বিএনপির স্বস্তি, ২০ দলের অস্বস্তি

বাছির জামাল
 | প্রকাশিত : ২৩ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:৩০

একাদশ নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে দেশের রাজনীতির অবয়ব ততই পরিবর্তন হচ্ছে। গত এক সপ্তাহের মধ্যে আগের তুলনায় রাজনীতির মেরুকরণ অনেকটাই স্পষ্ট রূপ পাচ্ছে বলে মনে হয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়েছেÑ যার মধ্যে কামাল হোসেনের গণফোরাম ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, বিএনপি, আ স ম রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য রয়েছে। এছাড়াও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও বিশিষ্ট ব্যক্তি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন এই ঐক্যফ্রন্টে রয়েছেন। তবে কিছু ব্যাপারে ‘বনিবনা’ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত রাজনীতির এই নয়া জোটে সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা থাকেনি। ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বলেছেন, ‘বিকল্পধারার জন্য এখনো নয়া জোটে আসার দরজা বন্ধ হয়নি।’

গঠিত হওয়ার পর জোটটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ক্ষমতাসীন দল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে একেবারে দলটির নিম্নসারির নেতারাও এ কারণে তাদের সাবেক নেতা কামাল হোসেনকে ‘একহাত’ নিতে পিছপা হননি। এ থেকে বুঝা যায়, জোটটি ক্ষমতাসীন দলকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছেÑ যদিও এই জোট গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাগত জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং। তবে জোটটি যখন তাদের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে যাবে তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ দেখেই বুঝা যাবে ক্ষমতাসীন দল জোটটিকে কিভাবে নিচ্ছে। জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব তার উত্তরার বাসায় জোটের নেতাদের এক বৈঠকের পর ইতিমধ্যে জানিয়েছেন যে, সারা দেশেই তারা সফরে বের হবেন। আগামী ২৩ অক্টোবর সিলেটে হয়রত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত ও সেখানে এক সমাবেশের মাধ্যমে তাদের এ কর্মসূচি শুরু হবে। বক্তৃতা-বিবৃতিতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখালেও সামনের কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটুকু সহযোগিতা করবে তার ওপর বুঝা যাবে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন নয়া জোটের ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের সত্যিকার প্রতিক্রিয়া কী।

অন্যদিকে নয়া জোটটি একটি রূপ পাওয়ায় স্বস্তিতে রয়েছে বিএনপি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামের এই জোটটি আগামী নির্বাচনে কেমন ধরনের প্রভাব ফেলবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। এটা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে জোটটি গঠিত হওয়ায় একটি ‘তৃপ্তির ঢেকুর’ যে বিএনপির মধ্যে এসেছে তা বলা যায়। কেননা, এতদিন ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোকে নিয়ে কোনো আন্দোলনই দাঁড় করাতে পারছিল না দুই মেয়াদেরও বেশি ক্ষমতার বাইরে থাকা এই দলটি। তাছাড়া ২০ দলীয় জোটে জামায়াত থাকায় স্বাধীনতা-বিরোধীদের সঙ্গে বন্ধুত্বের দায়ভারের অভিযোগে মোটামুটি একটা কোণঠাসা অবস্থায় ছিল বিএনপি। আবার ভোটের অঙ্কে সব রকম সমালোচনা সত্ত্বেও জামায়াতকে ত্যাগ করতেও চায় না বিএনপি। এমতাবস্থায় ২০ দলীয় জোটকে বাইরে রেখে যারা একসময় প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদেরকে নিয়ে একটা ফ্রন্ট গঠন করায় বিএনপির সেই কোণঠাসা অবস্থাটা অনেকটা কেটে গেছে বলে মনে করে দলটির নেতাকর্মীরা। কেননা, জামায়াতও থাকলো, আবার ক্ষমতাসীন দলের বাইরের ‘প্রভাবশালী ক্যাটালিস্টদের’ একতাবদ্ধ করা গেল।

ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মোহাম্মদ মনসুরকে যতই ‘জনবিচ্ছিন্ন’ মনে করি না কেন, ভোটের হিসাবে গণমানুষের মাঝে তাদের গ্রহণযোগ্যতা তেমন নেই জানলেও, রাজনৈতিক পরিম-লে এদের দাম এখনো কমে যায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের লোকদের একত্রিত করতে পেরেছে বিএনপি। এটাই বিএনপির বিগত ১০ বছরের সরকারবিরোধী আন্দোলনের একমাত্র সফলতা। তবে এই সাফল্যকে আরো চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে বিএনপিকে আরো হিসাব-নিকাশ করতে হবে, কৌশলে অগ্রসর হতে হবে।

বিকল্পধারাকে জোটের বাইরে রাখাটাকে ‘আপাতত সাফল্য’ হিসেবে দেখতে চায় বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, “জোট গড়ার বৈঠকগুলোতে ‘কিছু বিষয়ে’ চাপ সৃষ্টি করে সমস্যা তৈরি করছিল” বিকল্পধারা। বিকল্পধারার নেতারা সংবাদমাধ্যমে আভাস দিচ্ছেন যে, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তারা নানা রকম শর্ত দিচ্ছিলেন বলেই ষড়যন্ত্র করে তাদের বাইরে রাখা হয়েছেÑ এর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এটা একেবারেই অমূলক। এর পেছনে কোনো যুক্তি বা সত্যতা নেই। তারাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, তারা আসবেন না। আগের দিনও তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাদের দাবি বা বক্তব্য আমাদের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে চলে এসেছে। তারা সবাই একমত ছিলেন। সেখানে কেন তারা নতুন ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছেন আমি জানি না।

এরই মধ্যে আবার মশিউর রহমান যাদু মিয়ার নাতি জেবেল রহমান গানির নেত্বত্বাধীন বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ) ও খোন্দকার গোলাম মোর্তুজার নেতৃত্বাধীন এনডিপি ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেছে। দল দুটি গুলশানের এক হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন অভিযোগ এনে ২০ দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়। তারা বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে যে, ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের সঙ্গে জোট করা, নয়া এই জোটের ব্যাপারে ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোকে অন্ধকারে রাখার কারণে তারা আর ২০ দলের সঙ্গে থাকাটা সমীচীন মনে করছে না। এই সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার খানিক পরেই এনডিপির অন্য এক নেতা দলের চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্তুজাকে বহিষ্কার করেছেন, এই খবর পাওয়া গেছে। তারা বলেছে, তারা ২০ দলেই আছেন। কিন্তু বাংলাদেশ ন্যাপের ব্যাপারে এ ধরনের খবর এখনো পাওয়া যায়নি।

২০ দল থেকে বেরিয়ে দল দুটি এখন কী করবে এমন প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে। তারা কী স্বতন্ত্রভাবে রাজনীতি করবে, নতুন কোনো জোট গঠন করবে, নাকি সরকারি দলের জোটে যোগ দেবেÑ এমন প্রশ্ন করলে বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব গোলাম মোস্তফা জানান, তারা আপাতত একাই থাকবে। দেশের চলমান রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করবেন। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে আওয়ামী লীগের তরফে জানা গেছে, তারাও তাদের জোট সম্প্রসারণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০ দল থেকে দুটি দল বেরিয়ে যাওয়া সেই প্রস্তুতির অংশ কি না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তাও পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, রাজনীতির মেরুকরণও নতুন নতুন অবয়বে প্রকাশ পাচ্ছে। বিএনপি চায় ক্ষমতায় যেতে, আওয়ামী লীগ চায় ক্ষমতায় থাকতে। ক্ষমতায় যাওয়া-আসার চক্রে রাজনীতিতে এখন অনেক কিছুই ঘটবে, যা প্রত্যাশিত আবার অপ্রত্যাশিতও হতে পারে।

বাছির জামাল: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত