ভিকারুননিসার হালচাল-১

অধ্যক্ষ নিয়োগে বাধা কোচিং বাণিজ্য

মহিউদ্দিন মাহী
 | প্রকাশিত : ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৮:৪৬

গত সাত বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে চলছে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ২০১২ সালের পর স্থায়ী কোনো অধ্যক্ষ নিয়োগ দিতে পারেনি স্কুলটির পরিচালনা পর্ষদ। ভর্তি আর কোচিং বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতেই স্কুলটি স্থায়ী অধ্যক্ষ পাচ্ছে না বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সবশেষ পরীক্ষার হলে মোবাইল পাওয়া নিয়ে এক ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় স্কুলটির নানা অনিয়ম প্রকাশ্যে এসেছে।

ভিকারুননিসায় স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগ না হওয়ার পেছনে স্কুল কর্তৃপক্ষ নানা অযুহাত দেখালেও সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এতে বলা হয়েছে, দীর্ঘ দিন ধরে ভিকারুননিসায় পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ও গভর্নিং বডির স্বার্থ উদ্ধারে ভর্তি বাণিজ্য ও কোচিং বাণিজ্যে নিজেদের ক্ষমতা অক্ষুণœ রাখতে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ না দিয়ে তাদের মনোনীত ব্যক্তিকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে বসিয়ে রাখছে।

সর্বশেষ ২০১১ সালে স্কুলটির স্থায়ী অধ্যক্ষ ছিলেন হোসনে আরা। ওই সময় স্কুলটির শিক্ষক পরিমল জয়ধরের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন হোসনে আরা। দায়িত্ব দেয়া হয় মঞ্জু আরাকে। কিন্তু তিনি ছিলেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। তার ধারাবাহিকতায় এরপর যারাই এসেছেন, সবাই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

মঞ্জু আরার তিন বছর দায়িত্ব পালন শেষে দায়িত্ব দেয়া হয় সুফিয়া বেগমকে। তিনিও স্থায়ী হিসেবে নিয়োগ পাননি। দুই বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৭ সালে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পান নাজনীন ফেরদৌস। নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় পদ হারিয়েছেন তিনি। অভিযোগের মুখে হয়েছেন বরখাস্ত। নতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ পেয়েছেন কলেজ শাখার সহকারী অধ্যাপক হাসিনা বেগম।

অরিত্রী আত্মহত্যার ঘটনায় নাজনীনসহ তিন শিক্ষিকার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এদের মধ্যে শ্রেণিশিক্ষক হাসনা হেনা গ্রেপ্তার হয়ে জেলে গেছেন। ছাত্রীদের আন্দোলনের পর তিনি মুক্তি পেয়েছেন। আর সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও প্রভাতী শাখার প্রধান দুইজন আত্মগোপনে।

কেন হচ্ছে না স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগ?

২০১১ সালে শিক্ষকের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় তুমুল আন্দোলনের মুখে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তখন সভাপতি ছিলেন ওই আসনের সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন। একই বছর বিশেষ কমিটি গঠনের পর থেকেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে পরিচালন করা হয় স্কুলটিকে। ছয় বছর স্কুলটি বিশেষ কমিটি দিয়েই চলে। ২০১৭ সালে নির্বাচিত কমিটি পায় ভিকারুননিসা। এই কমিটির বর্তমান সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার। তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর।

আইন অনুযায়ী বিশেষ কমিটি স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগ দিতে পারে না। তারা অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনায় কাজ করে। এ কারণে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ দিয়ে স্বাভাবিক কাজ চালানো হয়। তবে এক্ষেত্রে স্কুলের জ্যেষ্ঠতম শিক্ষককেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করা হয়। ২০১৭ সালে নির্বাচিত কমিটি দায়িত্বে আসার দেড় বছর পার হলেও তারাও স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়নি।

বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর স্কুলটির অনেক সমস্যা ছিল। সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি। বিশেষ করে এখানে ছাত্রী সংখ্যা অনেক বেশি। ক্লাসরুম সংকটসহ আরও বেশ কিছু সমস্যা নিয়ে আমরা কাজ করেছি।’

‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আগামী জানুয়ারি মাসে স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। ইতোমধ্যে অধ্যক্ষ নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে।’

অরিত্রী হত্যাকা- তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের ঢাকা আঞ্চলিক অফিসের পরিচালক অধ্যাপক মো. ইউসুফ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘শিক্ষকরা আইনকানুন না মেনে ইচ্ছামতো চলে। অযোগ্য ব্যক্তিকে প্রতিষ্ঠান প্রধানের চেয়ারে বসিয়ে চলে শিক্ষকদের অন্যায়-অত্যাচার! অরিত্রীর ঘটনায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ তিন শিক্ষক আত্মহত্যার জন্য প্ররোচনা দিয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।’

কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের চাপ!

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগ না দেয়ার পেছনে কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত শিক্ষকরা রয়েছেন। অধ্যক্ষ নিয়োগ পেলে তাদের ক্ষমতা কমে যেতে পারে, এই ধারণা থেকে তারা বিষয়টি ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। যারা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পান তারা কেবল রুটিন কাজ করেন। নীতিনির্ধারণী কিছুই করেন না। কারণ তারা কারো চক্ষুশূল হতে চান না। এ সুযোগে বেড়েছে কোচিং বাণিজ্য।

স্কুলটির পরিচালনা পর্ষদের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা ২০১৭ সাল থেকে নির্বাচিত কমিটি। কিন্ত এখনো স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগ দিতে পারিনি। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এখানে কোচিংবাজ শিক্ষকরা বেশ প্রভাবশালী। তারা টাকা দিয়ে সব ম্যানেজ করে। তাদের কাছে ছাত্রী-অভিভাবকরা সবাই জিমি¥।’

এক অভিভাবক বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মাসোয়ারা পেয়ে থাকেন আমাদের পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নেতারা। তাই তারাও চায় না ভারপ্রাপ্ত বাদ দিতে। এ কারণেই গত সাত বছর ধরে এটি চলে আসছে।’

এ সব বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সব রক্তচক্ষুকে উপক্ষো করে একটা শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করছি। তবে যেসব শিক্ষকরা কোচিং বাণিজ্যে জড়িত, তাদের বিষয়ে বলেছি- যদি কোনো ছাত্রীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে, তারা যেন লিখিত অভিযোগ দেয়। অভিযোগ পেলে আমি ব্যবস্থা নেব। কিন্তু সেরকম অভিযোগ না পাওয়ার কারণে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারিনি।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত