তাবলিগেও খুনোখুনি!

জহির উদ্দিন বাবর
 | প্রকাশিত : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৫:২৬

আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো মধ্যে মারামারি-খুনোখুনির খবর আমরা প্রায়ই পাই। কিন্তু তাবলিগ জামাতের মতো নিরেট ধর্মীয় একটি সংগঠনে ক্ষমতা আর আধিপত্য কায়েমকে কেন্দ্র করে মারামারি ও খুনোখুনির ঘটনা ঘটবে এটা ছিল আমাদের কাছে অকল্পনীয়। কিন্তু গত শনিবার এমন ঘটনাই ঘটেছে। টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার মাঠে বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন তিন শতাধিক। যে ইজতেমার মাঠ থেকে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বছরের পর বছর ধরে সেই মাঠ পরিণত হয়েছিল রণক্ষেত্রে। গণমাধ্যমের কল্যাণে আমরা সেই মারামারির দৃশ্যও সরাসরি দেখেছি। যারা এই মারামারিতে লিপ্ত হয়েছিলেন তাদের প্রায় সবাই তাবলিগ জামাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

তাবলিগ জামাতে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কথা বছরদুয়েক ধরেই প্রকাশ্যে আসছে। এর আগেও বিভিন্ন স্থানে ছোটখাটো মারামারির ঘটনা ঘটেছে। তাবলিগের দিল্লি মারকাজের শীর্ষ মুরব্বি মাওলানা সাদকে কেন্দ্র করে মূলত এই দ্বন্দ্বের সূচনা। তিনি তাবলিগের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াসের পরিবারের অধস্থন পুরুষ। তার কিছু বক্তব্য বিতর্ক উস্কে দেয়। ভারতের বিখ্যাত ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ তার সেই বক্তব্যের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয়। তাকে ভ্রান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করে দেওবন্দ। এর সূত্র ধরে তাবলিগ জামাতের অনুসারীরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। আমাদের দেশে যারা তাবলিগ করেন তাদের একটি অংশ মাওলানা সাদকে তাদের প্রধান নেতা হিসেবে মানলেও অন্য পক্ষটি তা মানতে নারাজ। আর দ্বিতীয় অংশটিকে সমর্থন করে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বেশির ভাগ আলেম। এভাবে মাওলানা সাদকে নিয়ে বিভক্ত হয়ে তাবলিগ অনুসারীরা। গত বছর বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদের অংশগ্রহণ নিয়ে দুই পক্ষ বিরোধিতায় জড়ায়। এটি এক পর্যায়ে রাজপথে গড়ায়। অবশেষে সরকারের উচ্চ মহলের হস্তক্ষেপে মাওলানা সাদ বাংলাদেশে এলেও ইজতেমায় অংশগ্রহণ না করে দিল্লি ফেরত যান।

এবারের সংঘাতের সূচনাও বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে। মাওলানা সাদ ইজতেমায় আসবেন কি না এটা নিয়ে মতবিরোধ প্রবল আকার ধারণ করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠকও হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় সরকারি প্রতিনিধিসহ দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা ভারতের দেওবন্দে যাবেন এবং তাদের কাছ থেকে ফতোয়া আনবেন। দেওবন্দ মাওলানা সাদের আকিদা বা বিশ্বাসের ব্যাপারে ক্লিয়ারেন্স দিলে তাকে ইজতেমা আসতে কোনো বাধা দেয়া হবে না এটাই সিদ্ধান্ত হয়। ইজতেমার মাস দুয়েক আগে টঙ্গীর ময়দানে প্রতি বছরই জোড় ইজতেমা হয়ে থাকে। এবারও জোড় হওয়ার কথা ছিল। তবে দুই পক্ষ পৃথক তারিখ দিয়ে এই জোড়ের ঘোষণা দেয়। জোড় ইজতেমার জন্য মাঠ দখলকে কেন্দ্র করেই মূলত শনিবারের সংঘর্ষ।

ইজতেমা মাঠের সংঘর্ষের এই ঘটনা এখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে দুই পক্ষই মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। ইতিমধ্যে ইজতেমা মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে প্রশাসন। নির্বাচনের পর দুই পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে ইজতেমার তারিখ নির্ধারণ হবে বলে জানানো হয়েছে। এতে এবারের ইজতেমা অনেকটা অনিশ্চয়তায় পড়ে গেল। তাছাড়া দেশে যখন নির্বাচনী হাওয়া পুরোদমে বিরাজ করছে তখন তাবলিগের এই মারামারি নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে সরকারকে।

তাবলিগ জামাতকে আমরা এতদিন নিরীহ প্রকৃতির সংগঠন হিসেবেই জানতাম। তারা নিজের খরচে, নিজের খেয়ে দেশ-বিদেশে মসজিদে অবস্থান করে মানুষের মধ্যে ইসলামের প্রচার করে আসছিলেন এতদিন। সাধারণত রাজনীতি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতেন তাবলিগের অনুসারীরা। কিন্তু আভ্যন্তরীণ বিরোধ শুরু হওয়ার পর তারাও বিভিন্নভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে যাচ্ছেন। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ঘায়েল করার জন্য অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতির আশ্রয়ও নিচ্ছেন বলে শোনা যাচ্ছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। তাবলিগের ইজতেমা দেশের জন্যও একটি গর্বের বিষয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসল্লিরা প্রতি বছর এই ইজতেমায় অংশ নেন। বিশ্ব ইজতেমায় এসে একটি ইতিবাচক বাংলাদেশের বার্তা নিয়ে যান বিশ্বের নানা দেশের মানুষেরা। তাবলিগ সংশ্লিষ্টরা এভাবে নিজেরা খুনোখুনিতে লিপ্ত হলে ইজতেমাই পড়বে হুমকিতে। তাছাড়া এটি বাংলাদেশ থেকে সরে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা আছে। এটা দেশের জন্যও বড় ক্ষতির কারণ হবে। দেশ ও ধর্মের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে অন্তত তাবলিগ সংশ্লিষ্টদের এ ধরনের হঠকারী কর্মকা- থেকে বেঁচে থাকা উচিত। আমরা বছরের পর রাজনীতিতে হানাহানি ও সংঘাত দেখে ত্যক্ত-বিরক্ত; এখন তাবলিগের মতো একটি স্বীকৃত ধর্মীয় সংগঠনে এ ধরনের কোনো দৃশ্য দেখতে চাই না।

লেখক : সাংবাদিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত