রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় গ্রেনেড হামলা: আদালত

মোসাদ্দেক বশির, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৮, ০৯:৫৫ | প্রকাশিত : ১০ অক্টোবর ২০১৮, ১৭:৪০

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় হয়েছে বলে এই মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে মন্তব্য করেছেন বিচারক।

হামলার ১৪ বছর পর বুধবার আলোচিত এই মামলায় রায় ঘোষণা করেন ঢাকার এক নং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর ‍উদ্দিন। এ সময় তিনি গ্রেনেড হামলাকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করেন।

২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় যে নজিরবিহীন গ্রেনেড হামলা হয়, তাতে সে সময়ের সরকারের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ছিল শুরু থেকেই।

হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হামলাকারীদেরকে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করে পুলিশ। নষ্ট করা হয় আলামত। মূল হামলাকালীদেরবে বাঁচিয়ে জজ মিয়া নামে নিরীহ একজনকে ফাঁসানোর চেষ্টা হাস্যরসের তৈরি করে সে সময়ই।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তদন্তে এই মামলার জট খোলে। পরে ২০০৯ সালে আদালতের নির্দেশে অধিকতর তদন্তে বের হয়ে আসে পুরো ঘটনাপ্রবাহ।

সে সময় জঙ্গি নেতা মুফতি আবদুল হান্নান প্রকাশ করেন কোন বৈঠকে এই হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেখানে কারা কারা ছিলেন, কী কথা হয়েছে। জানান, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর নিজে গ্রেনেড সরবরাহ করেন।

আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণেও উঠে এসেছে, এই হামলায় তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সম্পৃক্ততার বিষয়টি।

যে ৪৯ জনের সাজা ঘোষণা করা হয়েছে, তার মধ্যে ফাঁসির দণ্ড পেয়েছেন জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিণ্টু, তার ভাই তাজউদ্দিন, সাভার বিএনপির নেতা মো. হানিফ, দুই গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইএর তৎকালীন মহাপরিচালক রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআইএর সেই সময়ের প্রধান আবদুর রহীম।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন বিএনপি নেতা তারেক রহমান, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফুল ইসলাম।

বিচারক তার রায়ে বলেন, ‘তৎকালীন রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের সহায়তায় প্রকাশ্য দিবালোকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের সম্মুখে যুদ্ধে ব্যবহৃত স্পেশালাইজড মারণাস্ত্র আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটনা ঘটানো হয়।’

‘শেখ হাসিনাকে হালকা নাশতা করানো হবে, এই উদ্ধৃতি দিয়ে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনের কতিপয় সদস্য আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় হামলা করে।’

কেন এই মারণাস্ত্রের ব্যবহার- এমন মন্তব্য করে বিচারক বলেন, ‘রাজনীতি মানে কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ? শুধু আক্রমণই নয়, দলকে নেতৃত্বশূন্য করার অপচেষ্টা। রাজনীতিতে অবশ্যম্ভাবী ভাবে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে, তাই বলে বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রয়াস চালানো হবে? এটা কাম্য নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যে দলই থাকবে, বিরোধী দলের প্রতি তাদের উদারনীতি প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকতে হবে।’

‘বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করা মোটেও গণতান্ত্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ নয়। সাধারণ জনগণ এই রাজনীতি চায় না’- বলা হয় রায়ে।

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিতেই সম্ভব পুনরাবৃত্তি ঠেকানো

সিলেটে হযরত শাহজালালের দরগাহ শরিফ, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া, রমনা বটমূলে হামলার এবং শেখ হাসিনার ওপর নৃশংস বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার পুনরাবৃত্তি আর চায় না আদালত।

বিচারক বলেন, ‘আসামিগণকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে উল্লেখিত নৃশংস ও ন্যাক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব বলে অত্র আদালত মনে করে।’

রায়ে বলা হয়, ‘সাধারণ জনগণ চায়, যে কোনো রাজনৈতিক দলের সভা সমাবেশে যোগ দিয়ে সেই দলের নীতি আদর্শ ও পরিকল্পনা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ধারণ করা। আর সেই সমাবেশে আর্জেস  গ্রেনেড হামলা চালিয়ে রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ জনগণকে হত্যার এ ধারা চালু থাকলে সাধারণ মানুষ রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়বে।’

পরাজিত শক্তির চক্রান্ত

এই ঘটনাকে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির চক্রান্ত হিসেবেও দেখছেন বিচারক। রায়ে তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে পরাজিত শক্তি এই দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যাহত করার অপচেষ্টা চালাতে থাকে। পরাজিত মক্তি বঙ্গবন্ধু, তার পরিবারের সদস্যদেরকে হত্যা করে স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিকে রোধ করে। অগ্রগতির চাকাকে পেছনে ঘুরানোর চেষ্টা চালিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতকিভাবে দেশের ভাবমূর্তি ও লাল সবুজের পতাকাকে হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা চালায়। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট পরাজিত শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। বিচার না হওয়ারও অপচেষ্টা চালানো হয়। ইনডেমনিটি বিলের মাধ্যমে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রও দেশে শুরু হয়।’

‘বঙ্গবন্ধু হত্যার দীর্ঘ ২৩ বছর দুই মাস পর জাতি জাতির পিতা হত্যার দায় থেকে কলঙ্কমুক্ত হয় বিচার প্র্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করার পর জাতীয় চার নেতাকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে না গিয়ে বহমান থাকে। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শনিবার আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার হীন প্রচেষ্টা চালানে হয়।’

ঢাকাটাইমস/১০অক্টোবর/এমএবি/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

আদালত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত