ঐক্যফ্রন্টের এ কী রকম গণতন্ত্র?

শেখ আদনান ফাহাদ
 | প্রকাশিত : ২২ অক্টোবর ২০১৮, ১৬:০৮

তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’ উদ্ধার করার নামে বিএনপি এবং বিগত যৌবনা ও প্রায় সাবেক কয়েকজন রাজনীতিককে নিয়ে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ করেছেন ড. কামাল হোসেন। মানুষের মধ্যে এ নিয়ে তেমন প্রভাব লক্ষ্য করা না গেলেও মিডিয়াতে বেশ খবর হচ্ছে ঐক্যফ্রন্ট।

আবার বিকল্পধারার এই ঐক্যে যোগ না দেয়া দিয়ে ঘটেছে আরেক কাণ্ড। দলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিবকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন কমিটির ঘোষণা দিয়ে বসেছেন কয়েকজন নেতা। এর পেছনে আবার বিএনপির হাতের অভিযোগ করেছেন বিকল্পধারার মাহী বি চৌধুরী। এ অভিযোগ সত্য প্রমাণ হলে তো শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেল ঐক্যফ্রন্টের ‘গণতন্ত্রের পথে যাত্রা’।

নির্বাচন আসলেই এই ছোট দলগুলো খুব তোরজোড় করে। সাধারণ মানুষ ব্যস্ত নিজেদের কাজ নিয়ে; রাজনীতির নামে তামাশা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কোথায়? কিন্তু মিডিয়া এগুলোকে বড় ইস্যু বানিয়েই ছাড়বে। মানুষ না চাইলেও গণমাধ্যম তো তার নিজের এজেন্ডা সেট করবেই।

ড. কামাল যেদিন বি চৌধুরীকে দাওয়াত দিয়ে বাসা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গিয়েছিলেন, সেদিনই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল এই ঐক্যফ্রন্টের ঐক্যের কী দশা হতে যাচ্ছে। নতুন নাটকে দেখা গেল বিকল্প ধারার চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মহাসচিব আবদুল মান্নান ও যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

কে কাকে বহিষ্কার করে? কীভাবে করে? প্রতিষ্ঠাতাদের ‘বহিষ্কার’ করে  বিকল্প ধারা বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করা হয়েছে! শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেয়া হয়। এ সময় অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারীকে প্রেসিডেন্ট, শাহ আহম্মেদ বাদলকে মহাসচিব ঘোষণা করা হয়!

এদেরকে বহিষ্কার এর ব্যাপারে নুরুল আমিন ব্যাপারী সাংবাদিকদের বলেন, ‘দলীয় গঠনতন্ত্র অনু্যায়ী বিকল্প ধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান ও যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরীকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়া হলো।’

শাহ আহম্মেদ বাদল বলেন, ‘বি. চৌধুরী অত্যন্ত ভালো মানুষ। কিন্ত তার ছেলে মাহী বি চৌধুরীর কূটচালে তিনি শেষ পর্যন্ত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিতে পারেননি।’

তারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যাবে বলেও জানান নুরুল আমিন ব্যাপারী। যদিও গত সপ্তাহে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দলের সহ-সভাপতির পদ থেকে শাহ আহম্মেদ বাদলকে বহিষ্কার করা হয়।

অন্যদিকে বিকল্পধারা বাংলাদেশ পৃথক হওয়া বা ভেঙে যাওয়ার পেছনে একটি বড় রাজনৈতিক দলের ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র মাহী বি. চৌধুরী। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, যাঁরা বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট ও মহাসচিবকে বহিষ্কার করেছেন, তাঁরা বহিষ্কৃত হয়েছেন এক মাস আগে। তাঁরা বিকল্পধারার কেউ নন। তিনি বলেছেন, এর পেছনে একটি বড় রাজনৈতিক দলের ষড়যন্ত্র থাকতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষ এখনো দুই দলে বিভক্ত। একদিকে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, অন্যদিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুনর্বাসনকারী সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের বিএনপি।

জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বাড়াবাড়িতে দেশের মানুষ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্জন করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি নির্বাচনে না আসলে জাতীয় পার্টি সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ‘মর্যাদা’ লাভ করে।

প্রায় ১০ বছর ধরে টানা ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা দেশের শুধু দেশবাসীর নয়, পুরো বিশ্বের মধ্যেই নিজেকে অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করেছেন।

বাংলাদেশকে বলা হচ্ছে উন্নয়নের বিস্ময়। দেশের মানুষ নিজের এবং দেশের ভাগ্য বদলে ব্যস্ত। ২০১৩-১৪ সালে বিএনপি-জামায়াত পেট্রোল বোমা সন্ত্রাস করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। মানুষ বিএনপি-জামাতের একটা হরতাল বা অবরোধ কর্মসূচিতেও সাড়া দেয়নি।

সম্প্রতি কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক এর দাবিতে পরিচালিত শিশু-কিশোর আন্দোলন সরকারের সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসলেও প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী সিদ্ধান্তে মানুষের আস্থা পুনর্বহাল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত জরিপেও দেখা গেছে, দেশের ৬৬ শতাংশ মানুষ শেখ হাসিনার উপর আস্থা রেখেছেন।

পুরো দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে দ্রুত। নানা উন্নয়ন সূচকে ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামাতে বিএনপির নেতৃত্বে এক জোট হয়েছে সমস্ত আওয়ামী লীগ-বিরোধী শক্তি।

সর্বশেষ বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস ও মহাসচিব তারেক রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বিএনপির নেতৃত্বের কঙ্কাল আরও পরিষ্কার সামনে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু পশ্চিমাশক্তি বিএনপি জোটকে পেছন থেকে শক্তি জোগালেও দেশের মানুষ খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে না।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরে আইনজীবীদের বিক্ষোভে তারেক রহমানের বিচার দাবি করা ড. কামাল হোসেন তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত বিএনপির জোটেই শেষ পর্যন্ত অংশ নিয়ে দেশের মানুষের সামনে বিরাট প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।

সাজাপ্রাপ্ত আসামি তারেক রহমানের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে কামাল হোসেন কী রকম গণতন্ত্র কায়েম করতে চাচ্ছেন, সেটি একটি বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

ঐক্যফ্রন্টের আরেক কুশীলব মাহমুদুর রহমান মান্না ১/১১ এর সময় মাইনাস টু ফর্মুলার অন্যতম কারিগর হিসেবে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। বিএনপির সাদেক হোসেন খোকার সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘লাশ’ ফেলে দেয়ার অডিও ফাঁস হয়ে গেলে মাহমুদুর রহমান মান্নার বুদ্ধি-শুদ্ধি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জাগে।

কদিন আগে মাহমুদুর রহমান মান্না এমন আরেক মন্তব্য করেছেন যাতে মানুষের হাসতে হাসতে পেট ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেছেন, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা নাকি বাংলাদেশ থেকে ভালো!

যেখানে পাকিস্তানের লোকজন দোয়া করছে, ‘খোদা পাকিস্তান কো বাংলাদেশ বানাদো’, সেখানে মান্নার এমন মন্তব্য এক সময়ের জনপ্রিয় এই নেতার বুদ্ধিমত্তাকে নিদারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, আইএমএফ বলছে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব উন্নয়ন অর্জন করে চলেছে। কিন্তু মাহমুদুর রহমান মান্না বলছেন বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের অবস্থা ভালো!

গণতন্ত্রের নামে আওয়ামী লীগকে হটাতে চায় ঐক্যফ্রন্ট। সেই আওয়ামী লীগ, যে আওয়ামী লীগ দেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই আওয়ামী লীগ, যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের সংগ্রামে অনবরত সফল হয়ে চলেছে।

আসলে আওয়ামী লীগ নয়, ঐক্য ফ্রন্টের টার্গেট শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনাকে থামিয়ে দিতে পারলেই আওয়ামী লীগ থেমে যাবে, বাংলাদেশ থেমে যাবে। যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে সেটি বন্ধ হয়ে যাবে, বাংলাদেশ ফিরে যাবে আবার অন্ধকার যুগে। দেশের মানুষ এত বোকা না। নিজের ভালো সবাই বুঝে। 

লেখকঃ শিক্ষক ও সাংবাদিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত