টাকা নিয়ে কেন মনোনয়ন ফরম বিক্রয়?

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু
 | প্রকাশিত : ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ১৪:০০

আগামী ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনে ভোটকে ঘিরে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে একটি নির্ধারিত মূল্যের বিনিময়ে মনোনয়ন ফরম বিক্রয় করা হয়েছেl প্রার্থীরা কর্মীদের সাথে নিয়ে আনন্দ মিছিল করে দলের নির্ধারিত স্থান থেকে এসকল মনোনয়নপত্র কিনেছেনl

যতটুকু জানা যায় এসকল মনোনয়ন পত্রের মূল্য ৩০ হাজার টাকা পর্যন্তl বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই নিয়ম শুরু থেকেই চলে আসছেl হয়তো এভাবেই চলবে অনন্তকালl কিন্তু কেন?

নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য এই ২০, ২৫ বা ৩০ হাজার টাকা রাজনীতিবিদদের কাছে হয়ত তেমন কিছুই নয়l অন্যদিকে বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো আয় করছে কোটি কোটি টাকাl

যতটুকু জানা যায়, এই নিয়মের পরিবর্তনের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন আজ পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনিl তবে আগামী দিনে বিষয়টির গুরুত্ব নিয়ে আশা করি নির্বাচন কমিশন একটি সিদ্ধান্তে আসবেl

ইউরোপের কোনো দেশে নির্বাচনে কোনো ব্যক্তিকে প্রার্থী হতে হলে কোনো ‘ফি’ দিতে হয় নাl দলের সদস্যপদ থাকলেই যে কেউ নিজেই সরাসরি মনোনয়ন চাইতে পারেনl দলের বিভিন্ন শাখা থেকেও কোনো প্রার্থীর পক্ষে মনোনয়ন চেয়ে মনোনয়ন কমিটির কাছে আবেদনপত্র পাঠানোর সুযোগ রয়েছেl পরে দলের মনোনয়ন কমিটি যাদের যোগ্য মনে করবে তাদের প্রয়োজনে সাক্ষাৎকার ও প্রার্থীর রাজনৈতিক সক্রিয়তা তথা যোগ্যতার উপর নির্ভর করে মনোনয়নের প্রস্তাব দিয়ে থাকেl

মনোনয়ন কমিটির এই প্রস্তাবই চূড়ান্ত নয়l পরে বিভিন্ন শাখার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি নির্বাচন কনফারেন্সের আয়োজন করা হয় যেখানে প্রতিনিধিদের ভোটের মাধ্যমে প্রার্থীদের নাম তালিকা চূড়ান্ত করা হয়l সাধারণত বেশিভাগ ক্ষেত্রেই মনোনয়ন কমিটির রাখা প্রস্তাব প্রতিনিধিদের সমর্থন পেয়ে থাকেl এখানে উল্লেখযোগ্য যে, প্রমাণসহ সরকারি নথিপত্রে কোনো অভিযোগ ও রাজনৈতিক দলের প্রাথমিক সদস্য পদ না থাকলে কেউ প্রার্থী হতে পারে নাl

আগামী মে মাসে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে সুইডিশ লেফট পার্টি থেকে কোন কোন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হবে সে ব্যাপারে কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছেl এ উপলক্ষে সারা সুইডেনে দলের শাখাগুলোর কাছে প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রস্তাব পাঠাতে একটি নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করে চিঠি দেওয়া হয়েছেl পরে মনোনয়ন কমিটি দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ‘ইলেকশন কনফারেন্সে’ একটি নাম তালিকার প্রস্তাব উত্থাপন করবেl এই কনফারেন্সে প্রতিনিধিদের ভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা নির্ধারণ করা হবেl

এভাবেই প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করে থাকেl কিন্তু তাদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেয়া হয় না।

বাংলাদেশের প্রার্থী বাছাইয়ের নিয়ম সম্পূর্ণ ভিন্নl এখানে চলে টাকার খেলাl প্রতিটি নির্বাচনে প্রার্থীরা খরচ করেন কোটি কোটি টাকাl যদিও নির্বাচন কমিশনে এক্ষেত্রে বাধা ধরা একটা নিয়ম রয়েছেl কিন্তু কে শুনে কার কথা? জানি না নির্বাচনে অতিরিক্ত অর্থ খরচের কারণে এপর্যন্ত কতজন প্রার্থীকে দায়ী করা হয়েছেl

এখন প্রশ্ন হলো, প্রার্থীরা তাহলে এতো অর্থ খরচ করে কেন নির্বাচন করেন? কেন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের আদর্শ প্রচারের পরিবর্তে দলীয় নেতা নেত্রীদের তোষামোদি করেন?

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের কার্যকলাপ শুরু হয় সংসদ সদস্যদের নানা সুযোগ সুবিধা দেওয়ার মধ্যে দিয়েl সম্ভবত এই কারণেই অনেকে বিনিয়োগ করেন অগাধ অর্থl প্রথমেই সংসদ সদস্যদের জন্য বিদেশ থেকে ‘ট্যাক্স ফ্রি’ গাড়ি কেনার সুযোগ দিয়ে শুরু হয় এই যাত্রাl সংসদ সদস্যদের আর পিছ ফিরে তাকাতে হয় নাl নির্বাচনে যে অর্থ খরচ করা হয় অনেক সংসদ সদস্য মেয়াদকাল শেষ হওয়া পর্যন্ত (সকলে নয়) অনেক গুণ অর্থ আয় করেনl

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনের দিকে একবার ফিরে দেখা যাকl জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সময় জাতীয় সংসদে এম পি দের জন্য কোনো ‘ট্যাক্স ফ্রি’ গাড়ি কেনার নিয়ম থাকা তো দূরের কথা, অতিরিক্ত কোনো সুযোগ সুবিধা বলতে কিছুই ছিল নাl

বাকশাল প্রতিষ্ঠা করার পর বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণ শুনলেই আসল সত্য বেরিয়ে আসবেl তিনি কীভাবে গড়তে চেয়েছিলেন তার স্বপ্নের দেশ বাংলাদেশ আর আজ বাংলাদেশ  চলছে কীভাবেl 

নির্বাচন পরবর্তীতে আসছে সরকারের কাছে অনুরোধ প্রথমেই এই ‘ট্যাক্স ফ্রি’ গাড়ি ক্রয়ের নিয়ম বন্ধ করতে হবেl যে দেশের মানুষ দরিদ্রসীমার এতো নিচে বসবাস করে সে দেশের জন প্রতিনিধিরা কী করে বিলাসবহুল গাড়ি কেনার সুযোগ পায়?

সংসদ সদস্যদের বেতন সহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা কমিয়ে আনতে হবে এবং এই অর্থ সরকার দেশের জনগণের কল্যাণে ব্যয় করবেl এছাড়া আগামী দিনে নির্বাচন কমিশন প্রার্থীদের কাছ থেকে এই টাকা নেয়ার নিয়মের বদলে নুতন কিছু চিন্তাভাবনা করবে বলে আশা রাখি। 

লেখক: সুইডিশ লেফট পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত