ছোটদের স্কুলযাত্রা আর নাগরিকের দায়

সাখাওয়াত হোসাইন
 | প্রকাশিত : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৫:১৬

জীবিকার তাগিদে জাপানে আছি। প্রবাস নামক যাযাবর এই জীবনে জাপানের ইবারাকি জেলা (কেন) সাকাই শহর (মাচি) সম্পর্কে অনেক জেনেছি, থাকার সুবাদে দেখেছিও। আর কিছু তথ্য দিয়েছেন ওয়াতানাবে সান নামক স্থানীয় একজন জাপানি অভিভাবক।

এই এলাকা একসময় ব্যবসায়িক শহর হিসেবে বিখ্যাত ছিল বলে তখন জমজমাট ও লোকজনের বেশ সমাগমও ছিল। বর্তমানে সেগুলো কালের অতল গর্ভে হারিয়ে গেছে। এখন বইয়ের পাতায় ইতিহাস নামক অধ্যায় হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে অনেক বছর ধরে। এখন এখানকার রাস্তাঘাট, ঘর-দুয়ার, স্থাপনাগুলো দেখলে কালের সাক্ষী হিসেবে সেই হারিয়ে যাওয়া পুরনো ইতিহাসগুলোই শুধু আপনাকে মনে করিয়ে দিবে। টোকিও বা অন্যান্য শহরের মতো নাগরিক সুবিধাগুলো খুব বেশি একটা এখানে নেই বলে অপেক্ষাকৃতভাবে সিনিয়র সিটিজেনরা অর্থাৎ দাদা-দাদি, নানা-নানিরাই এখানে বেশিসংখ্যক হারে বসবাস করেন।

শুধুমাত্র প্রাইমারি স্কুল, হাইস্কুল থাকলেও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় না থাকায় তরুণ-তরুণীদের বসবাস এই এলাকায় খাঁ খাঁ করছে, যা অনেকটা সাহারার মরুভ‚মির মতোই। চলতে-ফিরতে আবার দু-একজনকে মাঝে সাঝে দেখবেন হয়তো যাতে করে তরুণ-তরুণী নামক ওই শব্দটি যাতে ভুলে না যান।

এলাকাটিতে প্রচুর কল-কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর উঁচু-নিচু টিলা পাহার, অবারিত সবুজ ফসলি মাঠই দেখবেন। আর এই চোখ জুড়ানো সবুজের সমারোহ দেখে আপনি শুধুই বিমোহিত ও মুগ্ধ হয়ে যাবেন। যেখানে এমন কোনো ফসলের ফলন নেই যে, এই এলাকায় না ফলে। বিশেষ করে ইবারাকির কোমে (চাল), মেরন (বাঙ্গি), সুইকা (তরমুজ) এবং প্রচুর মৌসুমি সবজির চাষ হয়, যার বেশ খ্যাতি জাপানের বিভিন্ন এলাকায়। পশ্চিম-দক্ষিণ দিকে আকাশছোঁয়া উঁচু পাহারগুলো সীমানা প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেশি থাকার ফলে প্রচুর বিদেশির বসবাস এই এলাকায়।

মফস্বল শহর হিসেবে এলাকাটিতে খুব বেশি একটা উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি বলে এখনো ট্রেন যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রায় ঘণ্টাখানেক বাসের পথ মারিয়ে আপনাকে ট্রেনের লাগাম পেতে হবে টোকিও বা ট্রেনের মাধ্যমে অন্য কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য যেতে হলে। যদিও মাত্র ২-৩ কিলোমিটার দূর দিয়েই ইবারাকি হাইওয়ে রাস্তা চলে গেছে। যেখান দিয়ে আপনি টোকিওসহ জাপানের যেকোনো গন্তব্যে যেতে পারবেন অনায়াসে।

এই শহরের একটি দৃশ্যে আপনাকে থমকে যেতে হবে। ৬-১২ বছর বয়সী শিশুরা চোউগাক্কোউ (প্রাইমারি স্কুলে) যাচ্ছে। হাতে হলুদ রঙের পতাকাবাহী নির্দিষ্ট নামের গ্রুপ/টিম, টিমলিডার (হানচোউ সান)। যিনি গ্রুপের মধ্যে বয়সে সবার সিনিয়র, ক্লাসের দিকে উপরের ক্লাসের এবং শারীরিক গঠনে ও আকারে সবচেয়ে লম্বা তিনি গ্রুপের লিডার। জুনিয়র ক্লাস, বয়সে ও আকারে ছোটরা মাঝখানে থাকেন। মহল্লার নির্দিষ্ট একটি স্থানে নির্ধারিত সময়ে সবাই উপস্থিত হয়ে টিমলিডারের নেতৃত্বে বাচ্চারা স্কুলে যাওয়া-আসা করে থাকে। আবার যদি নির্দিষ্ট গ্রুপ এলাকায় কোনো সেনছেই (শিক্ষক) বসবাস করেন তাহলে তিনিও ওই গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে বাচ্চাদের সঙ্গেই স্কুলে আসা-যাওয়া করবেন। নির্ধারিত স্কুল পোশাক পরিধান করে, সবার কাঁধে বেশ ভারী তবে বহনযোগ্য, বেশ দামি ও বিশেষ ধরনের স্কুলব্যাগ, টিফিন বক্স এবং হাতে ওচা (চা) বা পানির ফ্লাস্ক থাকবে।

প্রাইমারি স্কুলগুলো ঋতুভেদে সাধারণত সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে শুরু হয়ে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে। বিষয়ভিত্তিক সেনছেই (শিক্ষক)-এর ক্লাস পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিটি ক্লাস ৪০-৫০ মিনিটের হয়ে থাকে। ক্লাস শেষে ৫-১০-১৫ মিনিটের কিউকে (বিরতি) থাকে। দুপুর ১২:০০-১৩:০০ (১.০০) পর্যন্ত মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতি থাকে। মধ্যাহ্ন ভোজের আহার (হিরু গোহান) রোস্টারভিত্তিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত আহার সরবরাহ করা হয়ে থাকে। শুধুমাত্র মধ্যাহ্ন ভোজের আহার বাবদ অভিভাবকদের মাসিক জনপ্রতি জাপানি ইয়েনে (টাকা) ৩,০০০¥ ইয়েন (প্রায় ২,১০০-২,২০০/- টাকা) হারে প্রদান করতে হয় স্কুল কর্তৃপক্ষকে। যদিও বাকি পুরো শিক্ষা কার্যক্রমটি গাক্কুহি ওয়া তাদা দেস/ জেরো ইয়েন দেস অর্থাৎ পুরো শিক্ষা বাস্তবায়ন কার্যক্রমটি সরকারি বা অবৈতনিক। মজার ব্যাপার হলো, জাপানে বসবাসরত বিদেশিদের সন্তানদের শিক্ষার বেলায়ও অনুরূপ নিয়মটি প্রযোজ্য অর্থাৎ সরকারি বা অবৈতনিক।

সিলেবাসের কিছু পরীক্ষাসহ মূলত এই সময়ে বাচ্চাদের নৈতিক, মূল্যবোধ, সমানুবর্তিতা, শ্রদ্ধাবোধ, সহযোগিতাপরায়ণ, দায়িত্বপরায়ণ, পরোপকারী, বিনয়ী হওয়া ও দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা প্রদান করা হয়ে থাকে। যেই শিক্ষাটি তারা ধারণ করে সারা জীবন। অর্থাৎ যা একজন জাপানিজের জীবনের মূল চালিকা কাঠি।

জাপানের বর্জ্য (গমি) ব্যবস্থাপনার দিকটি অসাধারণ। জাপানে বেশির ভাগ ময়লা সামগ্রী বা ফেলে দেওয়া/অব্যবহৃত জিনিসপত্র (স্কার্ভ) পুনরায় ব্যবহার (রিসাইক্লিন প্রসেস/সিগেন গমি) করা হয়ে থাকে। প্রতিটি এলাকায় নির্ধারিত কিছু জায়গায় ময়লা ফেলার স্থান থাকে। সেখানে এলাকার বাসিন্দারা নির্ধারিত দিনে নির্ধারিত জায়গায় ময়লা ফেলেন। সিটি অফিসের লোকজন দিনের শুরুতে মাত্র ৬ ঘণ্টার মধ্যে সেই সব ময়লা সেখান থেকে সরিয়ে ফেলে। আপনি যদি সকালে ময়লা ফেলে অফিসের কাজে বা বাইরে যান আর দুপুরে আহার করতে আবার বাসায় আসেন তাহলে বাটি চালান দিয়েও এতটুকু ময়লা খুঁজে পাবেন না, পাবেন না কোনো প্রকার ময়লার দুর্গন্ধ। আর একজন অতিথির পক্ষে কখনোই বুঝা সম্ভব হবে না যে, এই স্থানটিতে ময়লা ফেলা হয়, যদি কেউ বলে না দেন।

অভিভাবকরা বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়ার নির্দিষ্ট দিনের ময়লার ব্যাগ (গমি নো বোকুরো) হাতে ধরিয়ে দেন ময়লাটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে দেওয়ার জন্য। বাচ্চারা অনায়াসে সেই কাজগুলো করে যাচ্ছে হেসে-খেলে। এখানে এই বয়সে বাচ্চাদের কোনো বাস্তবিক ও দৈনন্দিন জীবনের এমন বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া বাদ থাকে না যা তাদেরকে না শেখানো হয়। আর তাই কোনো জাপানিরা কর্মজীবনে প্রবেশ করে বলতে পারে না যে, এই কাজটি সে পারে না বা তাকে কখনো শেখানোই হয়নি।

আবার ধরুন, যদি কোনো বাচ্চা অভিভাবকের সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। স্বভাবত অভিভাবকরা দৌড়ে গিয়ে তুলবেন আর পরম মমতায় আদর করতে থাকবেন। এখানে বিষয়টি পুরোপুরি উল্টো। এখানে অভিভাবকরা বাচ্চাকে আত্মনির্ভরশীল হতে বা নিজে নিজে উঠতে শেখাবেন আর বলতে থাকবেন গামবারো, গামবারো/গামবাত্তে, গামবাত্তেনে অর্থাৎ চেষ্টা করো তুমিই পারবে।

সরু রাস্তা বলে এই এলাকার রাস্তার যানবাহনগুলো ৩০-৪০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করে থাকে। আর সকাল বেলা যখন স্কুলের বাচ্চারা চলাচল করে তখন যানবাহনের চালকরা যানবাহনের গতিকে আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ করে চলাচল করেন এবং স্কুলের বাচ্চাদের চলাচল ও রাস্তা পারাপারে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। যদিও একটু পরপরই এখানে ট্রাফিক ও রাস্তা পারাপার সিগন্যাল। বাচ্চারা তখন একটু থেমে গিয়ে যানবাহন চালকদের মাথা নিচু করে আইসাতসু (কুর্নিশ করে) দিয়ে ওহাইয়ো গোজাইমাসু (শুভ সকাল) ও আরিগাতুই গোজাইমাসতা (ধন্যবাদ) বলে থাকে। একজন সাইকেল চালক হিসেবে আমার ক্ষেত্রেও আইসাতসু দিতে ব্যত্যয় হয় না এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আমারও তাদেরকে আইসাতসু দিতে এখন আর ভুল হয় না।

সাখাওয়াত হোসাইন: জাপান প্রবাসী বাংলাদেশি, স্কাউট অ্যাসোসিয়েশন অব জাপানের সদস্য

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত