কার মন রাখবে বিএনপি

বোরহান উদ্দিন
 | প্রকাশিত : ২১ নভেম্বর ২০১৮, ১১:৫০

নিজেদের প্রার্থী বাছাই করতে গিয়ে বিএনপিকে মাথায় রাখতে হচ্ছে জোটের শরিক দলগুলোর কথাও। কারণ, বেশ কিছু আসনে তাদের দলের নেতাদের পাশাপাশি জোটের শরিক দলেও আছে দাবিদার।

২০০১ সাল থেকেই জোট করে ভোটে আসছে বিএনপি। তবে দুটি নির্বাচনে আসন বণ্টন নিয়ে খুব বেশি ঝামেলা না হলেও তৃতীয় নির্বাচনে এসে জটিলতায় পড়েছে তারা। কারণ, এবার ২০ দলের পাশাপাশি মাথায় রাখতে হচ্ছে নতুন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কথাও। কিছু আসন আবার ২০ দল এবং ঐক্যফ্রন্টের শরিক দুই পক্ষই চাইছে।

একেক শরিক নিজেদের মতো আসন চেয়ে তালিকা দিয়েছে। তবে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের আসন দিতে গিয়ে ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে বিএনপিকে। কারণ ওইসব আসনের বেশির ভাগ জায়গায় বিএনপির নিজ দলেরও প্রভাবশালী নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও একাধিকবারের সংসদ সদস্যও আছেন।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা শরিকদের কাছ থেকে তালিকা পেয়েছি। খুব শিগগির সবার সঙ্গে আলোচনা করে আসন বণ্টন করা হবে। আশা করি, সবাই সেক্রিফাইস করবেন। জোটের স্বার্থ রক্ষার জন্যই সিদ্ধান্ত হবে। এতে সমস্যা হবে না।’

জামায়াত চায় ৫০ আসন

গত রবিবার ২০ দলের সমন্বয়ক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের কাছে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা দিয়েছে ২০ দলীয় জোটের শরিকরা। এর মধ্যে জামায়াত চেয়েছে ৫০টি। ২০০১ ও ২০০৮ সালে দলটিকে ছাড় দেওয়া হয় ৩৫টি করে আসন। এর বাইরে কিছু আসনে দুই দলের লড়াই ছিল উন্মুক্ত।
অলি আহমদের এলডিপি প্রথমে ৩০টি এবং পরে ১২টি আসন চেয়েছে। সমান সংখ্যক আসন চেয়েছে কল্যাণ পার্টি। জাতীয় পার্টি (জাফর) চেয়েছে ১৬টি। বিজেপি চায় তিনটি। এ ছাড়া খেলাফত মজলিস ও জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামীর দুই অংশ ১০টি করে, জাগপা তিনটি আসনের তালিকা দিয়েছে।

কাকে কত আসন দেওয়া হবে, সেটি না জানালেও বিএনপির নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতকে এবার গতবারের চেয়ে কম আসন দেওয়া হবে। আর এলডিপিকে দেওয়া হবে কিছু আসন। এর বাইরে বিজেপিকে একটি, খেলাফত মজলিস এবং জমিয়তকে এক বা একাধিক আসনে ছাড় দেওয়া হতে পারে। আর ২০ দলের শরিকদের দাবি নিয়ে খুব বেশি মাথাব্যথাও নেই বিএনপির।

মাথাব্যথার কারণ ঐক্যফ্রন্টের শরিক

বিএনপির জন্য ঐক্যফ্রন্টের শরিক নেতাদের আসন বণ্টনের বিষয়টি নিয়েই মূলত এবার বিএনপির কপালে চিন্তার ভাঁজ। ফ্রন্টের শরিকদের মধ্যে নাগরিক ঐক্য ৩৫টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে দিয়েছে এরই মধ্যে।

সুনির্দিষ্টভাবে দাবি না তুললেও গণফোরামে সম্প্রতি যোগ দেওয়া ১০ সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী আ স ম কিবরিয়ার ছেলের জন্য মনোনয়ন চাওয়া হবে, এটা নিশ্চিত প্রায়।

এর বাইরেও দলটির আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষনেতা রয়েছেন, যারা এত দিন ভোটের ময়দানে ভালো করতে পারেননি। কিন্তু এবার তারা একাধিক আসন চাইছেন।

আ স ম আবদুর রবের জেএসডিও তার শীর্ষ প্রায় সব নেতার জন্য আসন নিশ্চিত করতে চাইছে, যার প্রায় প্রতিটিই বিএনপির শক্তিশালী এলাকা হিসেবে পরিচিত। রব আবার একাধিক আসনে প্রার্থী হতে চান বলে প্রচার আছে। তার স্ত্রীর জন্যও তিনি আসন চান, দলের সাধারণ সম্পাদক এবং আরও বেশ কয়েকজন নেতাকেও ধানের শীষ দিতে চাইছেন।

আরেক শরিক আবদুল কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ টাঙ্গাইলের অধিকাংশ আসনই চায়। এর বাইরেও বৃহত্তর ময়মনসিংহ এবং ঢাকা বিভাগের একাধিক আসন তারা নিশ্চিত করতে চাইছে।

কামাল হোসেনের আরেক উদ্যোগ জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার কয়েকজন নেতাকেও আসন দেওয়ার দাবি জানানো হচ্ছে। তারা যেগুলো চাইছেন, সেগুলোতে আবার বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী আছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় কাজ করছেন।

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু যে দুটি আসন চাইছেন তার একটিতে ভোটের প্রস্তুতি আছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের এবং অপরটিতে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমানের।

চট্টগ্রাম-১৪ কে পাবেন?

এই আসনে জোটের তিনজন নেতার দাবি নিয়ে তৈরি হয়েছে বিড়ম্বনা। এই আসনে ২০০৮ সালে জেতেন জামায়াতের আ ন ম শামসুল ইসলাম। আসনটি এবারও চায় দলটি। তবে এলডিপি তার সভাপতি অলি আহমদের জন্য এই আসন নিশ্চিত করতে চায়।
অন্যদিকে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরীও লড়তে চান এখান থেকে। এই অবস্থায় কাকে বাদ দিয়ে কাকে আসনটি দেবে এ নিয়ে ভাবনায় বিএনপি।

লক্ষ্মীপুর-৪ আসন কার?

এই আসনে ১৯৯৬ সালে জাসদের প্রার্থী হিসেবেই জিতেছিলেন আ স ম আবদুর রব। কিন্তু এরপর তিনি আর ওই আসনে ভালো করতে পারেননি। ২০০১ সালে তিনি দ্বিতীয় হলেও ২০০৮ সালে হন তৃতীয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি ৭০ হাজার ২১৯ ভোট পেয়ে জেতে, আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় হয় ৬০ হাজার ২১ ভোট পেয়ে আর রব পান ২১ হাজার ৭৫১ ভোট।

এই আসনে এবার বিএনপির প্রার্থী হতে চান ২০০৮ সালে জয়ী এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু।

মীর নাছির না সৈয়দ ইবরাহিম?

চট্টগ্রাম-৫ আসনে মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনসহ বিএনপির তিনজন হেভিওয়েট প্রার্থী আছেন। তবে জোটের শরিক কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম চাইছেন আসনটি।

মীর নাছির ছাড়াও এখানে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে আছেন বিজিএমইর সাবেক সভাপতি এ এস এম ফজলুল হক, প্রয়াত হুইপ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে শাকিলা ফারজানা, মীর নাছিরের ছেলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মীর হেলাল।

আহমদ আজম না কাদের সিদ্দিকী

চট্টগ্রাম-৮ আসনে দীর্ঘদিন ধরেই প্রার্থী হতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান। তবে এই আসনে আওয়ামী লীগ এবং জনতা পার্টির হয়ে একাধিকবার নির্বাচন করেছেন ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেওয়া আবদুল কাদের সিদ্দিকী।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ থেকে এবং ২০০১ সালে নিজের দল জনতা লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য হন কাদের সিদ্দিকী। তবে তিনি এবার প্রার্থী হতে পারবেন কি না, এ নিয়ে সংশয় আছে। কারণ, তার খেলাপি ঋণ রয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলেই আদালতে গিয়েও উপনির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেননি তিনি।

বিএনপির দুর্গে মান্না, ছাড়তে নারাজ জামায়াত

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বিএনপি-অধ্যুষিত বগুড়া-২ আসন থেকে নির্বাচন করতে চান। এই আসনে আবার জামায়াতেরও ভালো শক্তি আছে। ১৯৯১ সালে এখানে জিতেছিলেন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী। তবে ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত টানা জিতে এসেছে বিএনপি।

বিএনপির দুবারের সংসদ সদস্য হাফিজুর রহমানের পাশাপাশি জামায়াতের শাহাদাতুজ্জামানও ওই আসনে প্রার্থী হতে মরিয়া। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নন।

নাগরিক ঐক্য যেসব আসন চেয়েছে, তার মধ্যে মান্নার জন্য ঢাকা-১২ চাওয়া হয়নি। তবে এই আসন তিনি চান বলে প্রচার আছে।
এই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী যুবদলের সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক শাহাব উদ্দিন, মহানগরের নেতা আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার।

ঐক্যপ্রক্রিয়া নাকি জাপা

মৌলভীবাজার-২ আসনে প্রার্থী হতে চান ঐক্যফ্রন্টের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ। এখানে বিএনপি থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী আবেদ রেজা। দলের জন্য তার আত্মত্যাগও আছে। তবে জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) সভাপতিম-লীর সদস্য নওয়াব আলী আব্বাস খান আসনটি চান।
নারায়ণগঞ্জ সদরে কে

নাগরিক ঐক্য এরই মধ্যে এস এম আকরামকে এই আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে দিয়েছে। তিনি নৌকা নিয়ে ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনে হারেন বিএনপির আবুল কালামের কাছে।

এই আসনে আবুল কালাম নির্বাচন করেছেন মোট ছয়বার। এবারও তিনি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। কিন্তু নাগরিক ঐক্য যেসব আসনের জন্য চাপ দিচ্ছে, তার মধ্যে এটিও আছে।

শরিক দলের চেয়ারম্যান নাকি সাঈদীপুত্র

পিরোজপুর-২ আসনে নির্বাচন করতে চান মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আমৃত্যু কারাদ- পাওয়া দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে শামীম সাঈদী। তবে আসনটি চাইছেন ২০ দলের শরিক লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান।

বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মঞ্জুরের ছেলে আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন এবং কাউখালী উপজেলা পরিষদের দুবারের চেয়ারম্যান এস এম আহসান কবীরও চান ধানের শীষ।

নিজামীর আসন চায় কল্যাণ পার্টি

পাবনা-১ আসনটি ছিল জামায়াতের সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর। জামায়াত এখানে দাঁড় করাতে চাইছে স্থানীয় নেতা বাসেত খানকে। যদিও নিজামীর ছেলে নাজিম মোমেনের জন্যও মনোনয়নপত্র কিনেছে দলের একটি অংশ।

কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমানও এই আসনে মনোনয়ন চান। আবার বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন ফরম তুলেছেন সাবেক সংসদ সদস্য মঞ্জুর কাদের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত