রাঙামাটিতে ত্রিমুখী লড়াই?

হিমেল চাকমা, রাঙামাটি
 | প্রকাশিত : ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ১২:২২

পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিতে ইদানীং আঞ্চলিক দল জনসংহতি সমিতি- জেএসএসের প্রভাব অস্বীকারের জো নেই। ভোটের ময়দানেও তারা দেখাচ্ছে শক্তি। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এখানে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে লড়াই হলেও ২০০৮ সাল থেকেই লড়াই হচ্ছে ত্রিমুখী। বিএনপি এবারও ভোটে এলে সেখানে লড়াই হতে পারে ত্রিমুখী।

পাহাড়ি এই জেলায় স্বাধীনতার পর বেশিরভাগ নির্বাচনে জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে ২০০৮ সালে জেএসএস জয় পেয়ে যাওয়ার পর তৈরি হয়েছে নতুন মেরুকরণ।

এবারও আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছে, প্রার্থী ঘোষণা না করলেও জেএসএসের প্রস্তুতিও চূড়ান্ত প্রায়। তবে বিএনপির প্রকাশ্য তৎপরতা কম, যদিও প্রার্থী হতে আগ্রহী নেতা আছেন অন্তত দুইজন।

আগামী নির্বাচনে এখানে কোন দল জিতবে, সেটি নির্ভর করছে আঞ্চলিক তিন দল ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট), জেএসএস এমএন লারমা এবং নতুন দল গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফের ওপরও।

পুরো জেলায় আধিপত্য মূলত জেএসএসের। কাউখালী, নানিয়াচর, রাঙামাটি সদর উপজেলার কিছু অংশে ইউপিডিএফের প্রভাব আছে। আর নানিয়াচরে কিছু অংশে শক্তিশালী জেএসএস এমএন লারমা।

নতুন ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের কর্মকা- জেএসএস এমএন লারমা এলাকায় সীমাবদ্ধ। তাই এ দলটিকে অনেকটা জেএসএস এমএন লারমা বলা হয়।
জেএসএস ছাড়া বাকি তিন দলের মধ্যে তুলনামূলক শক্তিশালী ইউপিডিএফ। প্রধান দুই আঞ্চলিক দলের মধ্যে বর্তমানে কোনো বিরোধ নেই।

জেএসএস এমএন লারমা ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের ভোট বরাবর আওয়ামী লীগের নৌকাতেই পড়ে। আর বিগত নানিয়াচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদের উপনির্বাচনে এমএন লারমা দলকে ছাড় দেয় আওয়ামী লীগ।

অন্যদিকে বিভিন্ন মামলায় জর্জরিত ইউপিডিএফের নেতাকর্মীরা। দলের নেতাকর্মীরা পলাতক জীবন অতিবাহিত করলেও মাঠ পর্যায়ে সমর্থক কমেনি। দলের ইশারা পেলে নির্ধারিত প্রার্থীকে ভোট দিতে দেরি করবে না ইউপিডিএফের ভোটাররা।

রাঙামাটি আসনে ইউপিডিএফের প্রার্থী দেওয়ার সম্ভাবনা কম। বর্তমানেও জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যে ঐক্য আছে।

কাকে প্রার্থী করবে জেএসএস?

২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে এই আসন থেকে জিতেন জেএসএসের সহ-সভাপতি উষাতন তালুকদার। তবে তিনিই আবার প্রার্থী হবেন কি না, সেটা নিশ্চিত না।

জেএসএস নেতারা বলেন, প্রার্থী ঘোষণা করা জটিল বিষয় না। দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তার পক্ষেই কাজ করবেন অন্যরা। তবে এখানে তাদের অন্য একটি ক্ষোভ রয়ে গেছে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী থেকে উঠে আসলেও মহাজোট সরকারের প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারের ওপর ক্ষেপে আছেন জেএসএস নেতারা। তাদের অভিযোগ, সন্তু লারমাকে নিয়ে নানা সময় অবমাননাকর বক্তব্য দিয়েছেন দীপংকর। এ কারণে তারা চান এই নেতাকে দেখে নিতে।

ফলে দীপংকরকে হারানো যাবে, এমন কৌশল গ্রহণের কথা জানাচ্ছেন জেএসএস নেতারা। বলছেন, এমনকি তারা হারলেও ক্ষতি নেই, হারাতে হবে দীপঙ্করকে।

জেএসএসের কেন্দ্রীয় কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘নির্বাচন করছি নাকি কাউকে সমর্থন দিচ্ছি তা সময় বলবে। ওই নেতা বলেন, এটি ঠিক যে, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাথে জেএসএসের কোনো বিরোধ নেই।’

আওয়ামী লীগে দীপংকরই ‘একমাত্র প্রার্থী’

নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য ও পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার ছাড়া আপাতত কারও নাম নেই আলোচনায়।

১৯৯৬, ১৯৯৬ সালের ১২ জুন এবং ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে এই আসন থেকে নৌকা প্রতীকে জিতেন দীপংকর। তবে ২০০১ সালে বিএনপি এবং ২০০৮ সালে তিনি হেরে যান জেএসএসের কাছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুছা মাতব্বর বলেন, ‘রাঙামাটি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে দীপংকর তালুকদার ছাড়া বিকল্প নেই। আওয়ামী লীগের দীপংকরের চেয়ে ব্যক্তি দীপংকর তালুকদার বেশি শক্তিশালী। গত পাঁচ বছরে দলও অনেক শক্তিশালী হয়েছে। এবার নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আমরা শতভাগ আশাবাদী।’

তবে দীপংকরে বড় ভয় অবৈধ অস্ত্র। এ অস্ত্র তার বিজয়ে অন্তরায় হতে পারে মনে করেন তিনি। বলেন, ‘বিগত নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্রের জোরে আমার বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা এজন্য এবার অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জোর দাবি করছি।’

তিনি সংসদ সদস্য না হওয়ায় রাঙামাটিকে উন্নয়ন বঞ্চিত থাকতে হয়েছে দাবি করে দীপংকর বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে উষাতন তালুকদার উন্নয়ন করতে পারেননি বরং উন্নয়নে বাধাগ্রস্ত করেছেন। যারা উন্নয়ন কাজের জন্য উষাতনের কাছে গিয়েছে তাদের সরাসরি বলে দিয়েছে তার দ্বারা এ উন্নয়ন সম্ভব নয়। ফলে উন্নয়নের জন্য জনগণ আওয়ামী লীগের কাছে এসেছে।’

জেলার ৫৩টি কেন্দ্রে বিশেষ ব্যবস্থাও দাবি করেছেন এই আওয়ামী লীগ নেতা। এই কেন্দ্রগুলোতে গত নির্বাচনে তিনি হেরে গিয়েছিলেন। এসব কেন্দ্রে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়ার দাবি করে নির্বাচন কমিশনে চিঠিও দিয়েছেন।

কোন্দলে পুড়ছে বিএনপি

বিএনপি এখানে কোন্দলে পুড়ছে। দলটির কেন্দ্রীয় সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক দীপেন দেওয়ানকে মানতে পারছে না জেলা শাখার সভাপতি শাহ আলম। তিনি বলেন, ‘দল মনোনয়ন দেওয়ার আগে অবশ্যই আমাদের মতামতকে গ্রহণ করতে হবে। ত্যাগী নেতাদের প্রার্থী দিলে তারা তার পক্ষে কাজ করবেন।’
অন্যদিকে দীপেন বলেন, ‘মনোনয়ন পেলে রাঙামাটির এ আসনটি উপহার দিতে পারব।’

অতীতের ফলাফল

১৯৯১ সালে বিএনপির নাজির উদ্দিন আহমেদকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হন দীপংকর তালুকদার। ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার কাছে হারেন বিএনপির পারিজাত কুসুম চাকমা।

২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মনি স্বপন দেওয়ানের কাছে হেরে যান দীপংকর।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে দীপংকর তালুকদার বিএনপির মৈত্রী চাকমাকে হারিয়ে আসনটি পুনরুদ্ধার করেন দীপংকর। ওই বছরই প্রথমবার প্রার্থী দেয় জেএসএস। অল্প ব্যবধানে তৃতীয় হয় দলটি।

২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি আর তখন জেতেন জেএসএসের উষাতন।

এক নজরে রাঙামাটি

১০ উপজেলা, ৫২ ইউনিয়ন, দুটি পৌরসভা নিয়ে একটি মাত্র সংসদীয় আসন রাঙামাটি জেলায়। আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় সংসদীয় আসনটি ছয় হাজার ১১৬ বর্গ কিলোমিটারের। এখানে ভোটার সংখ্যা চার লাখ ১১ হাজার ৭৭৪ জন। এর মধ্যে নারী এক লাখ ৯৪ হাজার ৭০ এবং পুরুষ দুই লাখ ১৭ হাজার ৭০৪ জন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত