খেলাপি ঋণের এক লাখ মামলা আটকা

রহমান আজিজ, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ১২:২০

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে খেলাপি ঋণ আদায়ে করা এক লাখের বেশি মামলা আটকে আছে আদালতে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঋণখেলাপিরা স্থগিতাদেশ নিয়ে শুনানি হতে দিচ্ছেন না।

আর এতে আটকে আছে দুই লাখ কোটি টাকার বেশি, যা বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের বাজেটের ৪৩ শতাংশ। এই পরিমাণ টাকা দিয়ে পাঁচটির বেশি পদ্মা সেতু করা যেত। এই অর্থের মধ্যে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা কেবল ব্যাংকিং খাতের। বাকি অর্থ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের।

বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘একেকটা মামলা নিষ্পত্তিতে সাধারণত ৮-১০ বছর লেগে যায়। এত দীর্ঘ সময় আটকে থাকা টাকার ধাক্কা সার্বিক ব্যাংকিং খাতে লাগে। নতুন করে ঋণ দিতে না পারলেও ব্যাংককে আমানতকারীদের সুদ ঠিকই টানতে হয়।’

‘যত দ্রুত এই মামলা নিষ্পত্তি হবে তত দ্রুত ব্যাংকিং খাত তথা দেশের সার্বিক অর্থনীতি উন্নতি হবে।’ উল্লেখ করে এই ব্যাংকার বিচারকদের দেশের অর্থনীতির কথা ভেবে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির আহ্বান জানান।

গত কয়েক বছর ধরে খেলাপি ঋণের বিষয়টি নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। সার্বিকভাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিতরণ করা ঋণের ১০ শতাংশের বেশি ফেরত আসছে না। এ নিয়ে সরকারকে রাজনৈতিক চাপেও পড়তে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। এর বাইরে আরও ৪৫ হাজার কোটি টাকা অবলোপন (রাইট অফ) করা; যা পাওয়ার আশা নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে আলাদা দুটি বেঞ্চ গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন। বলেছেন, এ ব্যাপারে  সরকারের বিশেষ উদ্যোগ নেয়া উচিত।   

সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদও এই মত সমর্থন করছেন। তিনি আলাদা বেঞ্চের পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে আইনজীবীদের ভূমিকাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলছেন।

‘ঋণ নেওয়ার সময় তারা সম্পদ মর্টর্গেজ দেয়। এসব ঋণখেলাপি টাকা ফেরত না দিলে তাদের মর্টগেজ দেয়া সম্পদ বিক্রি করা যেতে পারে। টাকা আদায়ের আরও অনেক পদ্ধতি আছে। তবে আইনজীবীদের এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে।’ বলেন সাবেক আইনমন্ত্রী।

আদালতে এসব মামলা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের করণীয় কিছু নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘ব্যাংকগুলো সর্বশেষ পর্যায়ে মামলার আশ্রয় নেয়। আদালতে মামলা চলাকালে ভালো আইনজীবী নিতে বলা আছে ব্যাংকে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা যায়, চলতি বছরের জুন শেষে বিভিন্ন আদালতে ব্যাংকগুলোর মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭০৫। আর এসব মামলায় আটকে আছে দুই লাখ ১০৭ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের ৪৩.০৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে বাজেটের আকার চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা।

এসব মামলার মধ্যে বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করা মামলার সংখ্যা ৬৫ হাজার ৬৭৬টি। আর এসব মামলায় আটকে আছে প্রায় ৮৮ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। বাকি মামলা করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান।

কেবল বেসরকারি ব্যাংকের করা ৬২ হাজার ৮০০টি মামলার বিপরীতে আটকা ৭১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। আর ১৭ হাজার কোটি টাকা আদায়ে মামলা করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান। আর সরকারি ব্যাংকের করা ৩২ হাজার ৪৭১টি মামলার বিপরীতে ৭১ হাজার ৪২ কোটি টাকা আটকে আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা আছে, বড় বড় ঋণখেলাপিরা নতুন করে ঋণ নিতে বা নির্বাচনে অংশ নিতে উচ্চ আদালতে রিট করেন যেন তাদের ঋণখেলাপি বলা না হয়। ঋণখেলাপিরা এমনিতে নতুন করে ঋণ পাওয়ার যোগ্য না হলেও উচ্চ আদালতে রিট করে তারা নতুন ঋণের আবেদন করেন। 

প্রভাবশালী হওয়ায় তারা ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়ায় ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। কিন্তু বছরের পর বছর তা পরিশোধ করেন না।

এ রকম রিট বিচারাধীন পাঁচ হাজার ৪৩৪টি। আর এতে আটকা ৫৭ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। আর দেউলিয়া, অর্থঋণ ও অন্যান্য আদালতে ৯৫ হাজার ২৭১টি মামলার বিপরীতে আটকে আছে এক লাখ ৪২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা।

ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালিদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘ব্যাংকের টাকা আটকে থাকায় অর্থনীতির অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করছে। যদি এ টাকাগুলো মামলায় আটকে না থাকতো, তবে এ টাকা পুনরায় ঋণ বিতরণ করা গেলে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হতো। নতুন উদ্যোক্তা বাড়ত। এতে করে কর্মসংস্থানও বাড়ত।’  

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর ঋণ যেন খেলাপি না হয়, সেজন্য তাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষকে বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়া আছে। ঋণ বিতরণে সব সময় সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা আছে। এরপরও যদি ব্যাংক ঋণখেলাপি হয় সে ক্ষেত্রে এটি আদায়ে কঠোর নির্দেশনা দেয়া আছে। ঋণগ্রহীতার সঙ্গে যেভাবে সম্ভব সমঝোতা করে খেলাপি আদায় করাই ভালো।’

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল জনাব মুরাদ রেজা ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘খেলাপি ঋণ নিয়ে যেসব রিট আছে তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। তারা উদ্যোগ গ্রহণ করলে এসব মামলা নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। এসব মামলা নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি আলাদা বেঞ্চ গঠন করতে পারেন। আইনজীবীরা উদ্যোগ নিলেই এসব মামলা নিষ্পত্তি হয়ে যাবে।’

(ঢাকাটাইমস/১৪নভেম্বর/আরএ/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত