জজ মিয়া উপাখ্যান

তায়েব মিল্লাত হোসেন
 | প্রকাশিত : ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ১১:৪৮

এই শহরে আমাদের এই ঢাকায় এই যে একুশ শতকের দেড় যুগ পার হতে চলেছে, এই সময়ে আলোচিত চরিত্র কারা? মুখে মুখে উচ্চারিত নামগুলো কী কী? যদি এ রকম কোনো তালিকা হয়, নিশ্চিত তাতে জায়গা পাবেন জজ মিয়া। কিন্তু সবার কাছে যিনি জজ মিয়া, তিনি আসলে জজ মিয়া নন। জজ মিয়া কাল্পনিক চরিত্র। বানানো নাম। আষাঢ়ে গল্প। রূপকথা। নাটক। জজ মিয়া উপাখ্যান। তার নাম বলতেই আমাদের মনের পর্দায় যে মুখখানি ভেসে ওঠে, তিনি তো আদতে মোহাম্মদ জালাল। জজ মিয়ার কাহিনি তাই জালালের গল্প। বাস্তবের মানুষটির গল্প বড় বাস্তব, বড় করুণ।

ইসায়ী সন ২০০৪। গুলিস্তান স্টেডিয়ামপাড়ার পথব্যবসায়ী জালাল। পায়ে চলা পথের ধারে সিডি ক্যাসেট পোস্টার বিক্রি করেন। ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলা হলো। নেতাকর্মীরা মানববর্ম বানিয়ে তাদের প্রাণপ্রিয় জননেত্রীর প্রাণ রক্ষা করেন। আহত-নিহত শত-শত। গুলিস্তান, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, জিরো পয়েন্ট তথা নূর হোসেন চত্বরে কেবল রক্ত আর রক্ত। কান্না-শোক-ভয়-আতঙ্ক-গোঙ্গানি-কাতরানি-আহাজারি। যেন কেয়ামত নেমে এসেছে। এই নারকীয় তাণ্ডবের দিন জালাল ঢাকায় নেই। নোয়াখালীর সেনবাগে গ্রামের বাড়িতে। আওয়ামী লীগ আর শেখ পরিবারের বিরুদ্ধে আরেক নৃশংস আগস্ট আসার খবর পেলেন টিভি দেখে। এখন দিনবদল হলেও একুশ বছরের অন্ধকার যুগ পাড়ি দিয়ে এসেছে এই দেশ। দেড় দশক আগেও নোয়াখালীতে বর্তমান ছিল সেই প্রভাব। আওয়ামী লীগ করেন এমন মানুষ ছিল খুব কম এলাকায়। তবু গ্রেনেড হামলার খবরে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। তাতে শামিল হন যুবলীগকর্মী জালাল। নৃশংসতায় বিক্ষুব্ধ হন, ফেটে পড়েন প্রতিবাদে।

মাস কয়েক পরে এসে এই জালালকেই যে করা হবে গ্রেনেড হামলা মামলার আসামি, অন্যতম হোতা- তা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেন না জালাল। এত এত মানুষ থাকতে তিনি কেন? আসলে কপালের ফের তার। আগের শতকের একেবারে শেষদিকে পুরান ঢাকার যে মেসে থাকতেন, সেখানে তারই অজান্তে থাকত কতিপয় অপরাধী। তাদেরই কারণে একটি বিস্ফোরক মামলায় ফেঁসে যেতে হয় জালালকে। পুলিশের খাতায় নাম উঠে যায় তার। তবে বাড়িওয়ালা তার হয়ে সাক্ষী দেন। ২০০০ সালের দিকে জামিন পান। তারপর আবার ক্ষুদ্র ব্যবসা। সংসারের আয়-উন্নতির দিকে নজর। কিন্তু গ্রেনেড হামলার অভিযোগে আটক, গ্রেপ্তারে পাল্টে যায় জালালের জীবন, জীবনের গল্প।

পুলিশ এসে গ্রামের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় তাকে। প্রথমে কিছুই বুঝে উঠতে পারেন না। তিনি তো বঙ্গবন্ধুর অনুসারী। শেখ হাসিনার ভক্ত। তিনি কেন গ্রেনেড হামলা করতে যাবেন! ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। জানেন না কিছুই। সেই ঘটনায় গ্রেপ্তার কেন? জালালের মনে প্রশ্ন আর প্রশ্ন। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা লিখে রেখেছেন চিত্রনাট্য। সেই মতো বলতে হবে, কসুর স্বীকার করে নিতে হবে জালালকে। গ্রেনেড হামলা কেন, কীভাবে, কারা কারা যুক্ত- সেই জোট সরকারের অনুগত কিছু নিরাপত্তা-কর্তার বয়ানমতো আদালতে বলতে হবে তাকে। প্রথমটায় মিথ্যাকে সত্য বানাতে নারাজি থাকেন জালাল। জলজ্যান্ত অসত্য বয়ান কেন বলতে হবে তাকে। বিপরীতে নেমে আসে অত্যাচার। পেটানো হয় বৈদ্যুতিক পাখায় ঝুলিয়ে। তবু অনড় থাকেন জালাল। ত্যক্ত-বিরক্ত কর্তারা এবার তাকে হুমকি দেন, হুঁশিয়ারি দেন। হয় তাদের মনমতো বলতে হবে, নয়তো আরো কিছু মামলায় জড়িয়ে সরাসরি ক্রসফায়ারে দেয়া হবে। এই ভয় দেখানোতে কাজ হয়। জিম্মি হয়ে পড়েন জালাল। জীবন বাঁচাতে তাদের মতো করেই বলতে থাকেন। তারা আশ্বাস দেয়, ‘তুমি রাজসাক্ষী হবে, তুমি খালাস পাবে। আমাদের মনমতো যত দিন থাকবা, তত দিন তোমার সংসারও দেখব।’

‘জজ মিয়া’র বানানো কাহিনি যাতে বাইরে ফাঁস না হয় তার জন্য সদা-সতর্ক পুলিশ। জালালের পরিবার গোয়েন্দা মারফত মাসে মাসে পেতে থাকে ৩-৪ হাজার করে টাকা। জীবনের মায়ায়, পরিজনদের নিরাপত্তায় তদন্তকারীদের শেখানো বুলিই আদালতে বলতে থাকেন জালাল। কিন্তু মিথ্যে দিয়ে বেশি দূর যাওয়া যায় না। সত্য চাপা দিয়ে রাখা যায় না। একটা সময় বেরিয়ে আসে। যদিও গণমাধ্যমের কাছে, সাংবাদিকদের কানে যাতে কিছু না যায়, সাজানো ‘জজ মিয়া’ যাতে ‘জালাল’ হতে না পারেন, তার জন্য সব বন্দোবস্ত পাকা করতে বিছিয়ে রাখা ছিল নিদ্র নিরাপত্তা চাদর। এত উদ্যোগের পরও বেহুলার লোহার বাসরের মতো ঠিকই ছেদ থেকে যায়। বাংলাভিশনের সাংবাদিক শারমিনকে জালালের ছোট বোন মুখ ফসকে বলে ফেলেন সত্যিটা, ‘সংসারের খরচ জোগায় সিআইডি।’

আসামির সংসার কেন সামলায় পুলিশ? প্রশ্ন প্রশ্ন প্রশ্ন। কেঁচো খুঁড়তেই বেরিয়ে পড়ে সাপ। বাংলার ইতিহাসে উন্মোচিত হয় নতুনধারার এক আষাঢ়ে গল্প। যার কাছে হার মেনে যায় রূপকথাও। যা শোনাতে গিয়ে শিউরে ওঠেন জালাল। তবে শেষটায় শোনান আশার কথাই। গ্রেনেড হামলার মামলার পুনঃতদন্তে তিনি খালাস পান। এবার ১৪ বছর পর গ্রেনেড হামলার মামলার রায় হয়েছে। আসল দোষীরা এখন সাজার মুখে। বিষয়টি নিয়ে সন্তোষের কথা জানান জালাল। তবে তারেক রহমানের ফাঁসির রায় হয়নি, হয়েছে যাবজ্জীবন- এ নিয়ে কিছুটা নাখোশ তিনি। সবটা মিলিয়ে?

‘হিসাব করতে গেলে নতুন জীবন পাইছি। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী আছে?’- এই তার জীবনের অঙ্ক।

একদিন নটে গাছটিও মুড়িয়ে যায়। এই সময় থেকে শোনা শেষ হয় জালালের গল্প। সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকুন তিনি। কিন্তু ভয়ডরহীন জীবনের খোঁজ পাবেন তো? এবার রায়ের পর বাড়িওয়ালা সুধায়, আগে তো পরিচয় দিয়ে বাসা ভাড়া নেননি। এখন জালালের কারণে তিনি কোনো বিপদে পড়ে যাবে কি না। এ কারণেই কাউকে বাসায় নেন না জালাল।

আবার আগস্ট এলে যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ-সাক্ষাৎ বেড়ে যায়, তারপরে এসে বাসা পাল্টে ফেলেন। আর দশজনের মতোই সাধারণ জীবন চান তিনি। জজ মিয়ার ভ‚ত থেকে মুক্তি চান জালাল। কারও সাজানো ছকে কোনো জালালকে যেন জজ মিয়া হতে না হয়; সরকারে, কোনো দলে বা অন্য কোথাও এমন চিত্রনাট্যকার, এমন ষড়যন্ত্রীর উদ্ভব যাতে আর না হয়; তেমন এক সোনার বাংলার স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রতিদিন ঘুমোতে যান। কিন্তু জজ মিয়া আতঙ্কে আরামের ঘুম আর নেই জালালের জীবনে!

সারাংশ

একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় বাবরের সাজা মৃত্যুদণ্ড। তারেকের সাজা যাবজ্জীবন। মোট দণ্ডিত ৪৯। কেউ কেউ বিএনপির নীতিনির্ধারক। এদের আষাঢ়ে গল্পে ফেঁসে যাচ্ছিলেন জনৈক জালাল। তাকে জজ মিয়া বানানোর ষড়যন্ত্রীরা শেষে ধরা পড়ে যায়।

তায়েব মিল্লাত হোসেন: ঢাকাটাইমস ও এই সময়-এর সহযোগী সম্পাদক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত