পাসপোর্ট বিড়ম্বনা!

সাইফ রহমান
 | প্রকাশিত : ২০ অক্টোবর ২০১৮, ১২:১২

নিয়ত করলাম পবিত্র ওমরাহ পালন করতে যাবো৷ সরাসরি আল্লাহর ঘর, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা মোবারাক দেখতে ইদানীং খুব মন টানছে। নিজের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের হালাল টাকায় আল্লাহর ঘর দেখার মধ্যে আলাদা তৃপ্তি। আলাদা মজা। বহিরাগমন করতে হলে পাসপোর্টের প্রয়োজন। কিন্তু আমার পাসপোর্ট নেই। পাসপোর্ট নেই, এই কথাটা অনেকে বিশ্বাস করতে চায় না। জানি না কেন! তারা ভাবে আমি নাকি মজা করছি। আসলেই আমার পাসপোর্ট নেই।

নিজেনিজে যেকোনো কাজ করা ভালো। যদি সেগুলো সাধ্যের ভেতরে হয়ে থাকে। পাসপোর্টের প্রাথমিক যাবতীয় কাজ করা আমার সাধ্যের ভেতরে। এজন্য প্রথমেই মনস্থ করলাম কোনো ট্রাভেলসের মাধ্যমে পাসপোর্ট করাবো না। দেখি আমি পারি কী না! কারো দ্বারস্থ না হয়ে। এক ভাগিনা বললো, মামা! আমি ফরম এনে দিচ্ছি। ফরম পূরণ করলাম। ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে রিসিট কপি এনে ফরমে সংযুক্ত করলাম। এলাকার চেয়ারম্যান সাহেবের মাধ্যমে সত্যায়িত করে পাসপোর্টের পুরো ফাইল রেডি। এখন আমাকে যেতে হবে পাসপোর্ট অফিসে। ফাইল জমা, অরিজিনাল ছবি তুলে ফিঙ্গার দিতে।

সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা সেরে সকাল সাড়ে সাতটায় গিয়ে পৌঁছলাম পাসপোর্ট অফিসে। একজন মানুষ ছাড়া গেইটে কেউ নেই। এখনো যখন কেউ আসেনি, তাহলে যাই একটু হাঁটতে। এমতাবস্থায় পাশের দোকানদার এক ভাইকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম পাসপোর্ট অফিস খুলবে ঠিক নয়টায়। কিছুটা সময় হাঁটা যাবে৷ হাঁটাহাঁটি করে প্রায় নয়টার আগেই চলে আসি পাসপোর্ট অফিসের সামনে।

হায়! ষাট/সত্তরজনের লম্বা লাইন। মেজাজটা এতো খারাপ হইছিল, বলে বোঝানো যাবে না। যাইহোক, লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে চিন্তা করলাম, ফাইলটা জমা দিলেই হলো।

রুমের ভেতরে একজন মানুষ (গ্র্যাজুয়েট পার্সন হয়তো) বসা। উনিই ফাইল জমা রাখেন। কাউকে ভেতরে যেতে বলেন, আবার কাউকে ফেরত দিয়ে দেন। জানালার বাহির থেকে আমরা হাত উঁচু করে ফাইল দিচ্ছি। আমরা গ্র্যাজুয়েট-ননগ্র্যাজুয়েটরা এমনভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ফাইল দিচ্ছি, যেন ভিক্ষুকরা ভিক্ষার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। সিস্টেমটা এমনই। আর ভেতর থেকে ফাইল যিনি জমা রাখেন, উনার এমন ব্যবহার! যেন আসলেই আমরা পাসপোর্টের জন্য ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে ভিক্ষার জন্য আসছি!

যাইহোক, এবার আমার পালা। উনার হাতে ফাইল দিলাম। ফাইলটা কয়েকবার উল্টেপাল্টে দেখে বললেন, পেশা প্রাইভেট সার্ভিস। প্রাইভেট সার্ভিসের কাগজ আছে? বললাম জ্বি না। আমি কোথাও জব করি না। আমার ব্যক্তিগত কাজ করি। পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছি। এজন্য প্রাইভেট সার্ভিস লেখা। তিনি বললেন, প্রাইভেট সার্ভিসের জন্য আলাদা কোনো অফিসের কাগজ লাগবে। সার্টিফিকেট অথবা প্রসংশাপত্র লাগবে। মেজাজটা আবারো খারাপ হলো। বললাম আমি কোথাও জব করি না, তারপরেও প্রাইভেট সার্ভিসের কাগজ কোথায় পাবো? যান যান, নিয়ে আসুন। একটার ভেতরেই চলে আসবেন পারলে। আমি থাকবো। লম্বা লাইন, অপেক্ষা করতে করতে সোনার হরিণের কাছে এসেও ধরতে পারলাম না!

কী আর করা! এখন যে কারো সাহায্য নিতেই হবে। পরিচিত একটা ট্রাভেলসের স্বত্ত্বাধিকারীকে লাগালাম ফোন। তিনি বললেন, আসো। আমার অফিসে জব করেন বলে একটা সার্টিফিকেট দিয়ে দেব। পরে ভাবলাম, আমি বারবার 'জব করি না' বলার পরও সার্টিফিকেট নিয়ে গেলে যদি প্রবলেম হয়! আর এটা তো মিথ্যা কথাও। এই সাত-পাঁচ ভেবে বললাম- ভাই, আসছি। গেলাম ট্রাভেলসে। উনি বললেন, এভাবে হবে না। যদিও হয় তাহলে আরও মিনিমাম তিন থেকে চারবার তাদের অফিসে ঘুরতে হবে। তারপরেও পাসপোর্ট পাবেন কী না সন্দেহ আছে। পেরেশান, সময় নষ্ট, টাকাও কম নষ্ট হবে না! তারচেয়ে তেরশ টাকা দিন, আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তবে টাকা আমি নেবো না, জাস্ট টাকা দেওয়ার একটা মাধ্যম হচ্ছি। উনি কাকে যেন ফোন দিয়ে আমাকে পাঠালেন পাসপোর্ট অফিসে। বললেন, এই নাম্বারে ফোন দিও। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আর কিচ্ছু লাগবে না।

গেলাম। কথামতো ফোন দিয়ে একজন ভাইর দেখা পেলাম। উনি আমার হাত থেকে ফাইল নিয়ে কী যেন একটা সিল মেরে এবং নাম লিখে পাঠিয়ে দিলেন জমা দিতে। বললেন, যদি উনি এবারও জমা না নেন তাহলে আমাকে ফোন দিও। আমি নিজে আসবো। এবার তেরশ টাকায় ম্যাজিকের মতো কাজ হয়ে গেল। ফাইল হাতে নিয়ে আবার উল্টেপাল্টে দেখে বললেন, কেন যেন আপনাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম! মুখের উপর বলে দিতে চাইছিলাম তেরশ টাকার জন্য। কিন্তু বলিনি, বললাম দেখেন আপনিই। কেন ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমাকে কেন ফিরিয়ে দিয়েছেন, উনি নিজেই জানেন না। আর জানবেন-ই বা কী করে! আমার ফাইলে যে কোনো অসঙ্গতি নেই। কিছুক্ষণ পর বললেন ওহ আচ্ছা! ঠিকাছে আপনি একশ তিন নাম্বার রুমে যান। ব্যস হয়ে গেল। পুলসিরাতের প্রথম ধাপ অতিক্রম করলাম।

আমার মতো এভাবে অনেককে ফিরিয়ে দিয়েছেন। দূর-দূরান্ত থেকে আগত মানুষদের ট্রাভেলসের মাধ্যমে ‘ঘুষ’ না দেওয়ার কারণে। আহ! কী কষ্ট। সেদিন আমি বুঝেছি। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকাল পাঁচটা।

একজন ভাই বললেন, দেখেন ভাই! কত কষ্ট করে চেয়ারম্যানের সিগন্যাচার নিয়ে এসেছি। কিন্তু উনি বলছেন ফেইক। যাদেরটা ফেইক তাদেরটা ধরছেন না। আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। অরিজিনাল থাকা সত্ত্বেও। ট্রাভেলসাররা ক'টা পাসপোর্ট দেয় অরিজিনালভাবে সত্যায়িত করে! সবই তো ফেইক। সিল বানিয়ে নিয়ে নিজেরাই সিগন্যাচার দিয়ে দেন। তারপর উনাকে বললাম ভাই, এদেশ ভালো মানুষের থাকার জায়গা না। কী করবেন, কোনো ট্রাভেলসারকে ধরে কিছু ঘুষ খাওয়াইয়া দেন। দেখবেন কাজ হয়ে যাবে।

একশ তিন নাম্বার রুমের সামনে কী লম্বা লাইন! বাহিরের দেশের কেউ দেখলে নির্দ্বিধায় বুঝবে এখানে অসহায় ফকিররা লাইন ধরছে। রোহিঙ্গারা যেভাবে লাইন ধরে ত্রাণ নেয় (পত্রিকায় দেখেছি), ঠিক সেভাবেই সবাই একটা ফাইল হাতে নিয়ে লাইনে। কচ্ছপ গতিতেও লাইনটা সামনে যাচ্ছে না। পাঁচ মিনিট পরপর একজন একজন করে আগাচ্ছে। আমরাও আগাচ্ছি। দেশও এভাবেই আগাচ্ছে। উন্নয়নের জোয়ারে সব টালমাটাল।

লাইন শেষে গিয়ে দেখি একটা রুমে পাঁচটা চেয়ার। পাঁচটার মধ্যে তিনটা খালি। দুইটাতে বসে দু'জন কাজ করছেন। অন্যান্যরা কই! সরকারি চাকরি। লম্বা বেতন পাচ্ছেন। আমাদের কাছ থেকে ঘুষ নিচ্ছেন। এবার লম্বা ছুটি নিয়ে বউবাচ্চাকে যদি সময় না দেন, তাহলে কীভাবে হবে! সোনার বাংলাদেশ এভাবেই দিনদিন উন্নত হচ্ছে। ডিজিটালের ছোঁয়ায় এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারি লোকরা আর তাদের দলের নেতাকর্মীরা ভালো করেই ইনকাম করছে, সাথেসাথে সুবিধাও পাচ্ছে। আর আমরা সাধারণ জনগণ প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত হচ্ছি...।

সাইফ রহমান: তরুণ উদ্যোক্তা, সিলেট

সংবাদটি শেয়ার করুন

নির্বাচিত খবর বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত