যেখানে অকার্যকর বিএনপি-জামায়াতের জোট

জহুরুল ইসলাম জহির, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
 | প্রকাশিত : ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৯:১৭
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে মনোনয়ন জমা দিচ্ছেন দুজন প্রার্থী

জোটবদ্ধ তিনটি নির্বাচনে দেশের একটি আসনে জামায়াত ও বিএনপি কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি হয়নি। এটি হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর আসন)। এখানে নৌকা নিয়ে আওয়ামী লীগের আবদুল ওদুদের পাশাপাশি ধানের শীষ নিয়ে লড়বেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হারুনুর রশীদ। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আপেল নিয়ে লড়বেন জামায়াত নেতা নুরুল ইসলাম বুলবুল।

এই আসনে আওয়ামী লীগ বরাবর দুর্বল অবস্থানে থাকলেও ২০০৮ সালে তাদের উত্থান ঘটে। অনেকটা চমকের মতো জিতে যান ওদুদ। এর প্রধান কারণ ছিল বিএনপি এবং জামায়াতের দুজন প্রার্থীরই প্রায় কাছাকাছি ভোট পাওয়া।

১৯৮৬, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেনি আওয়ামী লীগ। প্রথম দুটি নির্বাচনে জেতে জামায়াত। পরের দুবার জয় পায় বিএনপি, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে জামায়াত।

৮৬ সালে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া তিন প্রার্থীর তালিকায় ছিল না বর্তমানের ক্ষমতাসীনরা। তবে ৯১ সালে তৃতীয় হয় আওয়ামী লীগ। ওই বছর বিজয়ী জামায়াত প্রার্থীর চেয়ে নৌকা প্রতীকে ভোট পড়ে অর্ধেক। ৯৬ সালে জয়ী বিএনপির হারুনুর রশীদের চেয়ে অর্ধেক ভোট পেয়ে তৃতীয় হয় আওয়ামী লীগ।

পরের নির্বাচনে বিএনপি এবং জামায়াত জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নেয়। তবে দেশের তিনটি আসনে থেকে যায় দুই দলেরই প্রার্থী। এর একটি ছিল উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলার সদর আসনটি। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আগেরবারের তুলনায় ভালো করলেও অবস্থান ছিল তৃতীয়। সেবার বিজয়ী বিএনপির হারুন পান ৮৫ হাজার ৪৮৯ ভোট। স্বতন্ত্র হিসেবে জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য লতিফুর রহমান ৬০ হাজার ৪৬০ ভোট পান। আওয়ামী লীগের শামসুল হক পান ৫৭ হাজার ২১৯ ভোট।

২০০৮ সালের নির্বাচনেও এই আসনে বিএনপি এবং জামায়াতের প্রার্থী ছিল। তবে জিততে পারেননি কেউ। নৌকা প্রতীক নিয়ে ওদুদ পান এক লাখ ১২ হাজার ৮০২ ভোট। ধানের শীষ নিয়ে হারুনের পক্ষে পড়ে ৭৬ হাজার ৭৮ ভোট। আর দাঁড়িপাল্লা নিয়ে লতিফুর পান ৭২ হাজার ২৯২ ভোট। অর্থাৎ সেখানে বিএনপি এবং জামায়াতের জোট থাকলে তারা অনায়াসে জিততে পারত।

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াত এবার সারা দেশেই আসন কম পেয়েছে বিএনপির কাছে। ২০০৮ সালে যেখানে ৩৫টিতে তারা জোটের প্রার্থী হিসেবে লড়াই করেছে, সেখানে এবার তারা পেয়েছে কেবল ২২টি। সেটি মেনেও নিয়েছে। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ ও পাবনা-১ আসনে ছাড় আদায় করতে না পেরে প্রার্থী দিয়ে রেখেছে তারা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে লড়বেন নুরুল ইসলাম বুলবুল। তিনি জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন এবং সেখানে গত কয়েক বছর ধরেই ভোটের জন্য কাজ করে আসছেন। গত দুটি জোটবদ্ধ নির্বাচনের মতো এবারও সেখানে জামায়াতের এই চ্যালেঞ্জকে মেনে নিয়েছে বিএনপি।

স্থানীয় পর্যায়ে ধারণা ছিল, ১০ বছর ধরে ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে থাকা বিএনপি-জামায়াত হয়তো এবার সেখানে সমঝোতা করতে পারবে। আর এটি হলে এই আসনে জোটের প্রার্থীর জয়ী হওয়া অনেক সহজ হতো। কিন্তু সেটি না হওয়ায় আসনটি পুনরুদ্ধার যে অনিশ্চিত হয়ে গেল, সেটি মানছেন দুই দলের সমর্থকেরাই।

বিএনপির নেতা হারুন ব্যক্তিগতভাবে জামায়াতবিরোধী হিসেবেই পরিচিত। তিনি জোটের শরিকদের বিরুদ্ধে নানা সময় প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়ে থাকেন। তার স্ত্রী সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাকালেই জামায়াতের কট্টর সমালোচক ছিলেন। নিজ এলাকাতেও তিনি স্বাধীনতাবিরোধী দলটির কঠোর সমালোচনা করেন।

বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, এই আসনে জামায়াত কোনো দিন ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে ভোট করেনি আর কখনোই ভোট করবেও না। কেবল জাতীয় নির্বাচনে নয়, স্থানীয় নির্বাচনেও সেখানে এটি সাধারণ চিত্র। কিন্তু এতে জামায়াতের কোনো লাভ হচ্ছে না। বরং তারা ধীরে ধীরে শক্তিহীন হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানা বিএনপির সভাপতি তসিকুল ইসলাম বলেন, ‘সারা দেশে ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে জামায়াত ধানের শীষ নিয়ে ভোটে অংশগ্রহণ করছে। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে স্বতন্ত্র ভোট করছেন জামায়াত নেতা নুরুল ইসলাম বুলবুল। তারা আসলে আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করছে। এই আসনটিতে বিএনপিকে ভোটের যুদ্ধে তাদের কেউ হারাতে পারবেও না। জামায়াতেরও অনেক সমর্থকের ভোট বিএনপি পাবে তাদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে।’

সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম মতি বলেন, ‘১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে জামায়াত একা বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোট করে এই আসন থেকে। কিন্তু জামায়াতের ভোট সব সময় আমাদের চেয়ে কম। আমি মনে করি, জামায়াত ভোটে অংশগ্রহণ করলে বিএনপির কোনো ক্ষতি হবে না।’

জেলা বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম টিপু বলেন, সুষ্ঠু, সুন্দর নিরপেক্ষ ভোট হলে শুধু সদর আসন নয়, জেলার তিনটি আসনেই বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হবেন। এখানে জামায়াত কোনো বিষয়ই নয়।

তবে আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের মতো আবার জয়ের আভাস পাচ্ছে। দলের পৌর কমিটির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, ‘ত্রিমুখী লড়াই আওয়ামী লীগের জন্য শুভ সংবাদ এনে দেবে। আমরা আগের চেয়ে বেশি ব্যবধানে জিতব।’

কেন এমন প্রত্যাশা করছেন, জানতে চাইলে ক্ষমতাসীন দলের এই নেতা বলেন, ‘নতুন প্রজন্ম যুদ্ধাপরাধীদের অনুসারীদের আর ভোট দেবে না। জামায়াত আগে মহিলাদের ভুল বুঝিয়ে ভোট নিত। এখন তা আর পারবে না। কারণ, এখন সবাই বুঝতে পেরেছে। আর নতুন প্রজন্ম ও নারীদের ভোট আওয়ামী লীগ পাবে।’

টিআইবির সহযোগী সংগঠক সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি সাইফুল রেজা বলেন, ‘এই আসনটিতে জামায়াত-বিএনপির মধ্যে একধরনের রশি টানাটানি চলছে। আর এই রশি টানাটানির কারণে একাংশের ভোট আওয়ামী লীগসহ অন্য দলগুলো পাবে। এই আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের শক্ত অবস্থান রয়েছে।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত