রাজনীতিতে নেতাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা টাইমস
 | প্রকাশিত : ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ১১:৫৮

দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সন্তানেরাও আসছেন রাজনীতিতে। বিভিন্ন আসনের প্রবীণ সংসদ সদস্যরাও নিয়ে আসছেন তাদের ছেলেমেয়েদের। কেউ কেউ আবার আগেভাগে সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন।

কোথাও বা নেতার অবর্তমানে স্ত্রী, কোথাও আবার স্বামী-স্ত্রী দুজনই হতে চাইছেন প্রার্থী। একাধিক আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা দুই ভাই। আছেন চাচা-ভাতিজাও।

স্ত্রী-সন্তানদের দিয়ে বিএনপির ‘ব্যাকআপ’
বোরহান উদ্দিন

বার্ধক্য, বিদেশে অবস্থান, সাজা, মামলা বা অন্য কারণে বিএনপির যেসব নেতা প্রার্থী হতে পারবেন না, তাদের আসনে স্বজনদেরও প্রার্থী করার চিন্তাভাবনা আছে দলে।

কেন্দ্রীয় যেসব নেতার প্রার্থিতা নিয়ে আইনি জটিলতার আশঙ্কা আছে, সেসব আসনে তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

পঞ্চগড়-১ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য জমিরউদ্দিন সরকার। পাশাপাশি তার ছেলে নওশাদ জমিরও একই আসন থেকে মনোনয়ন ফরম তুলেছেন।

নাটোর-১ আসনে ২০০৮ সালে নির্বাচন করতে পারেননি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান। তখন ভোটে দাঁড়ান তার স্ত্রী কামরুন্নাহার শিরিন। এবার তিনি দলের মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন।

নাটোর-২ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। ‘বিকল্প প্রার্থী’ হিসেবে রাখা হয়েছে সহধর্মিণী সাবিনা ইয়াসমিন ছবিকে।

সিরাজগঞ্জ-২ (সদর-কামারখন্দ) আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হতে চান ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তবে ২০০৮ সালের মতোই তিনি জটিলতায় পড়লে স্ত্রী রোমানা ইকবাল মাহমুদ প্রার্থী হবেন সেখানে। মনোনয়ন ফরম সংগ্রহও করেছেন তিনি।

কক্সবাজার-১ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তবে কোনো কারণে তিনি নির্বাচন করতে না পারলে স্ত্রী হাসিনা আহমেদ নির্বাচন করবেন। ২০০৮ সালেও হাসিনা নির্বাচিত হয়েছিলেন।

ময়মনসিংহ-৪ ও ৫ আসনে নির্বাচন করতে পারেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এ কে এম মোশাররফ হোসেন। ময়মনসিংহ-৫ আসনে তার ছোট ভাই জাকির হোসেন বাবলুও ফরম কিনেছেন।

টাঙ্গাইল-২ আসনে বিএনপির ফরম নিয়েছেন একুশে আগস্ট মামলার মৃত্যুদ- পাওয়া বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম পিন্টু। একই আসনে ফরম তুলেছেন তার দুই ভাই সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও শামসুল আলম তোফা। টুকু ও তোফা টাঙ্গাইল-১ আসন থেকেও ফরম নিয়েছেন।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন নরসিংদী সদর থেকে নির্বাচন করতে চান। তার স্ত্রী বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক শিরিন সুলতানা ঢাকা-৯ আসন থেকে মনোনয়ন কিনেছেন।

যশোর-৩ আসনের বিএনপির প্রয়াত নেতা তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত মনোনয়ন ফরম কিনেছেন।

নোয়াখালী-২ আসন থেকে নির্বাচন করতে পারেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক। তবে সমস্যা হলে মেয়ে তামান্না ফারুককেও তৈরি রাখা হয়েছে।

নোয়াখালী-৩ আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লা বুলু নিজের পাশপাশি তার সহধর্মিণী শামীমা বরকত লাকীর নামেও ফরম কিনেছেন।

মানিকগঞ্জ-১ আসনে ফরম নিয়েছেন বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের দুই ছেলে খোন্দকার আকবর হোসেন বাবলু ও খোন্দকার আবদুল হামিদ ডাবলু।

মানিকগঞ্জ-২ আসনে প্রয়াত শিল্পমন্ত্রী শামসুল ইসলাম খানের ছেলে ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মঈনুল ইসলাম খান শান্ত ফরম কিনেছেন।

মানিকগঞ্জ-৩ আসন থেকে মনোনয়ন কিনেছেন বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান হারুন আর রশীদ খান মুন্নুর মেয়ে আফরোজা খান রিতা।

নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে বিএনপি থেকে ২০০৮ সালে মনোনয়ন পান এ এম বদরুজ্জামান খান খসরু। তিনি সম্প্রতি মারা যান। তার আসনে ছেলে মাহমুদুর রহমান সুমন ফরম নিয়েছেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধে দ-িত হয়ে কারাগারে মারা যাওয়া জয়পুরহাট-১ আসনে ফরম নিয়েছেন ছেলে ফয়সল আলীম।

নেত্রকোনা-৪ আসনে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের আসনে মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন তার স্ত্রী তাহমিনা জামান এবং ছেলে লাবিব ইবনে জামান।
কুমিল্লা-১ আসন থেকে লড়তে চান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন। আর কুমিল্লা-২ থেকে ফরম কিনেছেন তার ছেলে খন্দকার মারুফ হোসেন। এই আসন থেকে লড়তে চান খন্দকার মোশাররফ নিজেও।

মুন্সিগঞ্জ-২ আসনে লড়তে চান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রয়াত নেতা শামসুল ইসলামের ছেলে সাইফুল ইসলাম বাবু।

চাঁদপুর-১ আসনে লড়তে চান সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। কোনো কারণে তিনি নির্বাচন করতে না পারলে ওই আসনে মনোনয়ন চাইবেন তার স্ত্রী নাজমুন্নাহার বেবী।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসিতে ঝোলা বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর চট্টগ্রাম-২ আসনেও ফরম তুলেছেন তার দুই স্বজন। একজন হলেন স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী এবং অন্যজন ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী।

সিলেট-২ আসনে বিএনপির নেতা এম ইলিয়াস আলীর আসনে নির্বাচনে লড়বেন তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা। একই আসন থেকে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ইলিয়াসপুত্র আবরার ইলিয়াস। লুনা জানিয়েছেন, কোনো কারণে তিনি ভোটে লড়তে না পারলে লড়বেন আবরার।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হান্নান শাহ মারা যাওয়ায় গাজীপুর-৪ আসনে তার ছেলে শাহ রিয়াজুল হান্নানকে প্রার্থী করা হতে পারে।

ফরিদপুর-২ আসনে কে এম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ রিংকু নির্বাচন করতে পারেন। তিনি অবশ্য আগেই রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত।

ঢাকা-১ আসন থেকে লড়তে চান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান। তার জামাতা বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাসির উদ্দিন অসীম ঢাকা-৮ আসন থেকে ফরম কিনেছেন। যদিও তিনি অনেক দিন ধরে লন্ডনে।

ঢাকা-২ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান। কোনো কারণে তিনি নির্বাচন করতে না পারলে তার ছেলে ইফরান ইবনে আমান নির্বাচন করতে পারেন। ছেলের জন্য মনোনয়ন ফরমও কিনেছেন।

ঢাকা-৩ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সম্ভাব্য প্রার্থী। সতর্কতা হিসেবে এই আসন থেকে তার মেয়ে অপর্ণা রায় ও পুত্রবধূ নিপুণ রায় মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন।

ঢাকা-৫ আসনে বিএনপির সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহম্মেদ লড়তে চান। তার ছেলে তানভীর আহম্মেদ রবিন ফরম নিয়েছেন ঢাকা-৪ আসনের জন্য।

ঢাকা-৬ আসন থেকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিলেন ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা। তবে মামলার সাজা-সংক্রান্ত এবং অসুস্থতার কারণে তিনি মনোনয়ন নেননি। নিয়েছেন ছেলে ইশরাক হোসেন।

ঢাকা-৭ আসনে বিএনপির প্রয়াত নেতা নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন।

ঢাকা-৮ ও ৯ আসন থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ফরম তুলেছেন। তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাস নির্বাচন করতে চান ঢাকা-৯ আসন থেকে।

ঢাকা-১৪ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য এস এ খালেক শারীরিকভাবে অসুস্থ। তিনি নির্বাচন না করলে তার ছেলে সৈয়দ সিদ্দিক সাজু নির্বাচন করবেন।

উত্তরাধিকারের রাজনীতির বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এটা দেশের জন্য মঙ্গলকর নয়। কারণ রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা না থাকলে মেধাবী ও ত্যাগীরা আসবে না। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া রাজনীতির কারণে সেই সুযোগটা থাকছে না।’ দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব না দেখে যোগ্যদের মনোনয়ন দেওয়া উচিত বলে মনে করেন বদিউল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত