নুরুল আমিনের জীবন সংগ্রাম

কাজী রফিকুল ইসলাম, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৮, ০৯:২১ | প্রকাশিত : ২২ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:৫৯

জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে মোহাম্মদপুরগামী বাসে উঠতে চাইতেই বাধা। ‘পরে ওঠেন, আগে নামতে যাত্রী নামতে দেন’-রীতিমতো নির্দেশের কণ্ঠে বললেন ভেতর থেকে একজন।

দৃষ্টি পড়ল তিন ফুট উচ্চতার একজন মানুষের দিকে। তার পা নেই একটিও। সাধারণত এই ধরনের লোকদেরকে বাসে দেখলে কেউ ভাববে বুঝি তিনি ভিক্ষা করতে উঠেছেন। মিনিট দুয়েক পরেই অবাক হতে হলো। তিনি আসলে ভিক্ষুক নন। চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করেন।

তার নাম নুরুল আমিন। ভাড়া তোলার ফাঁকে ফাঁকে কথাও বললেন। জানা গেল, ২১ বছর বয়সী এই তরুণ জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। কোমরের নিচের অংশ অকেজো। নিজের পায়ে ভর করে কখনও দাঁড়ানো হয়নি। কিন্তু গত সাত বছর ধরেই তিনি পরনির্ভরও নন। নিজের আয়ের সংস্থান তিনি পরিশ্রম দিয়েই করেন।

দরিদ্র পরিবারের সন্তান নুরুলের পুরো জীবনটাই একটা যুদ্ধ। ১৪ বছর বয়স থেকে শুরু তার আয় করার চেষ্টা। জীবিকার তাগিদে এবং স্বনির্ভর হতে বিভিন্ন সময়ে টুকিটাকি কাজ করেছেন। ১৬ বছর বয়স থেকে কাজ করছেন বাসে।

২০১২ সালে মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল রুটে চলাচলকারী সিটি বাসে চালকের সহকারী হিসেবে যোগ দেন নুরুল। বর্তমানে কেরানীগঞ্জ ঘাটারচর থেকে মতিঝিল রুটে চলাচলকারী মিডলাইন বাসে কাজ করেন। যাত্রীদের থেকে ভাড়া আদায়ের দায়িত্বটা তার।

বাসে এই কাজ করাটা তো চ্যালেঞ্জিং। এই পেশায় কেন আসলেন- এমন প্রশ্নে নুরুল বলেন, ‘মনে হইছিল এই কাজটা করতে পারব। পরিচিত একজন মানুষ ছিল, তার মাধ্যমে চেষ্টা করলাম। হয়ে গেল।’

শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না- জানতে চাইলে জবাব আসল, ‘না, কাজ পেতে সমস্যা হয় নাই। আমার সমস্যাকে কেউ বড় মনে করে নাই। সহযোগিতা চাইছি, সবাই সহযোগিতা করছে, কাজ দিছে।’

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয় নুরুলকে। ভোরে বাসা থেকে রিকশায় করে আসেন ঘাটারচরে। সেখান থেকে উঠেন বাসে। এরপর দিনভর করেন পরিশ্রম।

কাজের মধ্যেই খাওয়াদাওয়া করেন। এ জন্য যেতে হয় হোটেলে। বাস থেকে নেমে হাতে ভর দিয়েই যেতে হয় সেখানে। কারও সহায়তায় বসেন চেয়ারে।

গণপরিবহণগুলোতে ভাড়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক একটি নিত্য চিত্র। নুরুলকে আগে থেকে চেনে এমন যাত্রীদের থেকে জানা গেল, তিনি যে বাসে থাকেন অন্তত সে বাসের চিত্রটা ভিন্ন। যাত্রীরা যেমন ভাড়া নিয়ে আপত্তি করেন না, একইভাবে নুরুলও কখনো বাড়তি ভাড়া দাবি করেন না।

ধানমন্ডি থেকে মতিঝিল রুটে নিয়মিত চলাচল করেন মো. বাবুল। বলেন, ‘ছেলেটাকে অনেক দিন্ন ধরে দেখছি।  কষ্ট করে। অন্য বাসে ভাড়া নিয়ে কন্টাকটারদের সাথে ঝামেলা হয়। আমার না হয়, অন্য কারো হয়। কিন্তু এক মাত্র এই ছেলেটা যে বাসে থাকে সেখানে কোনো ঝামেলা হয় না। কেউ ওরে ঠকাতে চায় না। আর ছেলেটাও যথেষ্ট ভদ্র, আমিও ওরে কখনো ভাড়া বেশি নিতে দেখিনি।’

বাসে ভিড় থাকলে এর ফাঁকেই ঠেলে ভাড়া কাটেন নুরুল।

যাত্রী বেশি থাকলে সমস্যা হয় না?- জানতে চাইলে জবাব আসে, ‘না, মানুষ আমারে সাহায্যই করে। তারা জায়গা করে দেয় যাওয়ার জন্য।’

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বোটঘাট এলাকার বাসিন্দা নুরুল। থাকেন সপরিবারে। তবে বিয়ে করা হয়নি। বাবা-মা, ভাই-বোনদের দিয়ে তার সুখের সংসার। পরিবারের অন্য সদস্যদের মত পরিবারে তার গুরুত্বের জায়গাটাও বেশ শক্ত। তার প্রতিবন্ধকতা তাকে ছোট করেনি। বরং অল্প বয়সে নেয়া সিদ্ধান্তেই তিনি সফল।

ঢাকাটাইমস/২২অক্টোবর/কারই/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত