ডিজিটাল মার্কেটিং কৌশল আর আমাদের করণীয়

অনলাইন ডেস্ক
| আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৭:৪৩ | প্রকাশিত : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৭:৩৮

সাল ২০১০ জুন মাস মাত্র শুরু, অ্যাপেল তার নেক্সট ফ্ল্যাগশিপ আইফোন এই মাসেই লঞ্চ করার কথা। প্রযুক্তি নিয়ে যাদের আগ্রহ সীমাহীন তাদের জন্য অ্যাপেল-এর আইফোন সবসময়ই বয়ে আনে উত্তেজনা আর নতুন উদ্ভাবন। স্টিভ জবস অ্যাপেল কোম্পানির জনক, এই জগতের মানুষের কাছে তিনি একজন কিংবদন্তি। নতুন আইফোন বের হবার দুই তিন দিন আগে থেকেই রাতভর জেগে অ্যাপেল এর দোকানের সামনে ভিড় করে মানুষ। নতুন এক উৎসব এর সংস্কৃতিতে এ সময়ের তরুণরা মত্ত। অনলাইনে নানা ভিডিও নানা ধরনের বর্ণনায় বিক্রি শুরু হবার আগেই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকে আইফোন। এর বিক্রি নিয়ে অ্যাপেলকে মনে হয় খুব একটা দুশ্চিন্তার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় না। পণ্যের গুণগতমান আর বিপণন কৌশল এই দুই, আসলে যেকোনো ধরনের পণ্য বিক্রির একটি মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করে।

২০১৮ সাল ডিজিটাল মার্কেটিং সামিটে উবাহ বাটলার, নাম্বার ওয়ান এজেন্সির প্রতিষ্ঠাতার সাথে পরিচয়। উনি লন্ডন এর ১৮,০০০ বিখ্যাত রেস্টুরেন্ট এর মাঝে এক মিথ্যা রেস্টুরেন্টের মালিক বনে যান। যা কিনা পরবর্তীতে ট্রিপ এডভাইজার এর মত রিভিউ সাইটের লিষ্টে নাম্বার ওয়ানে চলে আসে। এ সবই নাকি এক বিরাট ধাপ্পাবাজির অংশ। লন্ডন এর মত জায়গাতে এটা কিভাবে সম্ভব তা অনেকের কাছেই আশ্চর্যজনক ব্যাপার।

আচ্ছা চলুন উপরের দুটি ঘটনাই একটু বিবেচনা করে দেখা যাক। যদিও অ্যাপেল কিংবা উবাহ বাটলার এর দা শেড এর মাঝে তুলনা করাটা আসলে যুক্তি সঙ্গত কিনা এখন বলা মুশকিল। মার্কেটিং বা বিপণনের ছাত্র আমরা যারা তাদের পড়াশোনার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল কিভাবে একটি পণ্যের জন্য বিক্রয় অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা যায়। এটি আসলে কিভাবে করা সম্ভব বা এটি কি আদৌ করা সম্ভব কিনা তাই নিয়ে আমার এই লেখা। চলুন তাহলে দেখা যাক বিক্রয় অনুকূল পরিবেশ আসলে কি এবং কেন একজন ক্রেতা একটি পণ্য কিনতে বা ঐ পণ্যটি কেনার প্রয়োজন মনে করেন।

আমরা যখনি কোন কিছুর প্রয়োজন অনুভব করি তখন থেকেই শুরু হয় আমাদের ঐ প্রয়োজন মিটানোর চেষ্টা। আর এই প্রয়োজন মিটানোর চেষ্টা থেকেই শুরু হয় পণ্য বিক্রয়ের প্রতিযোগিতা। ধরুন, সময় দেখার প্রয়োজন থেকে আপনি একটি ঘড়ি কিনবেন ঠিক করলেন। তা কোন ঘড়িটি কিনবেন বা কোথা থেকে কিনবেন তা কিভাবে ঠিক করবেন? প্রথমে তো আত্মীয় স্বজন অথবা বন্ধু বান্ধব এর কাছ থেকে জানবেন যে তারা কি ঘড়ি ব্যবহার করেন এবং তাদের মতামত কি, এরপর দেখবেন বিজ্ঞাপন টেলিভিশন অথবা সংবাদপত্রে। তারপর মূল্য এবং নিজের বাজেট চিন্তা করে নির্ণয় করবেন যে কোথা থেকে এবং কত দামে কোন ঘড়িটি কিনবেন।

আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা আর ডিজিটাল মার্কেটিং এর প্রসারের কারণে একজন ক্রেতার জন্য যেকোনো পণ্য কেনার বিষয়ে সিদ্বান্ত নেয়া হয়ে গেছে এখন অনেক সহজ। পজিটিভ পারসেপশন বা অনুকূল মতবাদ তৈরি করাটা এই সময় মনে হয় একটু সহজও হয়েছে।

যেমন ধরা যাক উবাহ বাটলার এর শেড রেস্তোরাঁ যেটির আসলে কোন অস্তিত্ব নেই অথচ ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থার কারণে লন্ডন এর মতো শহরে ১৮,০০০ রেস্তোরাঁর মধ্যে ১ নম্বর স্থানে পৌঁছে গেছে। যার পিছনে কাজ করেছে ইতিবাচক মতামত আর কয়েকটি সুন্দর খাবারের ছবি। লন্ডন শহরের এই অস্তিত্ববিহীন রেস্তোরাঁর খবর মিডিয়াতেও দিয়েছিল ভালোই নাড়াচাড়া। বিবিসি’র মতো সংবাদ সংস্থাও উবাহ বাটলার কে নিয়ে করে ফিচার।

এদিকে অ্যাপেল কোম্পানির আইফোন জ্বর এমন ভাবেই ছড়িয়ে পড়েছে যে বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ দুই তিন দিন আগেই অ্যাপেল স্টোর এর বাইরে তাঁবু টানান আইফোন কেনার জন্য। ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থা, অনলাইন রিভিউ, আকর্ষণীয় অনলাইন ভিডিও কমার্শিয়াল সব মিলিয়ে তৈরি হয় বিক্রয়ের অনুকূল পরিবেশ ঠিক যেমন তৈরি হয়েছিল শেড এর জন্য খাবার আগ্রহীদের আকর্ষণ।

কোন পণ্য ক্রয় করার ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময় অন্য একজনের অভিজ্ঞতা আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সাহায্য করে। উবাহ বাটলার এর শেড এর ক্ষেত্রেও তাই কাজ করেছে। যেখানে ট্রিপ এডভাইজর এর মতো সাইট এ উবাহ বাটলার এর পরিবারের সদস্য এবং তার বন্ধুদের অনুকূল অভিমত এর কারণে শেড ১ নম্বর স্থা্নে পৌঁছে যায়, আর ১ নম্বর রেস্তোরাঁয় প্রিয়জন কে নিয়ে কেই বা না খেতে চাইবে। ঠিক এমনি একটি ঘটনা ঘটে অ্যাপেল এর সাথেও, ফ্ল্যাগশিপ আইফোন ফোর যখন বাজারে আসে। এই ফোন টি নিয়ে সবার অসীম আগ্রহ আর তা থেকে প্রথম ৭ দিনেই বিক্রির রেকর্ড, কিন্তু এর পর ধরা পরে একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা। যার কারণে স্বয়ং স্টিভ জবস কে আবারও স্টেজে আসতে হয় আবেদন নিয়ে, যে কেউ চাইলে ফোন ফেরত দিয়ে টাকা নিতে পারেন আবার যারা রাখতে চান তাদের জন্য রয়েছে অ্যাপেল এর ফোনের কভার উপহার স্বরুপ।

বিশ্ব সংবাদমাধ্যম গুলোতে যখন উবাহ বাটলার কে নিয়ে মাতামাতি হচ্ছে সেই সময় এই ফেক রিভিউ নিয়ে সিঙ্গাপুরে এক নতুন আইন জারি হয়। এটা বোধহয় পি আর ব্যবস্থাপনার একটি সুন্দর উদাহারণ হিসাবে আধুনিক বিপণন এর ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

যাই হোক উবাহ বাটলার এর অস্তিত্বহীন রেস্তোরাঁ আর অ্যাপেল এর ত্রুটিযুক্ত ফোন দুটি উদাহারণে হয়ত মিল নেই আবার মিল থাকতেও পারে। কিন্তু ক্রেতা হিসাবে আমাদের দায়িত্ব হল সঠিক জায়গা থেকে সঠিক তথ্য নিয়ে এবং নিজের বিবেচনায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া। যাতে প্রিয়জন কে নিয়ে সুন্দর এবং স্বাস্থ্য সম্মত রেস্তোরাঁয় খাবার অভিজ্ঞতা হয় অথবা ক্যমেরা ফোনে ছবিটি হয় সুন্দর আর ফোনালাপ যেন হয় ত্রুটিহীন। কারণ প্রতিটি উপার্জিত টাকা আসলে কষ্টার্জিত।

আরিফুর রহমান: হেড অব ডিজিটাল মিডিয়া,স্টারকম বাংলাদেশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত