সৎকর্মের প্রাণ

কাজী আবুল কালাম সিদ্দীক
 | প্রকাশিত : ২০ অক্টোবর ২০১৮, ১০:৩২
ফাইল ছবি

প্রতিটি কাজের ধারণা অথবা আদেশ অথবা প্রারম্ভ প্রক্রিয়া যেখান থেকেই আসুক না কেন, সিদ্ধান্ত নিতে হয় ব্যক্তিকেই। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে এ নিয়ে ভাবতে হয়, ভালো-মন্দ ফলাফলেরও একটা অগ্রিম রূপ দেখে নেয় মনে মনে। এঁকে নেয় কর্মনীতি ও কর্মপন্থার রূপরেখা। তবে সবকিছুই নির্ভর করে এমন এক মৌলিক গুণের ওপর, যার নাম নিয়ত বা সংকল্প অথবা ইচ্ছা। এই নিয়ত বা ইচ্ছার পরিপ্রেক্ষিতেই মোড় নেয় কাজের ধরন, গতি, ধারা এবং ফলাফল। ভালো ও মন্দ কাজের শুরুটা মূলত নিয়তের দ্বারাই হয় এবং ইচ্ছার প্রভাবেই বিভাজিত হয়।

ইখলাস বলতে যা বোঝায় তা হলো ইচ্ছার স্বচ্ছতা বা একনিষ্ঠতা। পৃথিবীর যে কোনো আদর্শে, যে কোনো কাজেচাই তা ভালো হোক কিংবা মন্দ, ইখলাসই পৌঁছে দিতে পারে সাফল্যের দোরগোড়ায়। দোরগোড়ায় এ জন্য যে, অনেক ক্ষেত্রে কোনো কার্যের সফলতা ভাগ্যে না থাকলে সঠিক ইখলাস ও কর্মতৎপরতা সত্ত্বেও ব্যক্তি ব্যর্থ হয়। এটা একান্তই তাকদিরের বিষয়। কিন্তু ব্যক্তির উচিত যে কর্ম সাধন করার ইচ্ছা বা নিয়ত করেছে, তাতে পরিপূর্ণ আন্তরিক হওয়া, বিশুদ্ধতা পোষণ করা। আর সৎ কার্যাবলির ক্ষেত্রে তো এর কোনো বিকল্প নেই। কেননা, সৎ কাজ আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার প্রধান শর্তই হলো নিয়তের বিশুদ্ধতা।

আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বর্ণনা করেন, আমি রাসুলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, সব কাজের প্রতিফল কেবল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তিই নিয়ত অনুসারে তার কাজের প্রতিফল পাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসুলের (সন্তুষ্টির) জন্য হিজরত করেছে, তার হিজরত আল্লাহ ও রাসুলের সন্তুষ্টির জন্য সম্পন্ন হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। পক্ষান্তরে যার হিজরত দুনিয়া হাসিল করা কিংবা কোনো নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে সম্পন্ন হবে, তার হিজরত সে লক্ষ্যেই নিবেদিত হবে। (বুখারি)

পবিত্র কোরআনে ইখলাস সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত রয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি আমাদের সঙ্গে আল্লাহর ব্যাপারে বিতর্ক করছ অথচ তিনি আমাদের রব ও তোমাদের রব? আর আমাদের জন্য রয়েছে আমাদের আমলগুলো এবং তোমাদের জন্য তোমাদের আমলগুলো এবং আমরা তার জন্যই একনিষ্ঠ। (সূরা বাকারা : ১৩৯ )

উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- একটি সেনাদল কাবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আক্রমণ চালাতে যাবে। তারা যখন সমতলভূমিতে পৌঁছবে, তখন তাদের সামনের ও পেছনের সব লোকসহ ভূমিতে ধসিয়ে দেয়া হবে। হজরত আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন : হে আল্লাহর রাসুল! কীভাবে আগের ও পরের সব লোকসহ তাদের ধসিয়ে দেয়া হবে? যখন তাদের মধ্যে অনেক শহরবাসী থাকবে এবং অনেকে স্বেচ্ছায় ও সাগ্রহে তাদের সঙ্গে শামিল হবে না? রাসুলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : আগের ও পরের সব লোককেই ভূমিতে ধসিয়ে দেয়া হবে। অতঃপর লোকদের নিয়ত অনুসারে তাদের পুনরুত্থিত করা হবে। (বুখারি)

হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ্ আল-আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এক যুদ্ধে শরিক হলাম, তখন তিনি বলেন, মদিনায় এমন কিছু লোক রয়েছে, তোমরা যেখানেই সফর কর এবং যে উপত্যকা অতিক্রম কর, সেখানেই তারা তোমাদের সঙ্গে থাকে। রোগ-ব্যাধি তাদের আটকে রেখেছে। (মুসলিম)

ভালো কাজ কমবেশি সব মানুষই করে থাকে। যারা দুনিয়ার জীবনকেই একমাত্র জীবন মনে করে, মৃত্যুকেই মানবের নিঃশেষ বলে বিশ্বাস করে কিংবা সত্য দ্বীনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে না, তাদের সৎকর্মের ফলাফল কোনো না কোনোভাবে আল্লাহ্ দুনিয়াতেই দিয়ে থাকেন। কেননা, আখেরাতে প্রতিদান পেতে হলে শর্ত হলো সৎকর্মের সঙ্গে ইমানের সংযুক্তি। অতএব, যারা সৎকর্ম শুধু জনকল্যাণ, সততার বহিঃপ্রকাশ কিংবা একান্ত নিজস্ব প্রয়োজনে সম্পাদন করে থাকে তারা পার্থিবতায় যা পায় একজন ইমানদার ব্যক্তিও তা থেকে বঞ্চিত হন না। পার্থক্য হলো মুমিন ব্যক্তি তার ইমানের দাবি হিসেবে, তার প্রভুর আদেশ হিসেবে এবং তার আখেরাতের পুঁজির অতিরিক্ত কিছু হিসেব করেই সৎকর্মের নিয়ত বা ইচ্ছা করে থাকে।

তাই উভয়ের কর্ম এক হলেও প্রতিদানের পার্থক্য ব্যাপক। তদুপরি মুমিনদের মধ্য থেকে কেউ যদি সৎকর্মের জন্য অসৎ নিয়ত বা ইচ্ছা পোষণ না করে, কপটতা করে, কূটকৌশল সম্পাদনের জন্যই সৎকর্ম করে কিংবা ইত্যকার যাবতীয় ইখলাস পরিপন্থী ইচ্ছার ফলে সত্কর্ম সম্পাদন করে, তবে তার এই সৎকর্ম দুনিয়ার উদ্দেশ্য সফল করতে পারলেও আখেরাতে তা কোনোই কাজে আসবে না; বরং অসৎ উদ্দেশ্যে সাধিত সৎকর্মই তার জন্য পাপ বয়ে আনবে ও জাহান্নামের কারণ হয়ে যাবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, অনুবাদক

সংবাদটি শেয়ার করুন

ইসলাম বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত