ভিকারুননিসার হালচাল-২

টাকা কামানোর পথ যখন টিসি

মহিউদ্দিন মাহী
 | প্রকাশিত : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৮:৪৩

‘একজন শিক্ষার্থীকে ভর্তি করতে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ন্যূনতম ছয় লাখ টাকা দিতে হয়। সর্বোচ্চ নেয়া হয় ১০ লাখ।’ এই মন্তব্যটি স্কুলটির দশম শ্রেণির এক ছাত্রীর অভিভাবকের।

এই বিষয়টির প্রমাণপত্র না থাকলেও ভিকারুননিসা স্কুলে এসব ঘটনা সবারই জানা।

ভর্তির সময় এমন বাণিজ্য হলেও এটি চলে মূলত ১২ মাস। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ঠুনকো কারণে টিসি (ট্রান্সফার সার্টিফিকেট) দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। অনেককে আবার টিসি দিয়েও দেয়া হয়। আর যাকে টিসি দেয়া হয় সেই খালি আসনে ভর্তিতে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ভর্তি করা হয় কাউকে।

এমন তথ্য উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত প্রতিবেদনেও। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকারা ছাত্রী ও অভিভাবকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে আসছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়। শুধু তাই নয়, ক্ষুদ্র কারণে অকারণে ছাত্রীদের টিসি দিয়ে বের করে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয়। একই কারণে ২০১২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি চৈতি রায় নামে নবম শ্রণির এক ছাত্রী আত্মহত্যা করে।

তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কোনো অসদাচরণের কারণে বাধ্যতামূলক টিসি (ট্রান্সফার সার্টিফিকেট) দেওয়ার কোনো বিধান নেই।

বলা হয়, বিধিবহির্ভূত কোনো কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা স্কুল নিতে পারে তার দিকনির্দেশনা থাকলেও সেখানে টিসির কোনো বিধান নেই। কেবল কোনো অভিভাবক স্বেচ্ছায় সন্তানকে অন্য স্কুলে নিতে চাইলে তিনি টিসি চাইতে পারেন।

তারপরও স্কুলগুলো নানাসময় অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে যে টিসি দেয় তার সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়ও জড়িত বলে অভিযোগ করছেন অভিভাবকরা। তারা বলছেন, একজনকে বিদায় করলে সিট খালি হলে সেই সিটে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে নতুন শিক্ষার্থী নেওয়া যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্কুলের অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানান, ‘কথায় কথায় শিক্ষকরা আমাদের টিসির ভয় দেখান। এভাবে আতঙ্ক নিয়ে কী ক্লাস করা যায়?’

শারমিন সুলতানা নামে এক অভিভাবক জানান, ‘মেয়েরা অসুস্থ থাকলে স্কুলে যেতে পারে না। কিন্তু পরে সুস্থ হয়ে গেলে তাদের ব্যাপক হয়রানি করা হয়। অভিভাবকদের ডেকে টিসি দেয়ার কথা বলা হয়।’ এটা কোন যুক্তিতে তারা বলে, প্রশ্ন তার। তিনি বলেন, ‘এই কারণে আমরা অরিত্রীকে হারালাম।’

তবে টিসির বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক) আব্দুল মান্নান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের টিসি দেওয়ার কোনো বিধান নাই। অন্তত আমার তেমন জানা নেই। বিধিবহির্ভূত কর্মকা-ে কী কী করা যেতে পারে সেসব উল্লেখ আছে। কিন্তু অভিভাবক যদি সন্তানকে অন্য স্কুলে নিয়ে যেতে চান শুধু তাহলে তিনি টিসি চাইতে পারে।’

১৯৩০ সালের ‘এডুকেশন কোডে’ বলা আছে, কোনো শিক্ষার্থী যদি কোনো অন্যায় করে, তাহলে তাকে বহিষ্কার করা যাবে। তবে ওই শিক্ষার্থীকে সংশোধনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। বারবার তাকে কাউন্সেলিং করতে হবে। অভিভাবকদের ডেকে তাদের মাধ্যমে কাউন্সেলিং করতে হবে।

কোচিং বাণিজ্যের অংশ না হলেও শিক্ষার্থীরা টিসির ভয়ে থাকে উল্লেখ করে মাধ্যমিকের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, ‘আমার মেয়েকে স্কুলের শিক্ষকের কোচিংয়ে না দেওয়ার কারণে হয়রানি হতে হয়েছে। শুরুতে আমরা বুঝতে পারিনি, পরে দেখলাম কথায় কথায় তাকে টিসি দিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়, শুধু সেই শিক্ষকের কোচিং এ যায় না বলেই তার ভালো রেজাল্ট হয় না।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে স্কুলটির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘শিক্ষকরা টিসির ভয় দেখান। এমন অভিযোগ আমার কাছে নেই। তবে আমার বলা আছে- কোনো অভিযোগ থাকলে যেন আমাকে লিখিত দেয়। মৌখিকভাবে বললে তো ব্যবস্থা নেয়া যায় না।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত