প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক সিনেমা হল নির্মাণ করা হোক

শেখ আদনান ফাহাদ
 | প্রকাশিত : ১২ অক্টোবর ২০১৮, ০৯:৫১

যে দেশের জন্ম সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ এর শক্তিতে, সে দেশের একটি বিভাগীয় শহরে একটিও সিনেমা হল থাকবে না! বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন শহর ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র রাজশাহী বিভাগীয় শহরের একমাত্র ও সর্বশেষ সিনেমা হল 'উপহার' বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ১২ অক্টোবর থেকেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা  সিনেমা হলটির।

১৯৯১ সালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় প্রেক্ষাগৃহ ছিল ৫৫টি। তবে সে সময় প্রকৃত অর্থে চালু ছিল ২৫টি প্রেক্ষাগৃহ। আর বর্তমানে এগুলোর রাজশাহী জেলায় বর্তমানে উপহারসহ চালু আছে মাত্র ছয়টি সিনেমা হল। শুধু রাজশাহী নয়, দেশের অনেক জেলা শহর থেকে সিনেমা হল বিলুপ্ত হয়ে গেছে বহু আগেই। যেমন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে একটি সিনেমা হলও নেই। এমন সিনেমা হল-বিহীন জেলা অনেক আছে এখন দেশে।

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, চলতি বছর রাজশাহীর উপহার এর মত আরও ৮০টি সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। এগুলোর মধ্যে রাজধানীর আজাদ, রাজমণি, মধুমিতা, জোনাকী, অভিসার ও মুক্তি; নারায়ণগঞ্জের চলন্তিকা, চট্টগ্রামের আলমাস অন্যতম। কেন একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? এর পেছনে কি শুধুই অর্থনৈতিক কারণ কাজ করছে? নাকি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মনোযোগহীনতাও একটি বড় কারণ?

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশে সিনেমা হল ছিল ১ হাজার ৪৩৫টি। এরপর থেকে হলের সংখ্যা কমতে কমতে ২০১৭ সালে দাঁড়ায় ২২০টি। মাত্র ১০ বছর আগেও সারা দেশে সিনেমা হলের সঙ্গে প্রায় ৪৮ হাজার কর্মী জড়িত ছিলেন। এখন কর্মী সংখ্যা কমে পাঁচ হাজারের নিচে নেমে গেছে।

একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হচ্ছে, জাতির জন্য যেমন বিপদজনক, তেমনই লজ্জাজনক। হল মালিকরা বলছেন, দর্শক আসে না সিনেমা হলে। দর্শক না আসলে সিনেমা হল চালু রাখা যাবে না। লস দিয়ে কেউ ব্যবসা করবে না। হল মালিকদের কথায় যুক্তি আছে। দর্শক আসে না কেন সিনেমা হলে? অথচ আমরা দেখেছি অমিতাভ রেজার ‘আয়নাবাজি’ আর দীপঙ্কর দীপন এর ‘ঢাকা এটাক’ দেখার জন্য মানুষ টিকেট পেতে রীতিমত যুদ্ধ করেছে। প্রতিটি শো হাউজফুল থেকেছে। কিন্তু মুক্তি পাওয়া প্রতিটি চলচ্চিত্র কি দর্শক-প্রিয়তা পাচ্ছে? আর মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রের সংখ্যা কি দরকারের তুলনায় যথেষ্ট?

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মাত্র ৬২টি বাণিজ্যিক সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। এর মধ্যে দেশে নির্মিত বাণিজ্যিক সিনেমা, অনুদান পাওয়া সিনেমাসহ আমদানি করা সিনেমাও রয়েছে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির হিসাবে মাত্র তিনটি সিনেমা হিট হয়েছে। এগুলো হচ্ছে বস টু, নবাব এবং ঢাকা অ্যাটাক। চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীদের মতে, সিনেমা হল চালানোর জন্য সপ্তাহে অন্তত দুটি বাণিজ্যিক ধারার নতুন সিনেমা এবং মাসে অন্তত একটি ব্যবসাসফল সিনেমা প্রয়োজন। কিন্তু সে হারে নতুন সিনেমা তৈরি হচ্ছে না।

প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম সিনেমা তৈরি হচ্ছে। যে কটি তৈরি হচ্ছে, সেগুলো আবার দর্শকপ্রিয়তা পাচ্ছে না। দর্শকপ্রিয়তা পেতে হলে ‘ভালো’ সিনেমা তৈরি করতে হবে। ‘ভালো’ সিনেমার মানে কী? গল্প, স্ক্রিপ্ট যেমন আকর্ষণীয় হতে হবে, তেমনি দক্ষ নির্দেশক এর নির্দেশনায়, দক্ষ চিত্রগ্রাহক ও সম্পাদকদের সৃজনশীল সম্মিলিত অবদানে একটি ‘ভালো’ সিনেমা তৈরি হয়। সিনেমা তৈরি হয়ে গেলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। একটি সিনেমা তৈরি হয়ে গেলে এর মার্কেটিং এর জন্য অনেক কিছু করতে হয় প্রযোজক-নির্দেশককে। বাংলাদেশেও এখন দর্শক-প্রিয় সিনেমা তৈরি করা হয়। আয়নাবাজি রীতিমত সমাজে ঝড় তুলেছিল। দর্শক সিনেমা হলে আসে না, এ কথা বলে বাংলাদেশের দর্শকদের দোষী করার কোন যৌক্তিকতা নেই। দর্শক ভালো-মন্দ ঠিকই বুঝে।

বাংলাদেশের সিনেমা জগতের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে দুটি ধারা বেশ লক্ষণীয়। একদল খুবই শিক্ষিত, দেশে-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ডিগ্রি আছে। আরেকদল আছেন যাদের বলতে গেলে কোন প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনাই নেই। এই পড়াশোনা না জানা লোকগুলোকেই দেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের বাজারে বেশি সংখ্যায় দেখা যায়। এরা চলচ্চিত্রকে মনে করে আলু-পটল কেনা ও বেচার মত ব্যবসা। পুঁজি-নির্ভর বিশ্বে চলচ্চিত্র অবশ্যই বড় ব্যবসা। কিন্তু বেসিক না মেনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করলে, ‘ভালো’ চলচ্চিত্রের সবগুলো শর্ত পূরণ না করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করলে সেগুলো বাজারে চলবে না। দেশের এসব অশিক্ষিত চলচ্চিত্র নির্মাতা আর প্রযোজকদের রুচি খারাপ হতে পারে, দর্শকদের রুচি অত নিচে নেমে যায়নি। দর্শক ইচ্ছে করলেই ইন্টারনেট আর টেলিভিশনের শক্তিতে ভারত, ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্রের খবর নিতে পারে। এবং এটা সত্যি যে বাংলাদেশের মানুষ বিদেশের চলচ্চিত্র নিয়েই ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করছে। সাম্প্রতিক কালে আয়নাবাজি আর ঢাকা এটাক ছাড়া আর কোন দেশী রুচিশীল চলচ্চিত্র দেশীয় দর্শককে সিনেমা হলে সেভাবে টানতে পারেনি।

ভালো সিনেমা তৈরি হলেও দর্শক সিনেমা হলে যেতে চাইবে না, যদি অবকাঠামো ভালো না হয়। আগের দিনের মত শুধু সিনেমা দেখতে মানুষ সিনেমা হলে যেতে চায় না। সেই পুরনো আমলের ভাঙা চেয়ার, টর্চ হাতে টিকেট চেক করা কিছু টিকেট চেকার, বিরতিতে চিপস, বিস্কুট আর সস্তা চকলেট খাওয়ার দিন শেষ। এখন সিনেমা হলের যুগ নয়, সিনেপ্লেক্সের যুগ। মানুষ একদম পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন, আলোক-সজ্জা সম্বলিত, ভালো খানাপিনা ও কেনা-কেটার সুযোগসহ সিনেমা হল চায়। মানুষ নিজের পকেটের টাকা খরচ করে পূর্ণ বিনোদন চায়। বউ বাচ্চা নিয়ে গিয়ে, বন্ধু-বান্ধবরা সিনেমা দেখতে গিয়ে বখাটেদের খপ্পরে পড়তে চায় না।

নিম্নমানের অবকাঠামো আর নিম্নমানের সিনেমা মিলেই আজ দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান অবস্থা। রাষ্ট্র ও সমাজের এর থেকে উত্তরণ দরকার। রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের চলচ্চিত্রের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। ভাষা আন্দোলন থেকে উৎসারিত বাঙালি জাতীয়তাবাদের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে একটি সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল ধারায় গড়তে চলচ্চিত্র হতে পারে সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম।

আফসোস, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়েই আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে বলার মত কোন চলচ্চিত্র তৈরি হয়নি। পরিস্থিতি এতই খারাপ যে, বিদেশের নির্দেশক ভাড়া করতে হয় জাতির পিতাকে নিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর জন্য। শুধু বঙ্গবন্ধু কেন? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত প্রতিজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে একেকটি জগৎবিখ্যাত চলচ্চিত্র তৈরি হতে পারে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু চলচ্চিত্র আছে বাংলাদেশে, কিন্তু সেগুলো মোটেও আন্তর্জাতিক মানের নয়। অথচ সশস্র মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পৃথিবীর হাতে গোনা কয়েকটি জাতির আছে।

বাংলাদেশ একটি সাংস্কৃতিক রাষ্ট্র। মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা সমুন্নত রাখতে যে জাতির বীর সন্তানরা প্রাণ বিসর্জন দিতে পারে, যে দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানের নিয়মিত সেনাবাহিনীকে নাস্তানাবুদ করেছে, সেদেশের বিভাগীয় শহরে, জেলা শহরে সিনেমা হল থাকবে না, এমন দেশের জাতির পিতাকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে বিদেশী নির্মাতার শরণাপন্ন হতে হবে, জাতির পিতাকে নিয়ে স্থানীয় নির্মাতারা  উদ্যোগী হবেন না,  সিনেমা হলগুলো ভালো সিনেমা ও দর্শকের অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে, সেটি হতে পারে না। সরকারের উচ্চ মহলকে দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে ভাবতে হবে। না হলে বাংলাদেশ ক্রমেই অন্য দেশের সাংস্কৃতিক কলোনিতে রূপান্তরিত হবে।

সমাজ-সংস্কৃতিতে চলচ্চিত্রের গুরুত্ব অনুধাবন করে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চলচ্চিত্র বিষয়ে বড় প্রকল্প হাতে নিতে হবে। মালিকরা ব্যবসায় লস হলে সিনেমা হল বন্ধ করে দিবে স্বাভাবিক। এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিতে হবে। সরকারি উদ্যোগে একদিকে ভালো সিনেমা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে, অন্যদিকে দেশের প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক সিনেমা হল নির্মাণ করতে হবে। দেশের প্রত্যেকটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে সিনেমা হল স্থাপন করলেও সেটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য মঙ্গলজনক পরিস্থিতি তৈরি করবে। উপজেলা লেভেলে সরকারি উদ্যোগে সিনেমা হল নির্মাণ করা হলে এগুলোকে কেন্দ্র করে সেসব এলাকায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড জোরদার হবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে প্রধান করে এলাকার সুশীল শ্রেণীর প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত কমিটি এই সিনেমা হল পরিচালনা করবে। ধর্মীয় মৌলবাদ রুখতে হলে চলচ্চিত্রকে জনপ্রিয় করতে হবে। রাষ্ট্র নির্মাণে যেমন ভালো নিরাপত্তাবাহিনীর দরকার আছে, জাতি গঠনে তেমনি শক্তিশালী চলচ্চিত্র সংস্কৃতির দরকার আছে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত