আপনার মূল্যবান ভোট, বাংলাদেশের পক্ষে হোক

প্রভাষ আমিন
 | প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ১১:১৫

অনেকদিন ধরে আমি একটা স্বপ্ন লালন করি; বাংলাদেশের প্রধান দুই দল মানে সরকারি দল ও বিরোধী দলসহ সব দল হবে স্বাধীনতার পক্ষের। জনগণ দুই পক্ষ থেকে ভালো দলকে বেছে নেবে। ভোট দেয়ার সময় যেন মানুষকে স্বাধীনতার বিপক্ষের কোনো দলকে ভোট দিতে বাধ্য হওয়ার মতো কোনো বিভ্রান্তিতে পড়তে না হয়। আর দেশের স্বাধীনতায় যারা বিশ্বাস করে না, মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা বিরোধিতা করেছে; তাদের আসলে রাজনীতি করারই অধিকার থাকা উচিত নয়।

কিন্তু বাংলাদেশে তারা শুধু রাজনীতি করছেনই না; রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধীরা গাড়িতে পতাকা লাগিয়ে ঘুরে বেড়াবে; যেকোনো দেশের জন্যই সেটা লজ্জার। আমাদের বছরের পর বছর সে লজ্জা সইতে হয়েছে। স্বাধীনতার চার দশক পর একাত্তরে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল, তাদের বিচার হচ্ছে। কিন্তু যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদেরও অধিকার সীমিত করার সময় এসেছে। কারণ স্বাধীনতাবিরোধীরা কখনো তাদের ভুল বা অপরাধ স্বীকার করেনি, বাংলাদেশের প্রতি তাদের ভালোবাসা প্রকাশ করেনি। বরং বাংলাদেশে বসে বসে তারা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। আবার পক্ষ-বিপক্ষের ভারসাম্যের সুযোগে এরা ক্ষমতার কাছাকাছিও পৌঁছে যায়। সুযোগ পায় বাংলাদেশকে আরো পিছিয়ে নেয়ার।

শুরুতে যে স্বপ্নের কথা বলছিলাম, তা পূরণের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই দেশ স্বাধীন হয়েছে। এখনও তারাই বাংলাদেশে স্বাধীনতার পক্ষের নেতৃত্ব দেয়। এটা খুবই দুঃখজনক, স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি বলেও একটা পক্ষ আছে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ নির্বাচন এলে একটা সমস্যায় পড়েন।

স্বাধীনতার পক্ষে হলেই তো আর কারো সাত খুন মাফ হয়ে যায় না। আওয়ামী লীগও তো ধোয়া তুলসীপাতা নয়। টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকা দলটির নানা কর্মকাণ্ডে বিরক্ত অনেকে। কিন্তু বিরক্ত হলেও নির্বাচনের সময় এলে এই বিরক্ত অংশটি বিপাকে পড়ে যান। আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে চান না, আবার বিপক্ষে ভোট দিলে যুদ্ধাপরাধী কারো গাড়িতে পতাকা ওড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই তারা শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগকেই ভোট দেন। এটা এক ধরনের ব্ল্যাকমেইলিং, আদর্শিক ব্ল্যাকমেইলিং। এটা আওয়ামী লীগও জানে। তাই তারা অনেক নির্ভার থাকে।

স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির তো যাওয়ার জায়গা নেই। কিন্তু যদি আমার স্বপ্ন সত্যি হয়, যদি বাংলাদেশের সরকারি ও বিরোধী দল স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হয়, তাহলে মানুষ নিশ্চিন্তে, স্বাধীনভাবে স্বাধীনতার পক্ষের মানুষকে ভোট দিতে পারবে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের গঠন প্রক্রিয়ায় তেমন একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। ঐক্যফ্রন্ট নেতারা শুরু থেকে বলছিলেন, তারা স্বাধীনতাবিরোধী কারো সঙ্গে জোট করবেন না। ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের কেউ কেউ ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলছিলেন। এটাও আমার স্বপ্ন ছিল। একাত্তরের রণাঙ্গনের স্লোগান ‘জয় বাংলা’ হবে সব দলের। বঙ্গবন্ধু হবেন সবার শ্রদ্ধার, সত্যিকারের জাতির জনক।

আশা করেছিলাম বিএনপি জামায়াতকে ছেড়ে ঐক্যফ্রন্টে যুক্ত হবে। মহাজোট ও ঐক্যফ্রন্ট হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। কিন্তু বিএনপি জামায়াতকে ছাড়েনি। জামায়াতের ২২ জন ধানের শীষ পেয়েছে, ঐক্যফ্রন্টের ১৯ জনও একই প্রতীকে লড়বেন। তাই আবার স্বপ্নটা আরো দীর্ঘায়িত হলো। বিজয়ের মাসে তাই ভোটারদের সামনে আবারও প্রশ্ন- স্বাধীনতার পক্ষ না বিপক্ষ?

ভোট একজন মানুষের অধিকার আদায়ের, প্রতিনিধি হিসেবে ভালো মানুষ বেছে নেয়ার অস্ত্র। ভোট আপনার মূল্যবান সম্পদ। মহাজোট বা ঐক্যফ্রন্ট তো নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। কিন্তু দল বা জোট পছন্দ হলেও প্রার্থী আপনার পছন্দ নাও হতে পারে। আপনি বিবেচনা করবেন, যাকে ভোট দিচ্ছেন, তিনি ভালো লোক কি না, সৎ কি না, স্বাধীনতার পক্ষে কি না, শেষ কথা তিনি বাংলাদেশের পক্ষে কি না।

যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতের নিবন্ধন নেই। তারা বিলীন হয়ে গেছে বিএনপিতে। কিন্তু আপনাদের দায়িত্ব খুঁজে খুঁজে স্বাধীনতাবিরোধীদের বয়কট করা। বিএনপি থেকেও স্বাধীনতাবিরোধী বা জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষক অনেকে মনোনয়ন পেয়েছেন। আপনি নিশ্চয়ই জেনেশুনে সাঈদীর ছেলে বা নিজামীর ছেলেকে ভোট দেবেন না। জঙ্গি পৃষ্ঠপোষক ব্যারিস্টার আমিনুল হক, নাদিম মোস্তফা, আলমগীর কবিররা এমপি হলে তো আবার জঙ্গিবাদ উসকানি পাবে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় ফাঁসির দণ্ড পাওয়া লুৎফুজ্জামান বাবরের স্ত্রী কি আপনার ভোট পাবেন?

ঐক্যফ্রন্টের মতো মহাজোটের প্রার্থী তালিকায়ও নানা ভেজাল আছে। বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) মান্নান এবার নৌকা মার্কায় লড়ছেন। তার বিরুদ্ধে একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিপক্ষে যুদ্ধ করার অভিযোগ উঠেছে। স্বাধীনতাবিরোধীর সন্তান শওকত হাচানুর রহমান, জামায়াত থেকে আসা নদভী, খুনের মামলায় কারাগারে থাকা আমানুর রহমান খান রানার বাবা, ইয়াবা চোরাচালানে অভিযুক্ত বদির স্ত্রীও মনোনয়ন পেয়েছেন। এখন আপনার বেছে নেয়ার দায়িত্ব। আপনার ভোট যেন স্বাধীনতাবিরোধী কেউ না পায়, জঙ্গির পৃষ্ঠপোষক যেন না পায়, কোনো সন্ত্রাসী যেন না পায়, ঋণখেলাপি যেন না পায়, সন্ত্রাসীর আত্মীয় যেন না পায়, মাদক চোরাচালানি যেন না পায়।

আপনার মূল্যবান ভোট যেন বাংলাদেশের পক্ষে হয়। এই হোক বিজয় দিবসের অঙ্গীকার।

প্রভাষ আমিন: বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত