স্বৈরাচার পতন দিবসের কিছু কথা

শফী আহমেদ
 | প্রকাশিত : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৩:১০

আজ ৬ ডিসেম্বর। এই দিনটিকে আমরা ‘স্বৈরাচার পতন দিবস’ হিসেবে পালন করি। ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর ছাত্রজনতার দুর্বার গণ-আন্দোলনের মুখে সামরিক জান্তা স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সেই সময়কার নির্ভরযোগ্য সংবাদ মাধ্যম বিবিসির মাধ্যমে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ৫ ডিসেম্বর আন্দোলনরত তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নির্ধারিত হয়। যদিও সংবিধান লঙ্ঘন করে এরশাদ ক্ষমতা দখল করেছিল কিন্তু সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ রাখার এক অদ্ভুত প্রয়াসে, স্বৈরাচার এরশাদ তার সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে পরবর্তী সময়ে তিন জোটের মনোনীত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী হয়।

উল্লেখ্য, তিন জোটের মনোনীত তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ শর্তাধীনে এই সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি এই নিশ্চয়তা চান যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ শেষে তাকে আবার স্বপদে অর্থাৎ প্রধান বিচারপতি পদে ফিরে যেতে দিতে হবে। সেই অর্থে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বরকে এদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ ‘স্বৈরাচার পতন দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।

লাখো প্রাণের বিনিময়ে, মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। সেই অর্থে ডিসেম্বর হচ্ছে আমাদের বিজয়ের মাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা, কারা-অভ্যন্তরে একই বছরের ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে একাত্তরের পরাজিত শক্তি ক্ষমতা দখল করে এবং বাংলাদেশকে উল্টো রথে পরিচালনা করার সব আয়োজন সম্পন্ন করে। লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা বন্দী হয়ে যায় সামরিকতন্ত্রের বেড়াজালে। সামরিকতন্ত্রের বেড়াজালে আবদ্ধ হওয়ার জন্য তো বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ করেনি। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে যে লড়াই শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে তা ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭০’র নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে এককভাবে মেন্ডেট দিয়েছিল গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যে। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়নি। ছয় দফা রূপান্তরিত হয় এক দফায়,  ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’।

২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হায়েনারা ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর। শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ, গঠিত হয় ‘মুজিবনগর সরকার’। গ্রেপ্তার হন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে একটি সফল যুদ্ধ পরিণত লাভ করে আমাদের মুক্তি সংগ্রামে। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের এই মুক্তিসংগ্রামকে নিঃশর্ত সমর্থন করে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হলে মিত্রবাহিনী, মুক্তিবাহিনীর সহযোগিতায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত হয়।  মুক্তিবাহিনী, মিত্রবাহিনী যৌথ আক্রমনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি জান্তার সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে।  ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) আত্মসমর্পণের দলিলে সই করেন জেনারেল নিয়াজী। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর পক্ষে ভারতের জেনারেল জগজিৎ সিং অররা ও মুক্তিবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় সেনাপতিরা।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডন, দিল্লি হয়ে বঙ্গবন্ধু বিজয়ীর বেশে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু সাড়ে তিন বছরের মাথায় কতিপয় বিপথগামী সেনাকর্মকর্তা, সরকার ও দলের অভ্যন্তরে লুকায়িত ১৯৪৭-এর চেতনায় বিশ্বাসী বিশ্বাস ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বাংলাদেশকে সামরিকতন্ত্রের বেড়াজালে বন্দী করে।

সামরিকতন্ত্র থেকে মুক্তি লাভের নবতর সংগ্রামের সূচনা হয় সেই সময় থেকেই। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে জারি করেন নতুন সামরিক শাসন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠন এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের সূচনা করে। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসংগ্রামের নেতৃত্বে পরিচালিত ছাত্র-সমাজের আন্দোলনকে জয়নাল, জাফর, মোজাম্মেল কাঞ্চন, দীপালী সাহাসহ অসংখ্য শহীদের বুকের ওপর বুলেট চালিয়ে স্তব্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু মিলিটারির বুটের তলায় পিষ্ঠ হওয়ার জন্য এই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। ছাত্র-আন্দোলন দিনে দিনে বেগবান হতে থাকে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয় ও চূড়ান্ত আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে গঠিত হয় সাত দলীয় ঐক্যজোট ও সংগ্রামী ছাত্রসমাজ নামের আরেকটি জোট। গড়ে উঠে যুগপৎ আন্দোলন।

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর শহীদ নূর হোসেনের আত্মদানের মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলন তুঙ্গে উঠে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আপসকামিতা ও  বিভেদের মাধ্যমে সেই আন্দোলনকে খুনি জান্তা এরশাদ স্থিমিত করে দেয়।

১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর শহীদ জেহাদের লাশকে সামনে নিয়ে সব ছাত্র-সংগঠন (জামায়াত-শিবির ও ধর্মভিত্তিক ছাত্রসংগঠন বাদে) ঐক্য গড়ে তুলে। পরবর্তী সময়ে যার নামকরণ করা হয় সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য। সেখানে ডাকসুও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের নেতৃত্বে ছাত্রসমাজ অপ্রতিরোধ্য ছাত্র-আন্দোলন গড়ে তোলে। রাজনৈতিক অঙ্গনে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আট দল, পাঁচ দল ও বেগম জিয়ার নেতৃত্বে সাত দলীয় ঐক্যজোট যুগপৎ কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন পরিসমাপ্তির দিকে নেয়ার অর্থাৎ সামরিক শাসনের চির অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে একের পর এক কর্মসূচি ঘোষণা করতে থাকে। সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য ১০ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করে। তিন জোট তাদের ঐতিহাসিক রূপরেখা তৈরি করে। উভয় কর্মসূচির সারাংশ ছিল সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে পরিচালিত করা। এক কথায় বলা যায়, আমাদের যে ৭২-এর সংবিধানের যে মূল ভিত্তি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে একটি উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করা।

আমাদের এই রক্তক্ষয়ী নয় বছরের আন্দোলনে শহীদ হনÑ রাউফুন বসুনিয়া, শাজাহান সিরাজ, তিতাস, অ্যাডভোকেট ময়েজ উদ্দিন আহমেদ, শ্রমিক নেতা তাজুল, ফিরোজ, জাহাঙ্গীরসহ হাজারো গণতন্ত্রকামী মানুষ। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলনের আত্মদানের মধ্য দিয়ে ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, সংগ্রামী নারী সমাজ ও শেষ পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তারাও আন্দোলনে সমবেত হন। এক পর্যায়ে জান্তা এরশাদ ১৪৪ ধারা এবং কারফিউ জারি করেন। রাস্তায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। ছাত্র-আন্দোলনে বিভেদ ঘটানো জন্যে খুনি মাস্তানদের জেলখানা থেকে বের করে ছাত্রসমাজের ওপর সশস্ত্র হামলা পরিচালনা করে। কিন্তু ছাত্র-জনতার উত্থাল প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে এরশাদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীও এরশাদের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় জান্তা এরশাদ। ৪ ডিসেম্বর পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও তা কার্যকরী হয় ৬ ডিসেম্বর। ইতিহাসে কোনো দেশে কোনো স্বৈরশাসকেই দমন-পীড়ন চালিয়ে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে নাই। পারেনি বাংলাদেশেও। এরশাদ নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে।

অর্জিত গণতন্ত্রকে কীভাবে আরও সুসংহত করা যায়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও সুরক্ষা দেয়া যায়, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায়, সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থে জনগণের শাসন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, দুর্নীতির লাগান টেনে ধরা যায় তাই হওয়া উচিত আমাদের ভবিষ্যৎ রূপরেখা।

লেখক: স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের বিজয়ী ছাত্র সমাজের নেতা ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত