হিরো আলম কেন, কেন নয়

বিনোদন প্রতিবেদক, ঢাকা টাইমস
 | প্রকাশিত : ২০ নভেম্বর ২০১৮, ১৫:৫৪

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর দৈনন্দিন আড্ডা একন হিরো আলমময়। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর টকশোতে স্থান করে নিচ্ছেন তিনি। দেশের কোনো নির্বাচনে কারও মনোনয়ন নিয়ে এমন আলোচনা-সমালোচনা এর আগে কখকেনো দেখা যায়নি। এসব আলোচনায় এক পক্ষ হিরো আলমের নির্বাচনী উদ্যমকে সাধুবাদ জানাচ্ছে, অপর পক্ষে নাক সিটকাচ্ছে।

হিরো আলমের সাংসদ হওয়ার কিংবা মনোনয়ন ফরম কেনার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। তার প্রত্যুত্তরে হিরো আলম যা বলছেন, তা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই বাস্তব রূপ। উদাহরণ জিসেবে হিরো আলম সামনে এনেছেন মোদি, মমতাজ, মাশরাফিদের নাম। তারা পারলে হিরো আলম কেন নয়।
কেন হিরো আলম নয়, কিংবা কেন হিরো আলম- এ প্রসঙ্গে ঢাকাটাইমসের সঙ্গে কথা বলেছেন নাট্যকার মাসুম রেজা, নির্মাতা অমিতাভ রেজা, নির্মাতা রেদোয়ান রনি ও সাংবাদিক আরাফাত সিদ্দিকী।

মানুষ নয়, রাজনীতিক হিরো আলমকে নিয়ে আপত্তি

মাসুম রেজা বলেন, ‘হিরো আলম কেন প্রাসঙ্গিক, এই প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার আগে। হিরো আলম প্রাসঙ্গিক কারণ তিনি আলোচনায় আছেন। আর এই আলোচনাকে আমি একটা সম্ভাবনা মনে করি। হিরো আলম থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

‘আমাদের রাজনীতির একটা গৌরবময় ইতিহাস আছে। আমরা রাজনৈতিক যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা পাওয়া একটা রাষ্ট্র। রাজনীতির মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ চর্চায় যে কেউ যেন চালকের আসনে বসতে না পারে সে ব্যাপারে এখন থেকেই সচেতন হওয়া দরকার সরকার ও সাধারণ জনগণের। সাধারণের কাছে রাজনীতিকে একটা মননশীল চর্চার চারণভূমি হিসেবে প্রতিস্থাপন করার দায়িত্ব সরকারেরই।’

হিরো আলমের নির্বাচন নিয়ে আপত্তি থাকলেও মানুষ হিরো আলমের প্রতি কোনো অশ্রদ্ধা নেই মাসুম রেজার। বলেন, ‘সে কৌতুক অভিনেতা হিসেবেও বেশ গণপ্রিয় হয়েছে তাতেও আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু সংসদে যদি হিরো আলম যায় তাহলে আমার আপত্তি আছে। কারণ রাজনীতির মূল ভিত্তি হলো জীবনবোধ, রাজনৈতিক সমাজচেতনা, শিক্ষা। এসব কিছুর ওপর ভর করে আমার রাজনৈতিক হিরো আলমে আপত্তি। হিরো আলম এই দেশের রাজনীতিবিদদের জন্যও অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। তারা এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেবে কি নেবে না বলতে পারছি না। যদি এই ঘটনায় রাষ্ট্রের টনক নড়ে তাহলে হিরো আলম হয়ে থাকবে চিরস্মরণীয় এক নায়ক।’

সচেতন না হলে সংসদে হিরো আলম বাড়বে

হিরো আলমকে একটা হাস্যকর চরিত্র ছাড়া আর কিছু ভাবতে রাজি নন অমিতাভ রেজা। তাই তার প্রতি কোনো আগ্রহ দেখাতে চান না তিনি। ফলে হিরো আলমকে এক রকম অস্বীকার করতে চান এই নির্মাতা।

হিরো আলমকে অস্বীকারের ব্যাখা দিতে গিয়ে অমিতাভ রেজা বলেন, ‘হিরো আলমকে অস্বীকার করার মূল কারণ হলো ওনার অস্তিত্ব জানান দেয়ার পদ্ধতির জন্য। আমি যেহেতু সিনেমার মানুষ সেহেতু ওনার অভিনয় আমার কাছে হাস্যকর লাগে। একজন কৌতুক অভিনেতা হিসেবেও হাস্যকর। কারণ উপমহাদেশ বাদ দিয়ে শুধু বাংলাদেশের ভেতরে বললেও আমাদের কাছে টেলিসামাদ, দিলদারসহ আরও অনেক নাম আছে দৃষ্টান্ত হিসেবে। একজন নির্মাতা হিসেবে দিন শেষে আমি অভিনয় দেখব, অভিনয়ের জন্য সেক্রিফাইসটা কিন্তু দেখব না। অনেক ছেলেমেয়ে সারা দিন অঙ্ক করার পরও যেমন টিচার ভুল হলে খাতায় নম্বর দিতে পারেন না বিষয়টা অনেকটা ওরকম।

‘তার পরও ওই পর্যন্ত মেনে নিয়েছি। তাকে নিয়ে কোনো আলোচনা বা সমালোচনায় যাইনি। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে কেন হিরো আলম না বলে বলব জাতীয় রাজনীতিতে কেন হিরো আলমেরা? রাজনীতি হিরো আলমদের জন্য না। হিরো আলম একজন মহান সেবক হতেই পারেন, দানধ্যানের মধ্য দিয়ে। কিন্তু দানধ্যান করলেই সে নেতা হয়ে যায় না। নেতা হতে হলে নেতৃত্ব দেয়ার মতো যোগ্যতা থাকতে হয়।’

আমাদের জাতীয় সংসদে যে একেবারে কোনো অযোগ্য সাংসদ নেই সে কথা অস্বীকার করছেন না অমিতাভ রেজা। তবে হিরো আলম সেটি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন বলে মনে করছেন তিনি। বলেন, ‘সংসদে এ রকম অনেকেই আছেন যাদের নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা নেই। এদের এত দিন সেভাবে চোখে পড়েনি। এখন পড়ছে। আমাদের সবার উচিত রাজনীতি সচেতন হওয়া। তা না হলে দেশের রাজনীতিতে হিরো আলমদের দৌরাত্ম্য আরও বেড়ে যাবে। ‘শিক্ষিত মানুষ চুরি করে, অশিক্ষিত মানুষ সৎ’ এই উদাহরণ থেকে নাগরিককে বের করে আনার দায়িত্বটা নিতে হবে রাষ্ট্রকেই।

পরিচয়ে অনীহা তবে প্রমোট করছি কেন

হিরো আলমের মনোনয়ন ফরম নেয়ায় কোনো সমস্যা দেখছেন না নির্মাতা রেদোয়ান রনি। তবে  বললেন সাংস্কৃতিক বিকলাঙ্গতার কথা। রেদোয়ান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক একটি দেশে যে কেউ নমিনেশন কিনতে পারে। জনগণ চাইলে যে কাউকে ভোট দিয়ে জয়ী করতে পারে। কিন্তু সাংস্কৃতিক বিকলাঙ্গতার চিকিৎসা জনগণ ভোট দিয়ে করতে পারে না। এর চিকিৎসা মানসিক।’

রেদোয়ান বলেন, ‘আমদের দেশের শিল্পাঙ্গনের প্রতিনিধি হিসেবে কিন্তু একটা মানুষও হিরো আলমকে ভাবতেই পারবে না। অথচ বিদেশ থেকে বাংলাদেশের কন্টেন্ট সার্চ করলে সবার আগে হিরো আলম আসে। আপনি যখন হিরো আলমের প্রতি মানবিক তখনো কিন্তু দেশের প্রতিনিধি হিসেবে তাকে অতিথির সামনে তুলে ধরবেন না। তাহলে কেন অহেতুক আমরা এগুলো প্রমোট করি সে প্রশ্নের উত্তর জানাটা জরুরি।’

মানুষ হিরো আলমে নিজের আপত্তি না থাকার কথা বলে এই নির্মাতা বলেন, ‘আমাদের তরুণসমাজকে আরও একটু বিশ্লেষণী হওয়া দরকার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইলটি নিজের হলেও গণরুচি প্রভাবিত করতে একটা অ্যাকাউন্ট অনেক ভূমিকা রাখে এটাও বোঝা দরকার। আমার মনে হয় দেশের সব সেক্টরের মানুষকে আরও বেশি যতœশীল ও বিশ্লেষণী হওয়া দরকার। প্রশ্নটা যখন রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের, রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বের তখন উত্তর জানার জন্য প্রত্যেককে ভাবা দরকার।’

এরা হিরো আলমের পক্ষে নন, বাহবা চান

সম্প্রতি একটি টিভি চ্যানেলে হিরো আলমের সাক্ষাৎকারে উপস্থাপিকা তার প্রতি সাংবাদিকসুলভ আচরণ করেননি বলে বিভিন্ন মাধ্যমে সমালোচনা হচ্ছে। কিন্তু এনটিভির সাংবাদিক আরাফাত সিদ্দিক মনে করেন না হিরো আলমের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। এ নিয়ে ঢাকা টাইমসের সঙ্গে আলাপকালে তিনি ফেসবুকে দেয়া তার একটি  স্ট্যাটাসের কথা উল্লেøখ করেন, যেখানে তার মতামতটি উঠে এসেছে।  

‘হিরো আলমকে প্রশ্ন করার সময় টিভি উপস্থাপকের যে আভিজাত্য ফুটে উঠেছে তা স্বাভাবিক। মূলধারার করপোরেট মিডিয়া সব সময় এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষে থাকে। অর্থাৎ সমাজে যে শ্রেণিবৈষম্য তা টিকিয়ে রাখাই এসব মিডিয়ার কাজ। সাক্ষাৎকারটিতে এর কোনো লুকোছাপা ছিল না। বরং যারা এর সমালোচনা করছেন তাদের বেশির ভাগই নিজেদের আড়াল করে রাখেন। হিরো আলমকে অপমান করায় যাদের ব্যক্তিমর্যাদার ওপর আঘাত মনে হয়েছে তাদের অনেকেই আবার খুশি হয়েছিলেন যখন আরেক টিভি সাংবাদিক এরশাদকে ‘বিশ্ববেহায়া’ বলেছিলেন। ...সেই সাংবাদিকের ‘সাহস’ নিয়ে অনেকের প্রশংসা দেখেছি ফেসবুকে।

‘সমালোচকরা বলছেন, হিরো আলম বলে উপস্থাপক এভাবে অপমান করতে পেরেছেন, অন্য কোনো রাজনীতিবিদ হলে পারতেন কি? একই প্রশ্ন আমারও। হিরো আলম বলে আপনারা তার অপমানের প্রতিবাদ করছেন, বিরোধী পক্ষের অন্য কোনো প্রভাবশালীকে অপমান করলে আপনি প্রতিবাদী হতেন?...

‘হিরো আলমের স্মার্টনেস দেখে যারা বলছেন, হিরো আলমকে ভোট দেয়ার সুযোগ থাকলে ভোট দেবেন। তারা কি হিরো আলম যে দলের মনোনয়ন চেয়েছেন সেই এরশাদের জাতীয় পার্টিকে পছন্দ করেন? শেষ পর্যন্ত যদি তিনি দলীয় মনোনয়ন না পান তখন কি আপনারা হিরো আলমের জন্য মাঠে নামবেন!
টকশোতে হিরো আলমের প্রশ্ন শুনে যারা খেপেছেন আমার দৃষ্টিতে তাদের বেশির ভাগই বাহবা নিতে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন। আদতে তারা হিরো আলমদের মূলধায়ায় বিকাশের পক্ষে নন। এদের অনেককেই চিনি যারা এক টিভি অনুষ্ঠানের ব্যবচ্ছেদ করে নিজের শুদ্ধতা জাহির করার মজাটুকু নিচ্ছেন।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিনোদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত