একা, এক মোহরানার গল্প

জাকির হোসেন সেলিম
 | প্রকাশিত : ১২ অক্টোবর ২০১৮, ১৭:২৭

আদনান এই মূহুর্তে একটা চিঠির দিকে তাকিয়ে আছে ।

 তার হাতে একটা রেজিট্রিকৃত চিঠি । তাকে উকিল নোটিশ দেয়া হয়েছে?

 মাত্র সাত দিন ।

 আদনান একটা সিপমেন্টের কাজে চট্রগ্রাম গিয়েছিল । তাদের একমাত্র সন্তান বাপনি তার সাথেই ছিল । বাপনির স্কুল বন্ধ । আদনানের ছোট বোন থাকে ভাটিয়ারীতে, ছোট বোনের ছেলেটা বাপনির পিঠাপিঠি । বাপনি সেখানেই ছিল । তরু তার স্ত্রী, আদনান তাকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিল, তরু রাজী হয় নাই । চট্রগ্রাম যাবার পর হতে আদনান প্রতিদিন দুই তিনবার করে তরুর সাথে কথা বলেছে, তরুও কোন সমস্যার কথা বলে নাই । গতকাল রাত থেকে তরুর ফোন বন্ধ পাচ্ছে । বিয়ের দুই বৎসর পর হতে তারা নিজেদের ফ্ল্যাটে থাকে, সিকিউরিটির ব্যাপারে আদনানের কোন দুঃচিন্তা নাই । আদনান ভাবছিল, হয়তো ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেছে । সকাল বেলা তরুই ফোন করবে । এগার বৎসরের অভ্যেস, আদনান কথা না বলে থাকতে পারে না । বিয়ের পর হতে তারা কোন দিন কথা ছাড়া থাকে নাই । আদনান বাসার ল্যান্ডফোনে তরুর সাথে কথা বলতে চেষ্টা করে । লাইন ডিসকানেক্ট করা । একটু দুঃচিন্তা হয়, বাসার কেয়ারটেকারকে ফোন করে । বাসার কেয়ারটেকার শামসু মিয়া জানায় ম্যাডাম বাসায় নাই । বাবার বাড়ী গেছেন । আদনান চিন্তায় পড়ে যায় । বাবার বাড়ি কেন যাবে ? ঢাকা শহরে তার শ্বশুড় পক্ষের কেউ নাই । আদনানের শ্বশুড় বেঁচে নাই, শ্বাশুড়ী একমাত্র ছেলের সাথে বগুড়া থাকেন । তরু হঠাৎ কেন সেখানে যাবে ? প্রতিদিন তরুর সাথে কথা হয়েছে, কোথাও যাবার কথা তো বলে নাই ! আদনান তার শ্বাশুড়ীকে ফোন করে । ভাল মন্দ কথা হয়, আদনান তরুর কথা জিজ্ঞেস করে না । দুঃশ্চিন্তা করতে পারে । বুঝতে পারে তরু সেখানে যায় নাই । শ্বাশুড়ী মেয়ে আর নাতিকে নিয়ে বগুড়া বেড়াতে যেতে বলেন । আদনান একটা রহস্যের গন্ধ পায় । সে তার বোনকেও কিছু জানায় না । বাপনিকে সকালে হোটেলে দিয়ে যেতে বলে, সে আগামিকাল দিনের প্রথম ফ্লাইট ধরে ঢাকায় ফিরবে ।

 

 বাসার সব কিছু স্বাভাবিক । শুধু ল্যান্ডফোনের তার খুলে রাখা হয়েছে ।

 স্যার, গতকাল এসেছে, বলে সামসু মিয়া তিনটা চিঠি দিয়ে যায় ।

 চিঠির কথা শুনে আদনান অবাক হয় । বাসায় ইউটিলিটি বিল ছাড়া কোন চিঠি পত্র আসে না । আদনান প্রথম চিঠিটা খুলে, সে থমকে যায় । তরু তালাকের জন্য উকিল নোটিস পাঠিয়েছে । দ্বিতীয় চিঠি সেটাও আরেকটা নোটিশ, বাড়ি ছাড়ার নোটিস । তৃতীয় চিঠিটা এসেছে একটা ফাইন্যানসিং কম্পানি হতে, ফ্ল্যাট কিনার সময় আদনান এই প্রতিষ্ঠান হতে লোন নিয়েছিল । গতমাসে সে লোনের শেষ কিস্তি পরিশোধ করেছে । কম্পানির মুখপাত্র আদনানকে ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে, ভবিষৎ প্রয়োজনে তাদেরকে মনে রাখতে অনুরোধ করেছে ।

আদনান, ব্যারিষ্টার সাহেবের চেম্বারে একজনকে বসে থাকতে দেখে । ব্যারিষ্টার সাহেবের কথা জানতে চাইতেই

 তিনি বলেন, আমিও অপেক্ষা করছি । ব্যস্ত মানুষ, কতক্ষণে এমুখী হবেন বলা যাচ্ছে না । আমার নাম জামিলুর রশিদ, ঘন্টা দুয়েক হবে বসে আছি, হাতে ঘড়ি নাই; অনুমানে বলছি । আপনিও বসুন না, গল্প করি ।

 আদনান জামিলুর রশীদের বাড়ানো হাতটা ধরে । আদনান নিজের নাম বলে । সে প্রথমবার কোর্ট-কাচারি এলাকায় এসেছে । তার হাতে একজন বিখ্যাত ব্যারিষ্টারের ভিজিটিং কার্ড । সে এক বন্ধুর মাধ্যমে একটা আপয়েন্টমেন্ট ম্যানেজ করেছে । ব্যারিষ্টার সাহেবের অফিসটা খুব বড় না, আদনান সামনে বসে থাকা লোকটিকে আবার দেখে । নাম বলেছেন, জামিলুর রশিদ ।

 অফিসে কেউ নাই ? আদনানের কন্ঠে নির্ভেজাল বিশ্ময় মাখা প্রশ্ন ।

ভাই, অফিসে প্রচুর লোক আছে, ব্যারিষ্টার সাহেবের জুনিয়র; এই মূহুর্তে সবাই ব্যস্ত  । ব্যারিষ্টার সাহেবে তো পরমব্রহ্ম না । তিনি এক সাথে অনেক কাজ করতে পারেন না। সব কেস আসে ব্যারিষ্টার সাহেবের নামে । একই সময়ে, সামান্য আগে পেছনে কেসের হেয়ারিং শুরু হয় । কেসের মেরিট অনুযায়ী ব্যারিষ্টার সাহেব নিজে যান, জুনিয়রদের পাঠান বাকী সব সামাল দিতে । অফিস পাহাড়া দেয়ার জন্য কেউ থাকে না । আরো বেশী লোক নিয়োগ দেয়া হলে তারাও ব্যারিষ্টার সাহেবের প্রক্সি দিতে চলে যাবেন । অফিস খালীই থাকবে । আমরা বিনা পয়সায় অফিস পাহাড়া দেব । আমি মাসের পর মাস ঘুরছি, আমি ডেট পেলে আমার প্রায় সাবেক হতে যাওয়া স্ত্রীর আইনজীবি ডেট দিতে পারছে না । একই সমস্যা, দুই পক্ষেরই । শুনেন, বাংলাদেশে ডিভোর্সের হার কত বেড়েছে তা কি জানেন ?

 না, জানি না । আমার পরিবারে আমি প্রথমই এই পথে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছি । আদনান সত্যি কথাই বলে । সে আবার ঘড়ি দেখে, প্রায় আধা ঘন্টা হতে চলল বসে আছে, ত্রিশ মিনিটে আটবার ঘড়ি দেখেছে । ব্যারিষ্টার সাহেব কখন আসবেন বুঝা যাচ্ছে না ।

 রশিদ সাহেব আদনানের তাড়াহুড়ো দেখে হাসেন ।

 ভাই, আপনি বোধ হয় প্রথমবার এসেছেন; বার বার ঘড়ি দেখে লাভ নাই । ঘড়ির টিক টিক শব্দ ব্যারিষ্টার সাহেবের কান পর্যন্ত পৌঁছুবে না । এখানে সময়ের হিসাব ভুলে যান । আমিও প্রথম প্রথম আপনার মতো ঘন ঘন ঘড়ি দেখতাম আর বিরক্ত হতাম ।এখন দেখেন হাতে ঘড়ি নাই । রশিদ সাহেব শার্টের হাতা গুটিয়ে আদনানকে দুই হাতের কুনুই পর্যন্ত দেখান । বলেন, এখানে আসার আগে ঘড়ি খুলে রাখি । বাজে অভ্যেস, হাতে থাকলে বার বার চোখ যায় । এই অফিসের দেয়াল দেখুন ! ফক ফকা, একই কারনে কোন দেয়াল ঘড়ি টানানো হয় না । ভিজিটররা বিরক্ত হয় ।

আদনান কিছু না বললেও রশিদ সাহেবের যুক্তি মনে মনে মেনে নেয় ।

 আমার অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নাই । কোর্টে মামলা উঠে গেছে, অপেক্ষা করতেই হবে ।

 আপনি ধরা খেয়ে না থাকলে, বিকল্প রাস্তা দেখুন । ব্যারিষ্টার সাহেবের জন্য অপেক্ষা না করে পারিবারিক আদালতে যেতে পারেন । পারস্পরিক সম্মতিতে কাজটা সহজ হয়ে যাবে । আদনানের কাছে পরামর্শটাকে সৎ মনে হয় ।

 আদনান বিষয়টা মাথায় রাখে । রশিদ সাহেবের পরামর্শটা নিয়ে ভাবতে হবে । তার চিন্তা ভাবনা একটু এলোমেলো হয়ে গেছে । তরু তাকে হঠাৎ করেই পুরোপুরি নতুন এক পরিস্হিতির মুখামুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ।

 

একটা গল্প শুনেন । রশিদ সাহেব আবার কথা ভাল শুরু করেছেন । চুপচাপ বসে থাকলে সময় কাটতে চায়নারে ভাই ।

 আদনান মুখে কিছু বলে না, আগ্রহের দৃষ্টিতে রশিদ সাহেবের দিকে তাকায় । রশিদ সাহেব তার গল্প শুরু করেন-

 অনেক দিন আগের কথা । ভারতবর্ষ তখনও ভাগ হয় নাই ।

গরীব পরিবারের এক শিক্ষিত ছেলের সাথে ধর্নাঢ্য পরিবারের এক মেয়ের প্রেম হয় । লটকা লটকি প্রেম ।

 যথারীতি জানাজানিও হয়ে যায় । মেয়ের পরিবার মেয়ের উপর বিভিন্ন সেন্সর আরোপ করে । কিন্তু প্রেম কি বাঁধা মানে ?

 একদিন সুযোগ বুঝে মেয়েটি  ছেলের হাত ধরে পালিয়ে যায়, তারা বিয়ে করে । টুনাটুনির সুখের সংসার । কয়েক মাস পর মেয়েটির পরিবার নব দম্পত্তির খুঁজ পায় । মেয়ের বাবা মেয়েকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বাড়ি নিয়ে আসে ।

মেয়েকে কথা দেয়, নিজেদের মতো ধুমধাম করে আবার তার বিয়ে দেবে । তার পছন্দের ছেলের সাথেই দিবে ।

 নিজেদের সম্মান বলে তো একটা কথা আছে । মেয়ে খুশী মনে বাবা মার কাছে ফেরে যায় আর ছেলেটিও মেয়েটিকে খুশী মনে যেতে দেয় । সে দুই পরিবারের মিলনের স্বপ্ন দেখে । মেয়ের বাবা কথা দিয়ে যায় শীঘ্রই ছেলেটিকে নিয়ে যেতে লোক পাঠাবে । পালকি আসবে, ঘোড়ার গাড়ী আসবে, ছেলেকে শ্বাশুড় বাড়ি নিয়ে যাবে ।

দিন যায়, রাত যায় ।

 সেই পালকিও আসে না, ঘোড়ার গাড়ীও আসে না । ছেলেটি অস্হির হয় । প্রতি সকালে তিন মাইল হেঁটে পোষ্ট অফিসে যায় । সকালের ডাকে চিঠি ছাড়ে । তার জন্য কোন চিঠি আসে না । তার অস্হিরতা আর একটু বাড়ে ।

 সপ্তাহ খানেক পর পেয়াদা মারফত নোটিশ আসে । ছেলেটির নামে সমন জারি করা হয়েছে । দফাদার ছেলেটির কোমড়ে দড়ি বেঁধে মহকুমা সদরের বাস ধরে । ছেলের পরিবারে হায় হায় রব উঠে যায় ।

 সবাই জিজ্ঞেস করে, বিষয় কি ? ছেলেটা কি অন্যায় করেছে ?

 দফাদার বলে, কোর্টে চল, সব জানবে; আমি হুকুমের গোলাম ।

 মহকুমা কোর্টে মামলা উঠে ।

 ছেলের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ । নারী অপহরন, ডাকাতি, খুনের চেষ্টা সহ বড় বড় সব ধারা । মহকুমার সেরা উকিল মেয়ের পক্ষ নিয়ে ছেলের বিরুদ্ধে লড়ছে ।

 ছেলের পরিবার খুবই গরীব । তাদের একমাত্র সম্বল ছিল তাদের সন্তান । সেই সন্তানের বিপদে বড় কোন উকিল ধরার ক্ষমতা তাদের নাই । মেয়ে পক্ষের প্রতাপে অন্য কোন উকিল মামলাও নিতে চায় না ।

 মেয়েটি কোর্টে ছেলেকে সনাক্ত করে । ছেলের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বলে, উপরের সব কয়টা অভিযোগ সত্য । সে তাকে অপহরন করেছিল । মেয়েটির কথা শুনে ছেলেটি চুপসে যায় । মেয়েটি তার স্ত্রী, তার ভালবাসা, সব’চে বিশ্বাসের জায়গা, ভরসার জায়গা । সে কি সব বলছে?

 ছেলেটি হতভম্ব ।

 মেয়েটি নির্বিকার ।

 মামলার কার্যক্রম চলছে। সবাই বুঝতে পারে মেয়ে পক্ষ সবাইকে কিনে নিয়েছে ।

 ছেলের সাজা হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র ।

সময় বয়ে চলে । হক সাহেব সেই সময় মহকুমা শহরে আসেন । হক সাহেবকে চিনতে পারছেন তো ? শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, সবাই আদর করে হক সাহেব বলে ডাকতো । ছেলের অভিবাবকরা শেষ ভরসা হিসাবে হক সাহেবের সরণাপন্ন হয় । হক সাহেবের কাছে সব খুলে বলে ।

 হক সাহেব শুধু একবার জিজ্ঞেস করেন, যা শুনলেন সব সত্য কিনা ।

 উত্তরে ছেলের পরিবার হ্যাঁ বলে ।

 হক সাহেব নিজেও কিছু খুঁজ খবর করেন । কোর্টের যাবার দুই দিন আগে হক সাহেব ওকালত নামায় দস্তখত করেন ।

বিশেষ দিন চলে আসে । সবাই বলছে আজই কেসের যায় হয়ে যাবে । হাজার হাজার মানুষ কোর্টমুখী চলেছে ।

আহারে ! ছেলেটা বিনা দোষেই শাস্তি পেতে চলেছে । গরীবের কি কপাল!

 যাই হোক, সেই দিনের কোর্টের কার্যক্রম শুরু হয়েছে ।

 মেয়ে পক্ষের বিজ্ঞ উকিল ছেলের বিপক্ষে একের পর এক যুক্তি দিয়ে চলেছেন ।

কোর্ট ভর্তি লোকজন । সবাই ছেলেটার দিকে তাকিয়ে হায় হায় করছে ।

আহারে ! ছেলেটার বোধ হয় কঠিন সাজা হয়ে যাবে ।

এদিকে ছেলে পক্ষের লোকজনও অবাক । হক সাহেব চুপচাপ বসে আছেন, গালে হাত দিয়ে বিপক্ষ উকিলের যুক্তি তর্ক শুনছেন । হক সাহেব কোন কথা বলছেন না ।

 সময় যে শেষ হয়ে যাচ্ছে ! তবে কি হক সাহেবও বিক্রি হয়ে গেছেন  ?

না, তারা সেই অবধি ভাবতে চায় না । হক সাহেবকে নিয়ে এমন কথা ভাবা যায় না । তবে তিনি চুপ চাপ বসে আছেন কেন ?  কোর্টের কাজ শুরু হবার পর হক সাহেব একটা কথাও বলেন নাই ।

 নিয়তি, মেনে নেয়া ছাড়া কিছুই করার নাই । বিচার চেয়ে উচ্চ আদালতে যাবার ক্ষমতা তাদের নাই ।

এই দিকে মেয়ে পক্ষের উকিল তার যুক্তি তর্ক শেষ করেছেন । ছেলে পক্ষের কোন উকিল নাই । মহামান্য আদালত জাজমেন্ট শুনানোর আগে ছেলেকে তার কিছু বলার আছে কিনা জিজ্ঞেস করেন ।

এই সময় হক সাহেব উঠে দাঁড়ান ।

মহামান্য জজ সাহেব,  হক সাহেবকে চিনতেন, তারপরও নিয়ম রক্ষার জন্য ওকালত নামায় তার নাম আছে কি না জানতে চায় ।

 পেসকার হক সাহেবের নামের বিষয়টা নিশ্চিত করে ।

হক সাহেব একবার মেয়ের সাথে কথা বলতে আদালতের অনুমতি চান ।

 আদালত অনুমতি দেয়, মেয়েকে ডাকা হয় ।

 হক সাহেব ছেলেটিকে দেখিয়ে বলেন,

মা, তুমি আমার মেয়ের মতো । এই যে ছেলেটিকে দেখছ, আমি জানি সে তোমার সাথে অন্যায় করেছে । তারপর, ছেলের বিপক্ষে উত্থাপিত  অভিযোগ গুলির ধারা একে একে বলতে থাকেন সেই সাথে সর্বোচ্চ শাস্তির কি হতে পারে, সেই কথাও । হক সাহেব এতোক্ষণ চুপচাপ বসে মেয়ে পক্ষের উকিলের মুখে সেই সব কথা শুনছিলেন, নিজেকে বিচারকের আসনে বসিয়ে দেখেছেন মেয়ে পক্ষের উকিলের যুক্তি ছেলেটির শাস্তিকে কোন ধাপে নিয়ে যায় । মেয়েটিকে বলেন, মাগো, ছেলেটা অন্যায় করেছে, তার ইহকাল শেষ। তার হয়তো মৃত্যু দন্ড হয়ে যাবে কিংবা যাবৎজীবন কারাদন্ড । জেলের অন্ধকার কোটরে সে ধুকে ধুকে মরবে । তার ইহকালতো গেলোই, পরকালটাও যাবে । মা এই ছেলের পরকালটা তোমার হাতে ।

একমাত্র তুমিই পার পরকালে এই ছেলের মুক্তি নিশ্চিত করতে । মাগো,  এই ছেলেটার মোহরানার দাবী তুমি ছেড়ে দাও ।

 ছেলেটি মৃত্যুর পরে যেন একটু শান্তিতে থাকতে পারে ।

 মেয়েও সাথে সাথে বলে, দিলাম, আমি মোহরানা দাবী ছেড়ে দিলাম ।

 হক সাহেব মেয়েটির আরো কাছে এগিয়ে গিয়ে বলেন, আর একটু জোড়ে বল মা, হতভাগা ছেলেটিও যেন শুনতে পায় ।

 মেয়ে জোড়ের সাথে বলে, আমি মোহরানার দাবী ছেড়ে দিলাম ।

হক সাহেব মেয়েটিকে ধন্যবাদ দিয়ে জজ সাহেবের মুখামুখি হন ।

 মাননীয় আদালত, বিয়েই যদি না হবে, মহরানা এলো কোথা থেকে ?

 শুরু হয় স্রোতের বিরুদ্ধে চলা । হক সাহেব মেয়ে পক্ষের উকিলের সব যুক্তি খন্ডন করে প্রমান করেন এটা সাজানো কেস ।

 ছেলে আর মেয়ে স্বামী-স্ত্রী । তাদের ভিতর কোন অবৈধ সম্পর্ক নাই । ছেলে কোন অপহরণের সাথেও জড়িত না ।

 মেয়েও নিজের অপরাধ স্বীকার করে । পরিবারের চাপে, সে আদালতকে মিথ্যা বলতে বাধ্য হয়েছিল । তার পরিবার যেভাবে শিখিয়ে দিয়েছে, আদালতকে সে সেই ভাবেই বলেছে ।

 সব শুনার পর, মহামান্য আদালত ছেলেকে নিঃসর্ত মুক্তি দেয় । উপস্হিত জনতা হক সাহেবের নামে স্লোগান দেয় ।

 রশিদ সাহেব চুপ করতেই আদনান জানতে চায়,

 আপনার গল্প শেষ ? রশিদ সাহেব আদনানের দিকে তাকিয়ে থাকেন । গল্পটা আপনার মনে হয় ভাল লাগেনি । এই যুগে এই গল্প বিশ্বাস করানো কঠিন । তবে ঘটনা সত্যি, এটা কেবল গল্প না । গল্পের মানবিক দিকের জন্য অন্য সব দূর্বলতা মানিয়ে গেছে ।

 বিষয়টা তা না, আমার গল্পটা ভাল লেগেছে । আমি আসলে মেয়েটার কি হলো জানতে চাচ্ছিলাম । সে কি মিথ্যে মামলার বাদী হবার জন্য সাজা পেয়েছিল ?

 না, গল্পে মেয়েটার আর কোন কথা নাই । গল্প শেষ হবার সাথে সাথে মেয়েটা হারিয়ে গেছে ।

 তাদের ভালবাসার কি হলো ?

 নাই, ভাই ভালবাসা টাসা কিছু নাই । আমার কথাই দরুন, বিয়ের আগে আমরা পরস্পরের মাঝে ভালবাসা দেখতাম ।

বিয়ের পর শুধু বাসা দেখি । দোষ আমারও আছে, শুধু এক পক্ষের দোষ হতে পারে না ।  আমাদের সম্পর্কটা আমার কাছে একটা দীর্ঘস্হায়ী সংগমের মতো মনে হয়েছে । দীর্ঘক্ষণ পরস্পরের সাথে লেগে রইলাম, পরিপূর্ণ তৃপ্তি কেউ পেলাম না; তার আগেই নিজেদের সড়িয়ে নিতে হলো। রশিদ সাহেব পুরোপুরি হতাশ, দীর্ঘশ্বাস চেপে যান । কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, আমার কথা বাদ দেন । আমার কথা কখনও শেষ হবে না । চলতেই থাকবে, দেখছেন না, কেমন ফিলসফারের মতো কথা বলছি । বিবাহ বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হবার পর থেকে আমি বেশী বেশী কথা বলছি । জীবনে টুনাটুনীর গল্প ছাড়া কোন গল্প জানতাম না, এখন দেখুন আপনাকে হক সাহেবের গল্প শুনিয়ে দিলাম । আমার দারুন উন্নতি হয়েছে । হা হা হা ।

সন্ধ্যার আগে আগে ব্যারিষ্টার সাহেব আসেন । তিনি গাড়ী থেকে নামেন নাই । তার ব্যস্ততা কমে নাই, আদনান আর রশিদ সাহেব কে গাড়িতে উঠে আসতে বলেন । রশিদ সাহেব ব্যারিষ্টার সাহেবের গাড়ীতে উঠলেও আদনান দাঁড়িয়ে থাকে, সে নিজের গাড়ী নিয়ে এসেছে । ব্যারিষ্টার সাহেব  জানালা দিয়ে মুখ বের করে বলেন,

 বাসায় চলে আসুন, কার্ডে ঠিকানা দেয়া আছে ।

এই মূহুর্তে আদনান ব্যারিষ্টার সাহেবের সামনে বসে আছে ।

ব্যারিষ্টার সাহেব উকিল নোটিশ দুইটি বার কয়েক পড়েছেন । আপনি তো ভাই কামিল লোক, পশু চরিত্রের সব গুন নিজের মাঝে ধারন করে আছেন । এমন বিরল চরিত্র নিয়ে এতোদিন সংসার করলেন কি করে ?

আদনান বুঝতে পারে উকিল সাহেব মজা করছেন । উকিল নোটিসে তার চরিত্রের যে সব গুনাবলীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, মানুষ তো দূরের কথা আদি যুগের কোন পশুও এক সাথে ধারন করতো না ।

অভিযোগ তো আমার নামে, আমার উত্তর নিরপেক্ষ হবে না, পারলে আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করবেন; সে কিভাবে এতোদিন এমন বিরল চরিত্রের সাথে সংসার করলো । সে তো এখনও আইনত আমার স্ত্রীই, নাকি ?

 আইন তাই বলে । মহিলার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, সব কিছু খুব গুছিয়ে করেছে; আমি কতটুকু পারবো বলা যাচ্ছে না । বাড়িটাও আপনি এই মূহুর্তে দাবী করতে পারছেন না । তার নামে রেজিষ্ট্রি করা । আয়করের একটা ফাইলও মেন্টেন করেছে । দাবী প্রতিষ্ঠা করতে হলে আপনাকে লড়তে হবে, তারপরও কি হবে বলা যাচ্ছে না ।

 আমি লড়তে চাই না ।

 তবে আপনি কি চান ? বিয়ে তো টিকাতে পারবেন না, খরপোষ নিয়ে নেগোসিয়েশন ?

 না, তাও না । আমি দর কষাকষি করতে চাই এক মাত্র সন্তানকে নিয়ে । আমি খুব ধনী না, অনেক পরিশ্রম করে ছোট্ট একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছি । আমার স্ত্রী সেই প্রতিষ্ঠানেরও একজন অংশীদার । তাকে তার অংশও দিয়ে দেয়া হবে । একবারে আর্থিক মূল্য পরিশোধ করার সামর্থও আমার নাই । সময় দিলে সেই চেষ্টাও করা যেতে পারে ।

আমি চাই না তার ছায়া আমার সন্তানের আশপাশে দেখা যাক ।

 সেটা সহজ হবে না । মা হিসাবে তার দাবীও কম না । ছেলেকে আপনার সাথে রাখার জন্য আমি চেষ্টা করতে পারি, এখানেও সুবিধা করতে পারবেন না । তবে একটা পরামর্শ দিতে পারি । পারিবারিক আদালতে যান । দুই পক্ষ সামনা সামনি বসে সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারবেন । সন্তানকে নিয়ে কোর্টে কোর্টে টানা হেঁচড়া করতে হবে না । তবে হ্যাঁ, আপনার স্ত্রী যদি ইতিমধ্যে অন্য কাউকে বিয়ে করে ফেলে, সন্তানের ব্যাপারে তার দাবীর গ্রহনযোগ্যতা অনেক কমে যাবে । ভেবে দেখুন কি করবেন । আর একটা পরামর্শ, বাচ্চাকে নিজেদের সমস্যা হতে দূরে রাখুন ।  বাবা মার ঝগড়া কোন সন্তানই মেনে নিতে পারে না, মনে দীর্ঘস্হায়ী প্রভাব পড়ে ।

 তরু এসেছে, সাথে সুদর্শন এক ভদ্রলোক । চমৎকার একটা পান্জাবী পড়ে আছেন । দুইজনকে পাশাপাশি খুব মানিয়েছে । আদনান মহাপুরুষ না, তারপরও অবাক হয়ে লক্ষ্য করে তার ভেতরে কোন বোধই কাজ করছে না । না ঘৃনা, না হিংসা কিংবা প্রতিশোধ পরায়নতা । সে খুব স্বাভাবিক ভাবেই তরুর সামনে দাঁড়ায় ।

 তরু এক সময় তাকে ভালবাসতো, তরুর ভাষায় পাগলের মতো ভালবাসা । তরু এখন এই ভদ্রলোককে ভালবাসে । হতেই পারে, মনের উপর তো কারো হাত নাই । আদনানের মনে পড়ে, ঠিক এগার বৎসর আগে এমনি এক সকালে তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল । বিয়ে করবে বলে কাজি অফিসের সন্ধানে ঘর ছেড়েছিল । আগামীকাল তাদের বারতম বিবাহ বার্ষিকী । 

 

ব্যারিষ্টার সাহেবের কথাই ঠিক হয়েছে । সিদ্ধান্তে আসতে খুব সমস্যা হয় নাই । ফ্ল্যাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শতকরা পঁচিশ ভাগ শেয়ারের আর্থিক মূল্যের বিনিময়ে তরু সব মেনে নিয়েছে । আদনান দুই বৎসরে সমান ছয়টা কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করবে । তরুরও বোধ হয় তাড়া আছে । তবে সব কিছু শেষ হবে পারিবারিক আদালতের নিয়ম ধরেই, নির্দিষ্ট সময়ে ।

 বাপনির কথা আসতেই তরু শক্ত হয়ে গিয়েছিল । হাজার হোক মা তো !

 শালিশি বোর্ডের ভদ্র মহিলা মনে করিয়ে দেন, বিয়ে করার পর সন্তানের কাস্টডি নিয়ে আদালত মার কথা নাও শুনতে পারে । তরু চুপ হয়ে যায় । নয় বৎসরের বাপনিকে কেউ কিছু বলে নাই, ছেলেটা মায়ের সামনে বরাবর শক্ত হয়ে ছিল । কার সাথে থাকতে চায় প্রশ্নের উত্তর দিতে এক সেকেন্ডও দেরী করে নাই । সব শেষ হয়ে যাবার পর, আদনান তরুকে একটা প্রশ্ন করে,

 তুমি আমার চরিত্রের সাথে যে বিশেষন গুলো যোগ করলে, তার কি কোন দরকার ছিল?

 আমি কি তেমন কেউ ?

 তরু চুপ করে থাকে । শালিশি বোর্ডের ভদ্রমহিলা বলেন,

আদনান সাহেব, সব তো শেষ হয়ে গেছে, আবার পুরাতন কথা কেন তুলেছেন ? সব ভুলে যান ।

 তরু, ছোট্ট একটা প্রশ্ন, উত্তরটা আরো ছোট্ট; হ্যাঁ অথবা না । বাপনি আমার সাথে থাকলো, তাকে দেয়ার জন্যও উত্তরটা আমার জানা দরকার । বাপনীর বাবা কি এতোটা খারাপ ?

 তরু ছোট্ট করে বলে, না ।

 ধন্যবাদ । আদনান বাপনীর হাত ধরে ।

আদনান, বাসা থেকে বের হতে গিয়ে একবার দাঁড়ায় । পেছনে ফিরে দেখে । অনেক কষ্টের স্হৃতি, অনেক সুখের স্হৃতি এই ফ্ল্যাট ঘিরে । নিজের এক টুকরো আশ্রয়, ছেলেকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে সরাসরি এই বাসায় আসা; কত স্হৃতি ।

 সে কি আবার পারবে ? এখন তার বয়স আটত্রিশ । খুব কি দেরী হয়ে গেছে । সে কি পারবে না তার সন্তানের জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয় রেখে যেতে?

 বাবা আমরা কোথায় যাব ? আদনান বাবাকে ঘেঁষে দাঁড়ায় । আবার জিজ্ঞেস করে,

 বাবা আমরা এখন কোথায় যাব ?

 বাপনি বাবা, আমরা এখন তোমার বাড়ী যাব ।

 আমার বাড়ি কোথায় বাবা?

কেন ? তোমার দাদা বাড়িই তো তোমার বাড়ি । সেই বাড়ি কেউ নিতে পারবে না ।

 আমাদের বাসা কি নিয়ে গেছে ?

 হ্যাঁ বাবা, আমাদের বাসা নিয়ে গেছে । আদনান হাটু গেড়ে ছেলের সামনে বসে । তার ছোট্ট দুটি হাত ধরে । বলে, বাপনি তুমি ভাবছ কেন ? আমাদের আবার নতুন বাসা হবে, সেই বাসায় শুধু তুমি আর আমি থাকবো ।

 বাবা, তোমার কি অনেক টাকা আছে ?

 না বাবা, আমার অনেক টাকা নাই ।  আমার একটা বাপনি আছে । আদনান মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, তাকে পারতেই হবে । শুরুতে বাবার দোয়া ছিল, এখন তার ছেলেও সাথে আছে । তাকে পারতেই হবে । বলে, আমার অনেক টাকা না থাকলেও তুমি সাথে আছ; আমার বাপনি । বল বাবা, আমরা দুই জনে পারবো না ?

বাপনির ছোট্ট হাতটা আদনানের হাতের ভেতর নড়ে উঠে ।।

 Email: [email protected]

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত