গণহত্যার সাক্ষী রেনু মিয়া

‘কত মানুষরে যে জানাজা ছাড়াই মাটিচাপা দিছি’

কাজী রফিক
 | প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ১১:৫২

গুলশান শুটিং ক্লাব জায়গাটি ১৯৭১ সালে ছিল পাকিস্তানিদের নির্যাতনকেন্দ্র। নিজের চোখে দেখেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মী মোকলেস রেনু মিয়া। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন নিজেও। সাক্ষী হত্যাযজ্ঞের।

কখনো সংবাদকর্মীরা তাকে এমন প্রশ্ন করেননি। প্রথমবারের মতো নিজের ভেতরে জমা কথাগুলো বলতে পেরেছেন ঢাকা টাইমসকে। বলেছেন, ‘নিজেকে এহন অনেকটা হালকা লাগল।’

রাজধানীর গাবতলী সুইপার কলোনিতে বসবাস। তবে একাত্তরের দিনগুলো কেটেছে রাজধানীর বাড্ডা এলাকায়। ছিলেন রাখাল। গরু-ছাগল চড়াতেন। তাই নির্যাতনের হাত থেকে অনেকটাই রেহাই পেয়েছেন।

তবে সবার ভাগ্য তার মতো ভালো ছিল না। চোখের সামনে নির্মম মৃত্যু দেখেছেন হাজারো মানুষের। হত্যার জন্য একদিন তাকেও নিয়ে যাওয়া হয় গুলশান শুটিং ক্লাবে। হাত পেছনে বেঁধে তার মতো আরও কয়েক শ মানুষকে লাইনে দাঁড় করা হয়। কিন্তু বেঁচে যান অলৌকিকভাবে।

রেনু মিয়া জানান, পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের আর্তনাদ শুনে একটি গাড়ি শুটিং ক্লাবে ঢোকে। সেটি ছিল কোনো এক বিদেশি সাংবাদিকদের। নেতৃত্বে ছিলেন একজন নারী সাংবাদিক। তিনিও বিদেশি। তারা দেখতে পান, শত শত বাঙালিকে পেছনে হাত বেঁধে রাখা হয়েছে।

ওই নারী সাংবাদিক যোগাযোগ করেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পর কর্তৃপক্ষ ক্লাবে দায়িত্বরত পাকিস্তানি সৈন্যদের বলেন আটকদের মুক্তি দিতে।

সেই সাংবাদিকদের কারণে আরও ৪৭টি বছর বেঁচে আছেন রেনু মিয়া। জানেন না তারা কারা। মনের ভেতর আছে শ্রদ্ধা।

রেনু মিয়া দুই হাত দেখিয়ে বলেন, ‘নিজের হাতে গর্ত কইরা নিজের দেশের মানুষরে জানাজা ছাড়াই মাটিচাপা দিছি।’

রামপুরা-বাড্ডা এলাকাজুড়ে সেই সময় পাকিস্তানিদের রাজত্ব ছিল। বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষকে ধরে এনে এখানে হত্যা করা হতো। আবার স্থানীয়দের দিয়েই গর্ত খুঁড়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

গর্ত খুঁড়তে হয়েছে রেনু মিয়াকেও। নিজের চোখে দেখেছেন একসাথে দুই শতাধিক মানুষের হত্যা। জানান, প্রথমে বেয়নেট দিয়ে পিঠে আঘাত করে একে একে গুলি করে হত্যা করা হয় সবাইকে।

‘মানুষগুলোকে মাটিচাপা দেওয়া বা দাফন-কাফন কিছুই হয় নাই। কুকুর-শিয়ালে খাইছে লাশগুলানকে।’

রামপুরা ব্রিজের পাশে বর্তমানে যেখানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, সেখানে পাঁচ শতাধিক মানুষকে হত্যার ঘটনাও দেখেছেন রেনু। একের পর এক গুলি করে ফেলে দেওয়া হয় ডোবার পানিতে। সেখানেই মরদেহগুলো গলে পচে যায়।

মর্মান্তিক আরও অনেক ঘটনার কথা জানিয়েছেন এই মানুষটি। জানান, মুরগি ধরে দিতে না পারার কারণে তার পিঠেও ২৫ থেকে ৩০ বার চাবুক মারা হয়েছে।

রেনু মিয়া বলেন, ‘কী না করছে? মুরগি ধইরা দিতে না পারায় চাবুক দিয়া মারছে। রাস্তায় হাঁটতে দেখছে, লাথি মারছে।’

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও জিয়াউর রহমানের সেনাশাসনের সময় নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছেন। কারণ, তার ঘরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর একই ফ্রেমে বন্দি একটি ছবি ছিল।

‘দেশ স্বাধীন হইছে। আমি তার একটা ছবি আমার কাছে যতœ কইরা রাখছিলাম। তাও রাখতে দেয় নাই। বাড্ডার আব্দুল আলীর পোলা ছবিডা নিয়া গেছে। আমি দিতে চাই নাই। আমারে মারছে।’

নিজের ডান হাতের কাটা দাগটি দেখিয়ে নির্যাতনের সেই চিহ্নও দেখালেন কালের সাক্ষী রেনু মিয়া।

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত