হিরো আলম ও আমাদের শ্রেণিবিদ্বেষী মন

আফরোজা সোমা
 | প্রকাশিত : ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ১৭:০৮

আমাদের চিন্তাভাবনা কি এখনো তীব্রমাত্রায় ক্লাস নির্ভর বা শ্রেণি সচেতন?

কথাটা মনে এলো হিরো আলমের নির্বাচনী মনোনয়ন ফর্মতোলার পর ‘সুশীল-শিক্ষিত’ ও অপেক্ষাকৃত আর্থিকভাবে সচ্ছল নাগরিকদের ফেসবুক প্রতিক্রিয়া দেখে।’

পাশাপাশি, মেইনস্ট্রিম মিডিয়াতেও তাকে দেখা গেলো।

একটি টেলিভিশনের সংবাদ-বিশ্লেষণী এক অনুষ্ঠানের শ্রদ্ধেয় একজন অতিথি হিরো আলমকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি তো এমনিতেই অনেক বিখ্যাত, আবার রাজনীতিতে আসা কোন উদ্দেশ্যে? কী করতে চান রাজনীতিতে?’

আপাত অর্থে প্রশ্নটি নিরীহই বটে। কিন্তু, ‘অনেক বিখ্যাত’ শব্দটাতে আমার কান আটকেগেছে। তাছাড়া এই শব্দ-দ্বয় ডেলিভারি দেয়ার সময় বক্তার স্বরটাও লক্ষণীয়।

বাংলাদেশে শ্রেণিভেদে হিরো আলমের প্রহণযোগ্যতা, তাকে নিয়ে ফেসবুকীয় সুশীলীয় ট্রল ইত্যাদি বিষয়ে যারা অবগত আছেন তারা এই প্রশ্নটির ডেলিভারি শুনতে-শুনতেই অনুভব করবেন যে, প্রশ্নটিও আসলে একধরনের বুলিং-এরই নামান্তর।

হিরো আলমকে এনে সাক্ষাৎকারের নামে যেভাবে বিনোদন করা হয়েছে বা সার্কাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সেভাবে কি অন্যান্য তারকা যেমন সঙ্গীতশিল্পী কণকচাপা ও বেবী নাজনীন, চিত্রনায়ক সোহেল রানা, অভিনেতা ডিপজল, নায়িকা কবরী ও ময়ূরী ও অন্যান্যদের এনেও করা হয়েছে বা হবে?

কিংবা আমাদের কোটি মানুষের প্রাণপ্রিয় মাশরাফিকে কি এই প্রশ্নটা করা হয়েছে এভাবে গলা টানতে-টানতে যে, ‘আপনি তো এমনিতেই অনেক বিখ্যাত, আবার রাজনীতিতে আসাকোন উদ্দেশ্যে? কী করতে চান রাজনীতিতে?’

এবারে যারা নির্বাচনের মনোনয়ন কিনেছেন, তাদের মধ্যে মাশরাফির চেয়ে বিখ্যাত কে আর আছেন? তাহলে ‘অনেক বিখ্যাত’ শব্দ-বন্ধ কি হিরো আলমের চেয়ে মাশরাফিকেই বেশি মানায় না?

হিরো আলমের এমপি হওয়ার যোগ্যতা নাই থাকতে পারে। তাকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়া নাই হতে পারে। বা চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়া হলেও তিনি ভোটে ফেল করতে পারেন। সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু একজন নাগরিক হিসেবে ‘হিরো আলম’ নিজেকে ‘এমপির আসনে আসীন’ ব্যক্তি হিসেবে কল্পনা করতে পারার সাংবিধানিক অধিকার তার আছে। আর নির্বাচন কমিশনের বিধি-বিধানও তাকে দিয়েছে মনোনয়ন ফরম তোলার অধিকার।

কিন্তু হিরো আলম ‘আনস্মার্ট’, ‘অশিক্ষিত’, ‘গরিব’ ‘ফকিন্নির পুত’ ‘মুর্খ’ (এই কথাগুলো আমি ফেসবুকে এই দুই দিনে হিরো আলমকে নিয়ে লোকের কমেন্টে পড়েছি) তাই সে নির্বাচনের মনোনয়ন ফর্ম কিনতে পারবে না বলেই সাব্যন্ত করেছে আমাদের সুশীল মন।

তাই, আমাদের ‘সুশীলীয় সেট অফ ভেল্যুজ’ বা মূল্যবোধের ছাঁকনি দিয়ে মেপে আমরা হিরো আলমকে সাব্যস্ত করেছি ‘বিলো এভারেজ’ বা গড়পড়তার নিচে বলে এবং তাকে সাব্যস্ত করেছি ‘নট আপ টু দি মার্ক’ অর্থাৎ ‘আমার মাপে সে যাচ্ছে না’ বলে।

কিন্তু এই সুশীলরাই আবার দেখি সাবোলটার্নদের পক্ষে নানাখানে কথা বলেন। তারাই আবার শ্রেণি-বর্ণ ও জাত্যাভিমানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

আমরা নিম্নবর্গের সংস্কৃতি নিয়ে গালভরা কথা বলি। কিন্তু একজন প্রকৃত নিম্নবর্গের মানুষ যখন নির্বাচনে লড়াই করবার জন্য মনোনয়ন ফর্ম কিনেছেন মাত্র, সেটিই ‘সুশীল-শিক্ষিত’ সমাজ মেনে নিতে পারছে না।

তাকে নিয়ে আমরা বুলিং করতে ছাড়ছি না। তাকে নিয়ে ‘মজাৎ’ নিতে ছাড়ছি না। তাকে পরোক্ষ ‘র‌্যাগ’ দিতে ছাড়ছি না।

হিরো আলমের পক্ষে বা বিপক্ষে আমি নই। তিনি এমপি হওয়ার যোগ্য না কি যোগ্য নন, সেই প্রসঙ্গেও আমি আলোচনায় যাচ্ছি না। কিন্তু আমার বলার মূল বিষয় ‘শ্রেণি বিদ্বেষী মন’। অর্থাৎ অত্যন্ত পরিতাপের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, আমাদের সুশীল মন কতটা বর্ণবাদী ও শ্রেণি-বিদ্বেষী সেটিই ঠেলে বের হয়ে আসছে হিরো আলমের ঘটনায়।

আপনি ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর বিজ্ঞাপনের বিরোধিতা করেন। কারণ এটি সমাজে বর্ণবাদ ছড়ায় বলে আপনি মনে করেন।

আফ্রিকান বংশোদ্ভুত কাউকে তার গায়ের বর্ণের কারণে কৃষ্ণাঙ্গ বলা হলে সেটি আপনার সুশীল মনে কষ্ট দেয়। সেটিকে আপনার সুশীল মন বর্ণবাদ বলে চিহ্নিত করতে পারে।

আপনি এশিয়ান বলে, আপনার চামড়া বাদামী বলে, সাদা চামড়ার দেশে কোনো বিমানবন্দরে আপনাকে যখন অন্যের চেয়ে বেশি সময় ধরে চেক করার নামে ভোগান্তি দেয়, আপনার পাসপোর্টটা যখন অহেতুক হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে নেড়েচেড়ে দেখে, আপনার নামের আগে মোহাম্মদ লেখা দেখে যখন আপনাকে অতিরিক্ত আরো কিছু প্রশ্ন করে ‘অপমান’ বা ‘অপদস্ত’ করে তখন আপনি বিরক্ত হন এবং এই বিরক্তিকে যৌক্তিক মনে করেন।

কিন্ত হিরো আলম ‘শুদ্ধ ভাষায় ঠিক মত মনোনয়ন শব্দটা উচ্চারণ করতে পারে না’ বলে, তিনি দেখতে ‘আনস্মার্ট’ বলে ‘অশিক্ষিত’ বলে তাকে যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল করেন, তাকে যখন খারিজ করে দেন তখন কি সেটি বর্ণবাদী আচরণ নয়, মহামান্য?

বাংলাদেশের ‘সবচেয়ে খ্যাতিমান ও অভিজাত’ একটি বাংলা পত্রিকার একটি খবরেও হিরো আলমের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ হতে দেখলাম। সাক্ষাৎকারটিতে হিরো আলমের বক্তব্যের পুরো অংশ বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষায়। আর রিপোর্টারের ভাষা ‘মান বাংলায়’।

এই সাক্ষাৎকার পড়েই মাথায় এলো 'বিটুইন দি লাইন্স' কথাটা। ভাবে-ভঙ্গিতে কাউকে সম্মান দেয়ার ‘ভং’ ধরেও আপত্তিকর কোনো শব্দ ব্যবহার না করে ও কী করে বহু কথা বলে দেয়া যায় তা এই সমাজ জানে।

তাই, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়া, মূলধারার গাণমাধ্যমের আচার-আচরণ দেখে মনে হলো, বাংলাদেশে আঞ্চলিক ভাষা আতরাফ বা নিম্নবর্গ বা চাষা-ভুষা বা ছোটোলোকের ভাষায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে আঞ্চলিক ভাষা কবে থেকে আতরাফের ভাষায় পর্যবসিত হলো?

বগুড়ার মানুষ যারা আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন তারা সবাই কি আতরাফ? তারা সবাই কি আনস্মার্ট? আপনাদের যাদের আত্মীয়-স্বজন বগুড়ায় আছেন তারা সবাই কি মান বাংলায় কথা বলেন? আর যারা মান বাংলায় কথা বলেন না তাদের সবার নাম কি হিরো আলমের মতন আনস্মার্টদের লিস্টে তোলা হবে?

এই যে, শ্রেণি সচেতনতা, এই যে আপনার ‘মানে এবং মাপে’ পৌঁছাতে না পারলেই আরেকজনকে ‘ডি-ক্লাস’ বা শ্রেণিচ্যুত করে দেয়ার মাধ্যমে তাকে বালখিল্য ও হাস্যস্পদ করে তোলা এটি কি অন্যায় ও নীতিবিরুদ্ধ আচরণ নয়, হে সুশীল-শিক্ষিত সমাজ?

আপনার মতন, ক্লাস-সচেতনতা ও উগ্র সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মানসিকতা থেকেই তৈরি হয়েছিল আর্য আর অনার্যের মিথ। এইজন্যই আমাদের মিথের অসুরেরা দেখতে হিরো আলমের  মতো কালো, খাটো, ‘বিদঘুটে’। হয়তো অসুর মানেই হিরো আলমের মতন দাঁত উঁচু।

হে হিরো আলমকে-নিয়ে-ট্রল-করা-সমাজ, আপনার মুখে কি নিম্নবর্গের সংস্কৃতির জয়গান তথা সাবোলটার্ন সোসাইটির কালচারাল ফাইট বা এই ভূখণ্ডের মিথের সেলিব্রেটি-অসুর রাবণের পক্ষে গান গাওয়াটা মানায়?

একটু ভেবে দেখবেন।

আমিও প্রকৃতই হিরো আলমের সমাজের একজন। নগরের সুশীল দেবতা আর অশিক্ষিত-গরিব-আনস্মার্ট গেঁয়ো অসুরের এই দ্বিধা বিভক্ত সমাজে আমি আসলে অসুরগোত্রভুক্ত।

আমি কৃষক ও গরিব সমাজের মানুষ। আমার পাড়ার খেলার সাথীরা বড় হয়ে কেউ গার্মেন্টেসে কাজ করতে গেছে, কেউ ওয়ার্কশপ দিয়েছে, কারো কৈশোরে বিয়ে হয়ে গেছে, কেউ রোগে ভুগে মরে গেছে। অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্নরা অর্থনৈতিকভাবে ভালো আছে।

তবে, আমার পাড়ায় খেলার সাথীদের বেশির ভাগই ‘মান বাংলায়’ কথা বলে না। তারা কথা বলে আঞ্চলিক ভাষায়। আমার বংশেও এলিট বা অভিজাত কেউ নেই; কিউ ছিল না কোনকালে। তারাও আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন। আমার বাবা আমাকে কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় ‘পুত’ বলে ডাকতেন। আমার মা আজো আমাকে দরদ ঢেলে ‘পুত’ বলে ডাকেন। ‘সুশীল সমাজে’ গেলেও আমার মা তার নিজের স্বচ্ছন্দ ভাষায় কথা বলেন। বুলি পাল্টে তাকে ‘সুশীলিয় মান-বাংলার-বুলি’ নিতে হয় না।

আমি খেটেখাওয়া পরিবারের মানুষ। আমার আত্মীয়-স্বজনেরাও সব গরিব। আমার বন্ধু-স্বজনদের মতন এবং হিরো আলমের মতন বাংলাদেশে এমন আরো কয়েক কোটি গরীব ‘অ-সুশীল’ আছেন যারা সুশীলীয় ‘হাই ক্লাস কালচার’বোঝে না। তারা সুশীলীয় হাই-আর্ট-কালচারের সাথে নিজেদের রিলেট করতে পারেন না। তারা সুশীলদের সাথে ‘এলিয়েনেটেড’ বা বিচ্ছিন্ন বোধ করে। অবশ্য সুশীলরাও যে তাদের সাথে একাত্মবোধ করেন না তার প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অগুনতি স্ট্যাটাস ও কমেন্ট।

আমার উপর রাগ নিয়েন না। পারলে ক্ষমা-ঘেন্না করে দিয়েন। আর না পারলে সত্য বলার ধৃষ্টতা দেখানোর অপরাধে আমাকে নিয়েও ইচ্ছা হলে ট্রল করতে পারেন। আমিও দেখতে খাটো আর কৃশকায়। আমার থুৎনির দিকটাও দেখতে বানরের সাথে অনেকটা মিল আছে। আমিও হিরো আলমের মতন নিম্নবর্গের বিধায় আমারো কোনো প্রতিরোধ নেই।

নিম্নবর্গের প্রতিরোধ থাকে না বলেই তারা নিম্নবর্গ থেকে যায়। উচ্চবর্গের সব অর্জুনের মতন রাজরক্ত বহন করেন। আর হিরো আলমরা সব একলব্য। তাদেরকে আপনাদের সাথে এক পংক্তিতে বসতে না দেয়াই শ্রেয়।

সহকারী অধ্যাপক, মিডিয়া অ্যান্ড ম্যাস কমিউনিকেশন বিভাগ, এআইইউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত