বিনা পয়সায় সর্বরোগের চিকিৎসা ‘কাঁচি কবিরাজের’

আজহারুল হক, ময়মনসিংহ
| আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ১১:৩১ | প্রকাশিত : ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ১১:২২

ময়মনসিংহের সর্বরোগের চিকিৎসক ভালুকা উপজেলার রাজমিস্ত্রি উজ্জল মিয়া। সবাই তাকে চেনেন ‘কাঁচি কবিরাজ’ নামে। তার ঝাড়ফুঁক, তেল পানি পড়া নিতে প্রতিদিন ভিড় করছেন হাজার হাজার নারী পুরুষ। বিনিময়ে কোনো টাকা পয়সা নেন না এ কবিরাজ।

বাত-ব্যথা, অন্ধ, বোবা, শ্বাসকষ্ট থেকে সব ধরণের চিকিৎসা দিচ্ছেন তিনি। তবে তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই।

সরেজমিনে দেখা যায় রাজমিস্ত্রি উজ্জল ওরফে কাঁচি কবিরাজ একসাথে ৫০০ থেকে ১ হাজার নারী-পুরুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। তেল ও পানির বোতল আকাশের দিকে তাঁক করিয়ে রাখার নির্দেশ দিয়ে লোহার তৈরি কাঁচি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঝাঁড় ফুঁক দিচ্ছেন তিনি।

চিকিৎসার সত্যতা যাচাইয়ে তার কাছে যান স্থানীয় ভালুকার খবর পত্রিকার সম্পাদক আসাদুজ্জামান সুমন। নিজের পরিচয় গোপন রেখে স্বপ্নে সাপে দংশন করেছে বলে তিনি কাঁচি কবিরাজকে জানান।

বিষয়টি শুনে কবিরাজ কাঁচি দিয়ে প্রকৃত সাপে কাঁটা রোগীর ন্যায় তুলা রাশি ব্যক্তির মাধ্যমে শরীর থেকে বিষ নামার কথা বলেন।

পরে ওই সাংবাদিকে বিষ মুক্ত করা হয়েছে জানিয়ে বাড়িতে চলে যেতে বলা হয়। পরে সাংবাদিক স্বপ্নে সাপে কাঁটার বিষয়টি অভিনয় জানালে কবিরাজ ক্ষিপ্ত হন। বলেন শরীরে অন্য বিষাক্ত বিষ ছিলো। 

এদিকে কাঁচি কবিরাজের ঝাঁড় ফুক দেওয়া তেল ও পানিতেই সেরে যাবে যেকোনো রোগ, পূরণ হবে মনোবাসনা, সমাধান মিলবে হাজার মুশকিলের। লোক মুখে এমন খবর পেয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন ছুটে আসছে মানসিক রোগী, প্রতিবন্ধী, বাত ব্যথা, সাপে কাটা, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাসহ হাজার-হাজার মানুষ।

জানা যায়, প্রায় দুই মাস আগে উজ্জল মিয়ার মা হেনা আক্তারকে বাড়ির পাশে লাকড়ি কুঁড়াতে গেলে সাপে দংশন করে। পরে বাড়িতে এসে বিষয়টি জানালে সাপের বিষ অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে উজ্জল নাকি নিজের শরীরে নিয়ে নেয়। বিষয়টা জানাজানি হলে প্রথমে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা দেওয়া শুরু করে উজ্জল। তারপর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কাঁচি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তার ঝাঁড় ফুক তেল ও পানি পড়া নিতে শত শত  মানুষের ঢল নামে।

এ তেল ও পানি পড়ার বিনিময়ে কোনো টাকা বা উপহার নেন না বর্তমানে ‘কাঁচি কবিরাজ’ হিসেবে পরিচিত উজ্জল।

প্রতিদিন তেল ও পানিতে তার দেওয়া ঝাঁড় ফুঁক নিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার মানুষ এখানে আসছেন। 

কিশোরগঞ্জ থেকে প্রতিবন্ধী ছেলে রাছেলকে (১৫) নিয়ে আসা বাদল ফকির বলেন, ‘আমার পাশের গ্রামের এক বোবা মেয়ে নাকি এখানে এসে ভালো হয়েছে, তাই আমার ছেলেকে নিয়ে আসলাম। দেখি আল্লায়্ কি করে। ওই বিশ্বাস থেকেই এখানে আসা।’

নেত্রকোনা থেকে আসা সুফিয়া বেগম (৭০) কোমরে বাত-ব্যথার সারাতে এখানে এসেছেন। এটা তার চিকিৎসার  দ্বিতীয় দিন। নিয়মমাফিক মোট ৩ দিন এখানে আসতে হবে তাকে।

ওই বৃদ্ধা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলেন, ‘বাবারে যে নিয়ম দিছে কবিরাজ ওইডা আমি মাই না (মেনে) চলবার পারতামও না। আমার কম্মর (কোমর) বেদনাও (ব্যথা) বালা অইতো না।’  

অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপজেলার বাসট্যান্ড থেকে ওই এলাকার অটোরিকশা চালকসহ স্থানীয় কয়েকজনের একটি চক্র আগত নারী-পুরুষদের আগ্রহের সাথে জানাচ্ছেন রোগ মুক্তির গল্প। দাবি করছেন নিজের চোখে দেখারও।

আসাদ নামের এক যুবক বলেন, তার পরিচিত বেশ কয়েকজন বাত-ব্যথা, অন্ধ, বোবা, শ্বাসকষ্টের রোগীরা এখানে এসে সুস্থ হয়েছেন।

এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এস এম আকরাম হোসেন জানান, ‘আমি বিষয়টি খোঁজ নিতে স্বশরীরে দেখতে গিয়েছিলাম। তখন কেউ কেউ বিভিন্ন রোগ-বালাই থেকে ভালো হচ্ছে তাকে জানিয়েছেন। তাছাড়া ওই কবিরাজ তেল ও পানি পড়ার বিনিময়ে কোনো টাকা বা উপহার নিচ্ছেন না।’

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ কামাল জানান, এ বিষয়ে অবগত রয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে শিগগির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢাকাটাইমস/১৩অক্টোবর/প্রতিনিধি/ওআর

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত