ভোটারের দুয়ারে প্রার্থীরা

কাজী রফিক
 | প্রকাশিত : ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:৪৬

‘নৌকা’, ‘নৌকা’; ‘ধানের শীষ’, ‘ধানের শীষ’; ‘লাঙ্গল’, ‘লাঙ্গল’। নির্বাচনী জ্বর দেশজুড়ে, চলছে স্লোগান। ভোট চেয়ে চলছে মিছিল, উঠান বৈঠক, মাইকিং। পাঁচ বছর আগে ভোটে আসেনি ক্ষমতাসীনদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি-জামায়াত জোট। তাই নির্বাচনী আমেজ ছিল না দেশে। এবার পাল্টে গেছে পরিস্থিতি। আগের জোটের পাশাপাশি তারা শক্তি বৃদ্ধি করেছে নতুন জোট ঐক্যফ্রন্ট করে।

একই পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের জোটে। ২০০৮ সালের মতোই জাতীয় পার্টিকে এনে গঠিত হয়েছে মহাজোট। এতে যোগ দিয়েছে যুক্তফ্রন্টও। সব মিলিয়ে জমজমাট লড়াইয়ের প্রস্তুতি।

গত ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার দিনও জানা যাচ্ছিল না বিএনপি এবার ভোটে আসবে কি না। কিন্তু তিন দিন পর তারা ভোটে আসার ঘোষণা দেওয়ার পর রাজনীতিতে ফিরে আসে স্বস্তি।

এরপর এক মাস ধরে চলেছে প্রার্থী বাছাই, শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টনের আনুষ্ঠানিকতা। সেগুলো শেষ হওয়ার পর গতকাল হয়েছে প্রতীক বরাদ্দ। আর প্রতীক পাওয়ার পর পর প্রার্থী এবং তার সমর্থকেরা ভোটারদের কাছে যাওয়া শুরু করেন দল বেঁধে।

বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রচার মানেই মিছিল, স্লোগান, মাইকিং, চায়ের দোকানে তর্ক-বিতর্ক, বিশ্লেষণ। ২০০৮ সাল থেকে বড় সমাবেশের বদলে শুরু হয় উঠান বৈঠক। তবে দলের প্রধানরা কেবল সমাবেশ করতে পারছেন।

সারা দেশের তুলনায় ঢাকার প্রচার একটু ভিন্ন। এখানে মিছিল, সমাবেশ বা মাইকিং মফস্বল বা গ্রাম এলাকার মতো হয় না। রাজধানীতে নির্বাচনী আইনের প্রয়োগ এবং আইন মানতে প্রধান দলগুলোর মধ্যে প্রবণতাও বেশি থাকে।

তবে প্রথম দিন প্রচারে বেশি নেমেছেন আওয়ামী লীগ এবং মহাজোটের প্রার্থীরা। বিএনপির প্রার্থী ও সমর্থকরা কিছুটা ধীরে চলো নীতি নিয়েছেন। একটি নির্বাচনী এলাকায় প্রচার শুরুর দ্বিতীয় দিন থেকে মাঠে নামার কথা জানিয়েছেন তারা।

এর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রধান জোটের পক্ষ থেকেই ভোটে জয়ের আশার কথা জানানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নেতিবাচক রাজনীতির কারণে ভোটাররা প্রত্যাখ্যান করবে বিএনপি জোটকে।

অন্যদিকে বিএনপিকে নিয়ে গঠন করা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, কারচুপি না হলে ভোটে জিতবেন তারাই।

ঢাকার যে চিত্র

বিকেল পাঁচটা নাগাদ রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন এলাকায় মিছিল করেন একদল নারী। তারা ঢাকা-৮ আসনে মহাজোটের প্রার্থী রাশেদ খান মেননের পক্ষে নৌকা মার্কায় ভোট চান।

ঢাকা-১২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে পোস্টার সাঁটাতে দেখা গেছে নেতাকর্মীদের। কয়েকটি এলাকায় জনসংযোগ করতেও দেখা গেছে সমর্থকদের।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর (ঢাকা-১৩) এলাকার চন্দ্রিমা হাউজিং, মিরপুর বেড়িবাঁধ ও মনিপুর এলাকায় কয়েকটি প্রচারকেন্দ্র বসানো হয়েছে। গতকাল বিকেলের পর থেকে সেখানে শুরু হয় নেতাকর্মীদের আনাগোনা।

এই আসনে বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের একটি অংশ দলীয় প্রার্থী আবদুস সালামের পক্ষে এখনো নামছেন না। সরকারি তিতুমীর কলেজের ছাত্রদলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আজ (মঙ্গলবার) সকাল থেকে ঢাকা-১৩ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আব্দুস সালামের পক্ষে আমরা প্রচারণা শুরু করব।’

ঢাকা-৯ আসনে বিএনপির প্রার্থী আফরোজা আব্বাস শাহজাহানপুরের বাসায় মহিলা দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে পোস্টার বিতরণ করেন। পরে তিনি নামেন জনসংযোগে।

শেখ হাসিনা নামছেন আজ

আজ মঙ্গলবার কোটালিপাড়া উপজেলা সদরে শেখ লুৎফর রহমান ডিগ্রি কলেজ মাঠে বেলা আড়াইটায় সমাবেশ করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মাধ্যমে তার নির্বাচনী প্রচার শুরু হবে। এরপর তিনি জেলায় জেলায় প্রার্থীদের পক্ষে জনসভা করবেন।

এটি প্রধানমন্ত্রীর নিজের নির্বাচনী এলাকা। আর তাকে বিজয়ী করতে দলের নেতা-কর্মীরা এরই মধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন।

‘খালেদার আসনে’ এখনো বসে বিএনপি

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বগুড়ার যে দুটি আসনে ভোটে লড়তেন, তার মধ্যে বগুড়া-৬ আসনে এখনো সেভাবে মাঠে নামেনি বিএনপি। দ-ের কারণে ভোটে আসতে না পারায় আসনটিতে বিএনপি এবার প্রার্থী করেছে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। তবে তিনি নির্বাচনী এলাকায় কবে আসবেন, সেটা স্পষ্ট নয়।

বিএনপি না নামলেও মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির নুরুল ইসলাম ওমর প্রথম দিনেই দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে প্রচার শুরু করেন। এরপর তিনি তার পক্ষে বিতরণ করেন লিফলেট।

বগুড়া-৭ আসনেও বিএনপির পক্ষে প্রথম দিন পুরোদমে প্রচার শুরু হতে দেখা যায়নি। এখানে মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির আলতাফ হোসেন অবশ্য প্রচারে নামতে দেরি করেননি। এখানে এবার বিএনপির প্রার্থী মোরশেদ মিল্টন।

অবশ্য আসন দুটিতে প্রচার যা-ই হোক না কেন, জয়ের ব্যাপারে বিএনপিতে কোনো সংশয় নেই। কারণ, প্রতিবার বিপুল ভোটে এখানে জিতে এসেছেন খালেদা জিয়া।

জেলার সাতটি আসনের মধ্যে বাকি পাঁচটিতে দুই পক্ষই ব্যাপক প্রচার শুরু করে দিয়েছে। বগুড়া-২ আসনে ঐক্যফ্রন্টের শরিক মাহমুদুর রহমান মান্না প্রতীক পাওয়ার পর পর বিকেলেই মাঠে নামেন। জাতীয় পার্টির শরীফুল ইসলাম জিন্নাহর পক্ষেও শুরু হয়েছে জনসংযোগ।

বগুড়া-১, ৩ এবং ৪, ৫ আসনেও শুরু হয়ে গেছে ভোটারের মন জয়ের লড়াই। জেলার অন্য আসনগুলোর তুলনায় এখানে এসব আসনে দুই প্রধান দলের মধ্যে ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে থাকে।

খালেদা জিয়ার আরেক আসন ফেনী-১-এ এবার বিএনপির প্রার্থী রফিকুল আলম মজনু প্রচার শুরু করেছেন বিএনপি নেত্রীর পূর্বপুরুষদের কবর জিয়ারত করে।

প্রতীক পেয়েই মিছিল

খুলনা-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েলের পক্ষে গতকাল বিরাট এক মিছিল বের হয় নগরীর রূপসা থেকে।

সদর থানাধীন রূপসা মোড় থেকে মিছিলটি রয়্যাল মোড়, শিববাড়ি মোড়, ময়লাপোঁতা মোড়, শিববাড়ি মোড়, ডাকবাংলো মোড় হয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হয়।

বাগেরহাট-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ সারহান নাসের তন্ময় নির্বাচনী প্রতীক পাওয়ার পর পর তাকে নিয়ে মিছিল বের করেন কর্মী-সমর্থকরা।

শেখ তন্ময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতি। তার বাবাও নৌকা প্রতীকে (বাগেরহাট-১) ভোট করছেন এবং ছেলের সঙ্গে মিছিলে অংশ নেন তিনিও।

ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পক্ষে শোডাউন হয়েছে। ত্রিশাল পৌর শহরে দুপুরে নৌকার প্রার্থী রুহুল আমিন মাদানীর পক্ষে মিছিল বের হয় প্রথমে। এরপর বের হয় বিএনপির মাহবুবুর রহমান লিটনের ধানের শীষে।

নেত্রকোণায় রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পরপরই নেত্রকোণা-২ আসনে নৌকার প্রার্থী আশরাফ আলী খান খসরু এবং নেত্রকোণা-৩ আসনে নৌকার প্রার্থী অসীম কুমার উকিলের সমর্থকরা মিছিল বের করেন।

টাঙ্গাইলের আটটি আসনে সকালে প্রতীক বরাদ্দের পর পর শুরু হয় মাইকিং, মিছিল। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনেই ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ।

ময়মনসিংহে ধানের শীষ ও লাঙ্গলের মিছিল

ময়মনসিংহ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবু ওয়াহাব আকন্দ রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রতীক নেওয়ার পরপর তার সমর্থকরা হরিকিশোর রায় রোডে ধানের শীষের পক্ষে মিছিল বের করেন। তারা ধানের শীষের বিজয় ছিনিয়ে আনতে সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

এই আসনে নৌকার পক্ষে প্রচার নেই। কারণ, মহাজোটের প্রার্থী এখানে জাতীয় পার্টির নেত্রী বেগম রওশন এরশাদ। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা আছেন তার সঙ্গেই।

প্রতীক পেয়ে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা একসঙ্গে বের করেন আনন্দ মিছিল। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এহতেশামুল আলম, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন, মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি জাহাঙ্গীর আহমেদ প্রমুখ এ সময় অংশ নেন।

জাতীয় পার্টির নেতারা বলেন, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে মহাজোট এগিয়ে যাবে। মহাজোটের প্রার্থীকে নিয়ে যেকোনো ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাবে।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলেন, মহাজোটের প্রার্থী বেগম রওশন এরশাদের পক্ষে বিজয়ের জন্য তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবেন।

মাজার জিয়ারত

পটুয়াখালী-১ আসনের আওয়ামী লীগের শাহজাহান মিয়া মির্জাগঞ্জে ইয়ারউদ্দিন খলিফার মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে প্রচারণা শুরু করেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘দেশ উন্নয়নের পথে চলছে, আওয়ামী লীগ দেশব্যাপী যে উন্নয়ন করেছে, এ জন্য দেশবাসী আসন্ন সংসদ নির্বাচনে নৌকা মার্কায় তাদের মূল্যবান ভোট প্রদান করে আবারও সংসদে নিয়ে যাবে।’

মুন্সিগঞ্জ-৩ (সদর-গজারিয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুল হাই প্রচার শুরু করেন মিরকাদিমের দরগাবাড়িতে বাবা আদম (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে। দিনব্যাপী তিনি মিরকাদিম পৌরসভা ও রামপাল ইউনিয়নের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় বাড়ি বাড়ি যান।

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত