শরিকদের ছাড়ের ক্ষেত্রে হিসাবি বিএনপি

বোরহান উদ্দিন
 | প্রকাশিত : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৯:১২

আওয়ামী লীগের মতোই বিএনপিও শরিকদের আসন ছাড়ের বিষয়ে বেশ সতর্ক। উদার হস্তের বদলে হিসাব-নিকাশ করেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ শুরুতে ৭০টি আসন ছেড়ে দেওয়ার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত ছাড়ছে ৬০টিরও কম। বিএনপিও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।

এরই মধ্যে শরিকদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে শেষ মুহূর্তে শরিক দলগুলো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আগামী রবিবারের মধ্যেই প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করে প্রতিটি আসনে দল বা জোটের একজন প্রার্থীকে প্রত্যয়নপত্র দিতে হবে। বিএনপি জানিয়েছে, আজ বিকেলে তারা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে।

তবে এরই মধ্যে বিএনপি এবং তার শরিক দলগুলোর নেতাদের কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে সিংহভাগ আসনেই আসলে প্রার্থিতা নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে।

বিএনপি ২০০১ সাল থেকেই জোটবদ্ধ হয়ে ভোটে লড়ছে। মাঝে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বর্জনও করেছে তারা একসঙ্গে। তবে এবার আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে বিএনপিকে অবশ্য খানিকটা ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে যে পুরনো জোট ২০ দলের পাশাপাশি নতুন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবিও বিবেচনা করতে হচ্ছে।

গত ১৩ অক্টোবর ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর থেকে ২০ দলের চেয়ে ঐক্যফ্রন্টকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে বিএনপি। তবে আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে বিএনপি।

গতকাল রাত থেকে দলের প্রার্থীদের গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয় থেকে চূড়ান্ত মনোনয়নের চিঠি দেওয়া শুরু হয়। তবে জোটের শরিকদের সঙ্গে পুরোপুরি সমঝোতায় আসতে পারেনি বিএনপি। গতকাল বিকেলে যদিও এ নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক হয়েছে বিএনপির নেতাদের সঙ্গে।

৩০০ আসনের মধ্যে ২৫০-এর মতো আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত। তবে নির্বাচন কমিশনের আপিল, জোটের শরিকদের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় চূড়ান্ত প্রার্থীদের হাতে চিঠি তুলে দিতে বিলম্ব করে বিএনপি।

বিএনপির নেতারা বলছেন, ২০ দল এবং ঐক্যফ্রন্টকে ৫০টি আসনের মতো ছাড়তে চাইছেন তারা। তবে বেশি চাপাচাপি করলে বড়জোর আরও ১০টি দেওয়া হবে।

তবে নিজেদের প্রার্থীকে যোগ্য দাবি করে আরও আসন চাইছে জোটের শরিকরা। এর মধ্যে ঐক্যফ্রন্ট নিজেই ৫০টির বেশি চাইছে। তবে দফায় দফায় বৈঠক শেষে শরিকদের চাহিদা এবং বিএনপির ছাড়ের মধ্যে ব্যবধান অনেকটাই কমে আসছে। শুধু গণফোরামকে ছাড় দেওয়া এবং তাদের দাবির মধ্যে পার্থক্য বেশি।

আসন ছাড়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দলটিকে এরই মধ্যে ২৫টি আসন নিশ্চিত করা হয়েছে। আরও কয়েকটি তারা নিশ্চিত করতে চাইছে।

প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক নেতা ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘শরিকদের জন্য সর্বোচ্চ ৬০ আসন ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। প্রস্তুতি শেষ। রাত থেকে চিঠি দেওয়া হবে। এ ছাড়া আপিলেও অনেকে প্রার্থিতা ফিরে পাচ্ছেন। সেসব জায়গায় কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে।’

ঐক্যফ্রন্টে বেশি সমস্যা

আসন বণ্টন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে ২০ দলীয় জোটের শরিকদের থেকে ঐক্যফ্রন্টে সমস্যা বেশি হচ্ছে। কারণ তাদের চাহিদা আর অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য বেশি।

এই জোটের শরিক গণফোরাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলÑজেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও নাগরিক ঐক্য পঞ্চাশের বেশি আসন চাইছে। এর মধ্যে গণফোরামের আসনসংখ্যা বেশি।

এসব দলের ভালো ও গ্রহণযোগ্য এবং ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়লে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা আছে, এমন প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ছাড় দিতে রাজি বিএনপি। কিন্তু শরিকদের দাবি, বিএনপি যা দিচ্ছে এর থেকে বেশি যোগ্য প্রার্থী আছে তাদের দলে।

গণফোরামকে চারটি আসন নিশ্চিত করেছে বিএনপি। এর মধ্যে মোস্তফা মহসিন মন্টুকে ঢাকা-৭, আবু সাইয়িদকে পাবনা-১ ও সুলতান মোহাম্মদ মনসুরকে মৌলভীবাজার-২, আ ম সা আমিনকে কুড়িগ্রাম-২ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে।

এর বাইরে আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেলে রেজা কিবরিয়াকে হবিগঞ্জ-১ আসন দিতেও আপত্তি নেই বিএনপির। গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী গোঁ ধরেছেন ঢাকা-৬ আসনের জন্য। কিন্তু সেখানে বিএনপির নেতা সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেনকেই এগিয়ে রাখছে বিএনপি। এই আসন নিয়ে চলছে দেনদরবার।

তবে কামাল হোসেনের দলের পক্ষ থেকে আরও ১২টি আসন দাবি করা হচ্ছে। তা নিয়েই দরকষাকষি চলছে।

রাজধানীতে আরও একটি ছাড়াও মানিকগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, মৌলভীবাজার ও পটুয়াখালীতে যোগ্য প্রার্থী আছে বলে দাবি করছে গণফোরাম।

কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগকে দুটি আসন দিতে আপত্তি নেই বিএনপির। এগুলো হলো টাঙ্গাইল-৪ ও টাঙ্গাইল-৮। তবে দলটি টাঙ্গাইল-৭, টাঙ্গাইল-৫ এবং গাজীপুর-৩ আসন চাইছে।

জেএসডিকে তিনটি আসনের বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আছে দলের সভাপতি আ স ম আবদুর রবের লক্ষ্মীপুর-৪, সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতনের কুমিল্লা-৪। তবে বাকিটা কোন আসন, সেটা জানা যায়নি।

তবে জেএসডি ঢাকা-১৪ আসনে কামাল উদ্দিন পাটোয়ারী, ঢাকা-১৮ শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপনকে প্রার্থী করতে চাইছে। কিশোরগঞ্জ-৩ আসনও তারা দাবি করেছে।

বগুড়া-৭-এ খালেদা জিয়াসহ বিএনপির তিন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের খবরে সেখানেও জোটের প্রার্থী হওয়ার আশা করেছিল জেএসডি। তবে আপিলে বিএনপির নেতা মোরশেদ মিল্টন প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ায় ভেঙে গেছে সে স্বপ্ন।

অন্যদিকে নাগরিক ঐক্যকে দুটি আসন দেওয়ার চিন্তা করা হলেও তারা আরও চারটি আসন চাইছে। মাহমুদুর রহমান মান্নার জন্য বগুড়া-২ এবং এস এম আকরামকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন দেওয়া হতে পারে। তবে মান্নার দাবি করা আসনে বিএনপির প্রার্থী বেশ শক্তিশালী। তাই ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

জামায়াত পাচ্ছে যেগুলো

জামায়াতকে মোট ২৫টি আসনে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়ার কথা জানা গেছে। আসনগুলো হলো: ঠাকুরগাঁও-২ (আবদুল হাকিম), দিনাজপুর-১ (মোহাম্মদ হানিফ), দিনাজপুর-৬ (আনোয়ারুল ইসলাম), নীলফামারী-২ (মনিরুজ্জামান মন্টু), নীলফামারী-৩ (আজিজুল ইসলাম), গাইবান্ধা-১ (মাজেদুর রহমান সরকার), সিরাজগঞ্জ-৪ (রফিকুল ইসলাম খান), পাবনা-৫ (ইকবাল হুসাইন), ঝিনাইদহ-৩ (মতিয়ার রহমান), যশোর-২ (আবু সাঈদ মুহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন), বাগেরহাট-৩ (আবদুল ওয়াদুদ), বাগেরহাট-৪ (আবদুল আলীম), খুলনা-৫ (মিয়া গোলাম পরওয়ার), খুলনা-৬ (আবুল কালাম আজাদ), সাতক্ষীরা-২ (আবদুল খালেক), সাতক্ষীরা-৩ (রবিউল বাশার), সাতক্ষীরা-৪ (গাজী নজরুল ইসলাম), পিরোজপুর-১ (শামীম সাঈদী), ঢাকা-১৫ (শফিকুর রহমান), কুমিল্লা-১১ (সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের), চট্টগ্রাম-১৫ (আ ন ম শামসুল ইসলাম), কক্সবাজার-২ (হামিদুর রহমান আযাদ), সিলেট-৫ (ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী), সিলেট-৬ (হাবিবুর রহমান) ও রংপুর-৫ আসন (গোলাম রাব্বানী)।

তবে দিনাজপুর-১ আসনে হানিফ এবং রংপুর-৫ আসনে রাব্বানীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে গেছে। এর বিরুদ্ধে এরই মধ্যে একজন আপিল করেছেন। অন্যজনের বিশেষ কারণে আপিলের সুযোগ রয়ে গেছে।

তবে জামায়াত আরও তিনটি আসনের জন্য চাপাচাপি করছে। এগুলো হলো: চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩, পাবনা-১ ও রাজশাহী-১।

জোটভুক্ত হওয়ার পর থেকে কখনোই জামায়াতকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসন ছাড় দেয়নি বিএনপি। তবে বিএনপিকেও ছাড় দেয়নি জামায়াত। দুটি নির্বাচনেই সেখানে দুই দলেরই প্রার্থী ছিল। তবে ২০০৮ সালে এই সুযোগে আওয়ামী লীগ জিতে আসায় এবার বিএনপি-জামায়াতে সমঝোতা হতেও পারে।

২০ দলের অন্যরা যেগুলো পাচ্ছে

এলডিপিকে চট্টগ্রাম-১৪, কুমিল্লা-৭, লক্ষ্মীপুর-১ ও নেত্রকোণা-১ দেওয়া হয়েছে বলে বলা হচ্ছে। তবে নেত্রকোণা-১ আসনে আবদুল করিম আব্বাসীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তিনি সেখানে প্রার্থী হতে না পারলে এলডিপি চট্টগ্রাম-৭ আসনটি চাইবে।

জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান টি আই ফজলে রাব্বীর জন্য গাইবান্ধা-৩ আসনটি দেওয়া হয়েছে। আরও একটি আসন ছাড়া হতে পারে। যদিও সেটা নিশ্চিত নয়।

কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম চট্টগ্রাম-৫, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ ভোলা-১, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মোহাম্মদ ওয়াক্কাস যশোর-৫ এবং শাহীনুর পাশা চৌধুরী সুনামগঞ্জ-৩ আসন পাচ্ছেন।

খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাদের হবিগঞ্জ-৪, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নড়াইল-২, জাগপার শফিউল আলম প্রধানের মেয়ে তাসমিয়া প্রধান পঞ্চগড়-২, মশিউর রহমান যাদু মিয়ার মেয়ে পিপলস পার্টির রিটা রহমানের রংপুর-৩ আসন পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। মাইনরিটি জনতা পার্টির সুকৃতি কুমার ম-ল যশোর-৪ আসন পেতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত