম কর্নেল গুলজার। তখন আমি তাঁকে বলি, রশীদ সাহেব, রুহুল আমিন সাহেব ও আতিক সাহেবের শিখিয়ে দেওয়া মতে স্বীকারোক্তি প্রদান করি। কর্নেল গুলজার সাহেব বলেন, ‘তারা সবাই অফিসার। আমাকে বাঁচানোর মালিক আল্লাহ। কর্নেল গুলজার মুন্সি আতিকুর রহমানকে বলে, “এ ধরনের নিরীহ আর কত মানুষের জীবন তারা নষ্ট করবে।”’

এই ঘটনা কীভাবে ফাঁস হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে জজমিয়া ঢাকাটাইমসকে বলেন, একদিন বাংলাভিশন টিভির সাংবাদিক শারমিন আপা আমার গ্রামের বাড়ি গিয়েছিল। কিভাবে আমাদের সংসার চলে। পরে আমার ছোটবোন খোরশেদা আক্তার তাকে বলেছিল আমাদের সংসার খরচ দেয় সিআইডি। এরপর থেকেই সিআইডি আমাদের খরচ দেওয়া বন্ধ করে দেয়।

মো. জালাল বলেন, আমার ছোট বোন খেরশেদার বয়স এখন ১৯ বছর। আমার এই মামলার খবর শুনলে কেউ তাকে বিয়ে করতে চায় না। বিনাবিচার আমি পাঁচ বছর জেল খেটেছি। আমি এর বিচার চাই। বুধবার এই মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আমি শুনেছি। আমি  প্রকৃত আসামিদের ফাঁসি চাই। আর ‘সরকার আমাকে পুনর্বাসন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মো জালাল। বলেন, ‘আমাকে একটি সরকারি চাকরি দেবেন। কিছুদিন আগে আমি বিয়ে করেছি। বর্তমানে আমার স্ত্রী অন্তঃস্বত্তা।’

বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা হয়। শুরু থেকেই নৃশংস ওই হত্যাযজ্ঞের তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে নানা চেষ্টা করা হয়। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে নতুন করে তদন্ত শুরু করে। বেরিয়ে আসে অনেক অজানা তথ্য। ২০০৮ সালের জুনে বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তাঁর ভাই তাজউদ্দিন, জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি-বি) নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। তদন্তে বেরিয়ে আসে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ওই হামলা চালানো হয়েছিল। হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড এসেছিল পাকিস্তান থেকে।

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই এ-সংক্রান্ত মামলার দুটির বিচার শুরু হয়। ৬১ জনের সাক্ষ্য নেওয়ার পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার এসে এর অধিকতর তদন্ত করে। এরপর বিএনপির নেতা তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদসহ ৩০ জনকে নতুন করে আসামি করে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। এরপর দুই অভিযোগপত্রের মোট ৫২ আসামির মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৮ জনকে পলাতক দেখিয়ে বিচার শুরু হয়। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, যাঁরা জোট সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত ছিলেন।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৩ জন নিহত হন। আহত হন শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কয়েক শ নেতা-কর্মী। তাঁদের অনেকে আজও শরীরে গ্রেনেডের স্প্লিন্টার নিয়ে দুঃসহ জীবন যাপন করছেন। আহত ও নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা মূল হোতাদের সাজার অপেক্ষায় আছেন।

ঢাকাটাইমস/১০অক্টোবর/এএ/ ইএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত