একটা আসনও যেন না ছোটে: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
| আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:২২ | প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:১৩

জাতীয় নির্বাচনে একটি আসন নিয়েও হেলাফেলা না করতে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, এমনও হতে পারে, একটি আসনের জন্য তিনি সরকার গঠন করতে পারছেন না। আর এমনটি হলে পদ্মা সেতুসহ সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেমে যাবে।

নির্বাচনী জনসভার দ্বিতীয় দিনে বৃহস্পতিবার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থেকে ঢাকায় ফেরার পথে মোট সাতটি পথসভা করেন আওয়ামী লীগের প্রধান। এ সময় তিনি তার সরকারের আমলের উন্নয়ন তৎপরতা তুলে ধরে আগামী দিনের পরিকল্পনাও জানান। বলেন, তার সরকারের ১০ বছরে দেশ অনেক এগিয়েছে, কমেছে দুর্নীতি। আবার ক্ষমতায় ফিরলে অগ্রগতির চাকা এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতি পুরোপুরি দূর করার চেষ্টা করা হবে।

বুধবার ঢাকা থেকে সড়কপথে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় নিজ নির্বাচনী এলাকায় যান শেখ হাসিনা। বিকেলে কোটালীপাড়া উপজেলা সদরে প্রথম নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন।
পরদিন সকালে টুঙ্গিপাড়া থেকে রওনা হয়ে বিভিন্ন স্থানে পথসভা করে করে ঢাকায় ফেরেন তিনি। ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও সদর, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জের দুই এলাকায়, ধামরাই এবং সাভারে জনসভা করেন তিনি।

 

যাত্রাপথে বাজার ও সড়কে অসংখ্য মানুষ নৌকা মার্কার ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড, পোস্টার হাতে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। তারা নৌকা মার্কা ও আওয়ামী লীগের পক্ষে স্লোগান দেন। আর শেখ হাসিনা গাড়ির গতি কমিয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। আর সেখানে কোথাও হাতে মাইক নিয়ে নৌকার পক্ষে ভোট চান।
‘প্রতিটি আসন চাই’

প্রথমে শেখ হাসিনার পথসভা হয় ভাঙ্গার মালিগ্রাম স্কুলমাঠে। সেখানে তিনি পরিচয় করিয়ে দেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী কাজী জাফরুল্লাহকে।

এই আসনে আওয়ামী লীগের একজন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। তার নাম উল্লেখ না করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নির্বাচনের সময় অনেক কিছু প্রলোভন দেখাতে পারে। অনেক কথা বলতে পারে। কিন্তু কোনো সন্ত্রাসী, জঙ্গিবাদী বা মাদক ব্যবসায়ীরা যেন আপনাদের ভোট ছিনতাই করতে না পারে, সে জন্য সবাই সতর্ক থাকবেন।’

‘সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে ভোটকেন্দ্র পাহারা দেবেন। আপনার ভোট আপনি দেবেন, নৌকায় মার্কায় ভোট দেবেন। সবাই মনে রাখবেন, একটি ভোট ও একটি আসনও আমাদের কাছে অনেক মূল্যবান। একটি আসনের কারণেও হয়তো সরকার গঠন করা সম্ভব না-ও হতে পারে। সে কারণে যেখানে যাকে নৌকার প্রার্থী করেছি, তাদের ভোট দিয়ে আমাদের সরকার গঠন করতে সহায়তা করুন।’

পদ্মা সেতুর বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘কোনো কারণে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে না পারলে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই আমি দেশবাসীর কাছে প্রত্যাশা করি, গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনে সবাই নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখবেন।’
‘দুর্নীতির লাগাম টেনেছি’

এরপর প্রধানমন্ত্রী পথসভা করেন ফরিদপুরের কমরপুরে। সেখানে তিনি ফরিদপুর-৩ আসনের প্রার্থী এলজিআরডিমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

এই জনসভায় শেখ হাসিনা বিএনপি-জামায়াতের আমলের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন। বলেন, ‘এরা ক্ষমতায় থাকতে দেশকে পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করেছে, এতিমের টাকা আত্মসাৎ পর্যন্ত করেছে। এ কারণে বিএনপির নেত্রী দ-িত হয়ে এখন কারাগারে।’

‘২০০১ থেকে ২০০৬’ বাংলাদেশ পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। সে সময় ক্ষমতায় থাকা বিএনপি-জামায়াত দুর্নীতিকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিল।...২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে দুর্নীতি কমিয়ে এনেছে।’

‘আজকে বাংলাদেশে দুর্নীতি কমে গেছে এবং সেই স্বীকৃতি আমরা পেয়েছি। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়া আগামী দিনের লক্ষ্য।’
‘বিএনপি-জামায়াত জোটের মন্ত্রীরা, এমপিরা ক্ষমতায় ছিল। তারা মানুষজনের উন্নয়ন করেনি। তারা লুটপাটে ব্যস্ত ছিল, দুর্নীতিতে ব্যস্ত ছিল। মানুষ খুন করতে ব্যস্ত ছিল। তারা জানে খুন করতে, তারা জানে মানুষ হত্যা করতে, তারা জানে লুটপাট।’

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এতিমের সম্পদ কেড়ে নিলে কোরআন শরিফেও লেখা আছে তাকে শাস্তি পেতে হবে। আর সেই বিএনপির নেত্রী এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করে আজকে কারাগারে। এতিমখানার টাকা যদি কেউ মেরে দেয়, তার জন্য মামলা করে শাস্তি পায়, তার থেকে লজ্জা, ঘৃণা আর কী আছে?’ আরেকবার ক্ষমতায় এলে ফরিদপুরকে বিভাগ করার ঘোষণাও দেন প্রধানমন্ত্রী।

বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক, বাহাউদ্দিন নাছিম, আহম্মেদ হোসেন, যুবলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত সিকদার, কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আরিফুর রহমান দোলন, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহা, জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক এ এইচ এম ফোয়াদ প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
‘পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু’

ফরিদপুরে জনসভা শেষে প্রধানমন্ত্রী যান রাজবাড়ীতে। দুপুরে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাট ট্রাক টার্মিনালে এক পথসভায় বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা-ের বিবরণ দিয়ে নৌকায় ভোট চান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ এখন আর দুর্বল নয়। আমরা নিজের টাকায় পদ্মা সেতু তৈরি করছি। প্রথম পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হলে আমরা আবার ক্ষমতায় এলে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া দ্বিতীয় পদ্মা সেতু হবে।’

‘এবার যদি আমরা ক্ষমতায় আসি, তাহলে প্রতিটি গ্রাম হবে শহর। গ্রামেই মিলবে শহরের নাগরিক সুবিধা। নাগরিক সুবিধার জন্য গ্রামের মানুষকে যাতে শহরে না যেতে হয়।’
‘আমি রাজনীতি করি মানুষের জন্য। আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। গত ১০ বছরে দেশে যে উন্নয়ন কর্মকা- হয়েছে, সেটার বিচার আপনারা করবেন। আর এই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা যদি বজায় রাখতে চান, তাহলে নৌকায় ভোট দেবেন আর নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ী করবেন।’

এ সময় রাজবাড়ী-১ আসনের কাজী কেরামত আলী ও রাজবাড়ী-২ আসনের প্রার্থী জিল্লুল হাকিমকে পরিচয় করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী।

উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সরকারের ধারাবাহিকতাও জরুরি বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘আগামীতে ক্ষমতায় এলে দেশের একটি মানুষের ঘরও অন্ধকার থাকবে না, কোনো মানুষ গৃহহীন থাকবে না। এ জন্য আরেকটিবার দরকার আওয়ামী লীগ সরকার।’
‘নৌকা মানেই স্বাধীনতা, উন্নয়ন’

ফরিদপুরের জনসভা শেষে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাট এবং মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে দুটি পথসভায় বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, নৌকা মার্কা মানেই স্বাধীনতা, নৌকা মার্কা মানেই উন্নয়ন। তাই ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সারা দেশে নৌকাকে বিজয়ী করে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার আহ্বান জানান তিনি।

বক্তব্যের শুরুতে গত ১০ বছরে তার সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা- তুলে ধরেন। মানিকগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ এম নাঈমুর রহমান দুর্জয়, মানিকগঞ্জ-২ আসনে মমতাজ বেগম ও মানিকগঞ্জ-৩ আসনে জাহিদ মালেক স্বপনের পক্ষে ভোট চান তিনি।

বলেন, ‘মানিকগঞ্জে অনেক মানিক আছে। আমরা কিছু মানিক কুড়িয়ে এনেছি। নাঈমুর রহমান দুর্জয় ক্রিকেটের একটি মানিক। তিনি আপনাদের এমপি। মমতাজ বেগম আরেকজন মানিক। তিনি গানের শিল্পী। তাদের দুজনকে নৌকা মার্কার প্রার্থী করেছি। তাদের বিজয়ী করুন।’

আবার ক্ষমতায় এলে মানিকগঞ্জে একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম নির্মাণেরও ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, গত ১০ বছরে মানিকগঞ্জে যে উন্নয়ন হয়েছে, বিগত দিনের কোনো সরকার তা করতে পারেনি।

এরপর শেখ হাসিনা ঢাকার ধামরাইয়ে হার্ডিঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পথসভায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী বেনজীর আহমেদকে পরিচয় করিয়ে তাকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
‘আমার রাজনীতি শ্রমজীবীদের জন্য’

সাভারের পথসভায় প্রধানমন্ত্রী এই আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী এনামুর রহমানকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তার জন্য ভোট চান। বলেন, রানা প্লাজা ধসের সময় হতাহতদের সহযোগিতা করায় আওয়ামী লীগ সাভার থেকে ডাক্তার এনামকে প্রার্থী করেছে।

বঙ্গবন্ধু-কন্যা জানান, তিনি বিত্তশালী নন, খেটে খাওয়া মানুষের জন্য কাজ করেন। বলেন, ‘কৃষক, জেলে, কামার-কুমার, এসব শ্রমজীবী মানুষের জন্য আমি কাজ করি।’
‘আওয়ামী লীগ মানুষের সেবা করে, জনগণের সেবা করে, মানুষের কল্যাণে কাজ করে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হয়। মানুষ সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে।’

ঢাকাটাইমস/১৩ডিসেম্বর/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :