পাবনা-১

শেষমেশ সাইয়িদ-জামায়াতে ‘বন্ধুত্ব’

খাইরুল ইসলাম বাসিদ, পাবনা
| আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৭:৫১ | প্রকাশিত : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৭:৪৬

ভোট আর জোটের রাজনীতির কারণে অভাবনীয় আরেকটি ঘটনা ঘটেছে পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসনে। স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াতের সমর্থন নিয়েই ভোট করছেন এত দিন জামায়াতের কট্টরবিরোধী হিসেবে পরিচিত আবু সাইয়িদ।

ছয় দশকের রাজনৈতিক জীবনে জামায়াতের বিরুদ্ধে বারবার বলেছেন সাইয়িদ। যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াত নেতাদের বিচারের দাবিতে ছিলেন সোচ্চার। মানবতাবিরোধী অপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে অংশ নিয়েছেন তিনটি নির্বাচনে।

সাইয়িদের প্রতিদ্বন্দ্বী এখানে নৌকা প্রতীকের শামসুল হক টুকু। এই দুজন ২০১৪ সালেও প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। সে বছর নৌকা না পেয়ে সাইয়িদ প্রার্থী হয়েছিলেন স্বতন্ত্র হিসেবে। এর আগে ১৯৭৩ এবং ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনি লড়েন নৌকা নিয়ে। এর শেষ তিনটি নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন নিজামী।

আওয়ামী লীগের সমর্থন না পেয়ে সাইয়িদ এবার যোগ দিয়েছেন ঐক্যফ্রন্টে বিএনপির শরিক গণফোরামে। আর ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে পাবনা-১ আসনে তাকেই বেছে নিয়েছে জোট।

এই আসনে নিজামীপুত্র নাজিবুর রহমান মোমেনও জোটের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তবে বিএনপি তার বদলে সাইয়িদকে বেছে নেয়। আর মোমেনের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না হওয়ায় প্রার্থী থেকে যান তিনিও। সে সময় ধারণা করা হচ্ছিল, ‘শত্রু’ সাইয়িদকে বুঝি ছাড় দেয়নি জামায়াত। তবে ভোটের প্রচার শুরুর পর থেকে জামায়াতের স্থানীয় কর্মীরা ভোট করছেন সাইয়িদের পক্ষেই।

তাহলে কেন জামায়াতের প্রার্থী রয়েছে, সেই প্রশ্নের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন দলটির নেতারা। জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথম দিকে পাবনা-১ আসনে জামায়াতের দুজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র তুললেও শেষ পর্যন্ত জামায়াত নেতা আব্দুল বাসেত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। অপর প্রার্থী মতিউর রহমান নিজামীর পুত্র নাজিবুর রহমান মোমেন মনোনয়নপত্র তুলতে পারেননি। কারণ, মনোনয়ন তুলতে গিয়ে চার জামায়াত নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন।’

‘তবে এখানে আমাদের দলীয় কোনো প্রার্থী আসলে নেই। নেতাকর্মীদের সবাইকে ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছি। তারা সেই হিসেবেই মাঠে কাজ করছেন। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ধানের শীষের প্রার্থীই বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হবেন।’

স্বাধীনতাবিরোধী দলের সমর্থন কেমন উপভোগ করছেনÑএমন প্রশ্নে আবু সাইয়িদ বলেন, ‘রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে কখনো কখনো রাজনীতিবিদদের বর্তমান অবস্থার কথা চিন্তা করে কৌশলগত কারণে জোটে যেতে হয়। জোটবদ্ধ হতে হয়।’

এত দিনের রাজনৈতিক বিশ্বাস একটি ভোটের কারণেই ত্যাগ করলেন?Ñএমন প্রশ্নে সাইয়িদ বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার চেতনা মূল্যবোধ, যার মধ্য থেকে রাজনৈতিকভাবে বড় হয়েছি। আমার জীবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, তার রাষ্ট্রচিন্তা, ভাবনা, দর্শনই মুখ্য। রাজনীতি, গণতন্ত্র এবং শোষণমুক্ত সমাজের সবগুলোই আমি ধারণ করি, লালন করি এবং সেটিই জনগণের মধ্যে প্রসারিত করে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার সর্বদা চেষ্টা করছি।’

‘এই এলাকার মানুষের অভিভাবক হিসেবে আমাকে প্রয়োজন ছিল। কারণ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এত দীর্ঘদিন কেউ বিচরণ করেনি এই এলাকায়। আমি সব মানুষের সব দলের, প্রতিটি মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ধারণ করে এসেছি। অত্যাচার, অনাচার এবং মিথ্যাচার, ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত, প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাব।’

‘এই এলাকায় সব দলের সঙ্গে সব সময় সুসম্পর্ক থেকেছে। সেই সুসম্পর্ক নিয়েই প্রতিটি মানুষের সমঅধিকার এবং গণতন্ত্রের অধিকার অর্জন করা আমার জীবনে শেষ মুহূর্তে এসে এক চালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই চ্যালেঞ্জ আমি গ্রহণ করেছি এবং সেই চ্যালেঞ্জে জনগণ বিজয়ী হবে।’

সাঁথিয়া পৌরসভার মেয়র আওয়ামী লীগের নেতা মিরাজুল ইসলাম অবশ্য মনে করেন, সাইয়িদ জামায়াতকে পাশে নিয়ে রাজনীতিতে এত দিনের অর্জন হারিয়েছেন। ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনাকে নিয়ে অনেক বই লিখেছেন। যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধেও সব সময় সোচ্চার ছিলেন তিনি। আজ বিএনপি-জামায়াতের কাছে কোন মুখ নিয়ে ভোট চাইছেন তিনি?’

সাইয়িদের প্রতিদ্বন্দ্বী শামসুল হক টুকু বলেন, ‘তিনি একজন দলছুট মানুষ। জনগণের কাছে তার এবার আসল চেহারা উন্মোচিত হয়েছে। দীর্ঘদিন তিনি জামায়াত-বিএনপির বিপক্ষে থেকে কথা বললেও এবার তিনি হয়তো মতিউর রহমান নিজামীর কবর জিয়ারত করতেও যেতে পারেন।’

সাইয়িদের আওয়ামী লীগে অবস্থান হারানোর কারণ সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের ভূমিকা। ওই বছর প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে সংস্কারের ধোয়া তুলে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যারা দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের মধ্যে সাইয়িদও ছিলেন। আর এ কারণে ২০০৮ সালে মনোনয়ন পাননি তিনি। দল থেকে বহিষ্কারও হন। ওই বছর নৌকার মাঝি হয়ে নিজামীকে প্রায় ২২ হাজার ভোটের হারান তিনি।

এই আসনটি থেকে নির্বাচিত হয়ে নানা সময় মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন আবু সাইয়িদ (তথ্য প্রতিমন্ত্রী), মনজুর কাদের (পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী), মতিউর রহমান নিজামী (প্রথমে কৃষি ও পরে শিল্পমন্ত্রী) এবং শামসুল হক টুকু (স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী)। এ কারণে স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে এই আসনটি নিয়ে আলাদা আলোচনা আছে।

সাঁথিয়ার একটি পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়ন এবং বেড়ার একটি পৌরসভা ও চারটি ইউনিয়ন মিলে এই আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৮১ হাজার ১১৬ জন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত