একটি বাড়ি একটি খামারে স্বাবলম্বী ১২০০ পরিবার

আতাউর রহমান সানী, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)
 | প্রকাশিত : ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:০৫

পাঁচ বছর আগেও নাজমা বেগমের সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। এখন তার মাসিক আয় ৫০-৬০ হাজার টাকা। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে, ফিরে এসেছে পরিবারের সদস্যদের মুখের হাসি। একসময়ের হতদরিদ্র রহিমা বেগমও ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, সংসারের ব্যয় মিটিয়ে আজ সঞ্চয় করছেন ভবিষ্যতের জন্য।

নাজমা-রহিমার মতোই ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পে যুক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জ উপজেলার ছয় ইউনিয়নের এক হাজার ২০০ পরিবারের চার হাজার ৬০০ জন। তাদের মধ্যে এক হাজার ২৯২ জন পুরুষ ও তিন হাজার ৩০৮ জন নারী। নারী সদস্যের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ। আর শিশুসহ ৭৭টি সমিতির মাধ্যমে এই প্রকল্পের সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারগুলোর সদস্য মোট ১১ হাজার ৭৩ জন। অজপাড়া গাঁয়ের অবহেলিত মানুষেরও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন দেখে প্রতিদিনই এই প্রকল্পে যুক্ত হচ্ছেন নতুন নতুন সদস্য। নিয়ম-কানুন মেনে করছেন ব্যবসা, সংসারে আনছেন সচ্ছলতা।

বাড়ৈইপাড়া গ্রাম উন্নয়ন সমিতির সদস্য নাজমা জানান, ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর সদস্য হয়ে চার হাজার ৮০০ টাকা সঞ্চয় জমা দেন তিনি। এর বিপরীতে উৎসব বোনাস পান চার হাজার ৮০০ টাকা। সমিতি থেকে প্রথম দফায় ১০ হাজার টাকা ঋণ ও নিজের ১৫ হাজার টাকা মিলিয়ে একটি গরু কেনেন। এক বছর পর গরুটি বাচ্চা দিলে দুধ বিক্রি করে মাসে আয় দাঁড়ায় দু-তিন হাজার টাকা। আস্তে আস্তে আয় বাড়তে থাকায় ঋণ পরিশোধের পর দ্বিতীয় দফায় ২০ হাজার টাকা, তৃতীয় দফায় ৩০ হাজার টাকা এবং চতুর্থ দফায় ৪০ হাজার টাকা ঋণ নেন। এখন তার গরুর সংখ্যা ১০টি এবং প্রতিদিন ৭০-৮০ লিটার দুধ বিক্রি করে মাসিক আয় ৫০-৬০ হাজার টাকা।

গুতিয়াবো গ্রাম উন্নয়ন সমিতির সদস্য রহিমা বেগমও একইভাবে সমিতি থেকে প্রথম দফায় ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বাঁশের পণ্য তৈরি ও বিক্রি করে আজ স্বাবলম্বী। প্রকল্প থেকেই কুটির শিল্পের কাজ শিখে তার পরিবারে এসেছে সচ্ছলতা।

নাজমা ও রহিমার মতে, নিজের ঘরে বসেই এই প্রকল্প থেকে ঋণ ও প্রশিক্ষণসহ অন্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নিজেরাই গড়া যায় কারখানা। তাহলে আর বাড়ি বাড়ি ঘুরতে বা অন্যের কারখানায় চাকরি করতে হবে না।

রূপগঞ্জ উপজেলা সমন্বয়কারী মো. ইখতিয়ার উদ্দিন জানান, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প ও এর স্থায়ী প্রতিষ্ঠান পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের সব কার্যক্রম পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক। সমিতি ও উপকারভোগী সংগঠনের মাধ্যমে সদস্যদের সঞ্চয়ী আমানত, ঋণদান ও কর্মসংস্থান করে আসছে। উঠান বৈঠক, মতবিনিময় ও প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন আয়বর্ধনমূলক কার্যক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে সদস্যদের।

ইিখতিয়ার জানান, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে বর্তমানে রূপগঞ্জে সঞ্চয় জমার পরিমাণ দুই কোটি ১৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সরকার উৎসব বোনাস দিয়েছে দুই কোটি ৩ লাখ টাকা, আবর্তক তহবিল দিয়েছে আরও দুই কোটি ১৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ঋণ দেয়া হয়েছে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ঋণ আদায়ের পরিমাণ প্রায় ৭৬ শতাংশ।

গত ছয় অর্থবছরে এই প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলার ১০০ জনকে ১০০টি গরু প্রদান, ৪৪টি টিনের প্রকল্প, ৩০টি হাঁস-মুরগির প্রকল্প এবং ৯০টি নিজস্ব জমিতে গাছের চারা রোপণ ও সবজি চাষ প্রকল্পে ১২০টি পরিবারকে সহায়তা করা হয়েছে। সরকারি ভাতা, অনুদানসহ প্রশিক্ষণ ও অন্য সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে প্রকল্পের সদস্যদের অগ্রাধিকার। স্বেচ্ছাসেবক সদস্য তথা পরিবার কল্যাণকর্মী, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিকর্মী এবং শিল্প উন্নয়নকর্মীদের মাধ্যমে সমিতির সদস্যসহ গ্রামবাসীর মাঝে শিশু ও বয়স্ক শিক্ষা কর্মসূচি রূপায়ন, বাল্যবিবাহ ও যৌতুক, নারী ও শিশু নির্যাতন রোধ এবং পরিবার পরিকল্পনা, বৃক্ষরোপণ ও স্বাস্থ্যসচেতনতা গড়ে তোলা হচ্ছে। গৃহহীনদের সরকারি খাসজমি দিয়ে সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সামাজিক বেষ্টনী গড়ে বিভিন্ন অসঙ্গতি, অসামাজিক কর্মকা- ও অনাচার দূর করতেও উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

মুড়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তোফায়েল আহাম্মেদ আলমাছ বলেন, ‘প্র্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গড়ে তোলা একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প বাস্তবায়নে আমরা এ উপজেলায় সফল হয়েছি।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বলেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, হাঁস-মুরগির খামার, বনায়নসহ আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে সাবলম্বী করে গড়ে তোলা এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আলোচিত প্রকল্পটি রূপগঞ্জের মডেল। লোকজনকে অনৈতিক কার্যক্রম থেকে বিরত ও আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখায় দিন দিন উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত