১৩ বছরের কিশোর যখন বীর প্রতীক

সৈয়দ ঋয়াদ
| আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৩:৫২ | প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ১২:০১

বয়স ১২ কি ১৩। খেলে বেড়ানোর বয়স। কিন্তু ডাক এসেছে দেশের জন্য। বসে থাকার উপায় নেই। সিদ্ধান্ত নিলেন অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার। কিন্তু এতটুকু ছেলের হাতে কি আর অস্ত্র দেওয়া যায়? কিন্তু তিনি যে নাছোড়বান্দা। তার জেদের কাছে হার মানতে হলো। এরপর হয়ে গেল অভাবনীয় ইতিহাস।

যুদ্ধের ময়দানে এই কিশোর ছেলেটি এতটাই বীরের ভূমিকায় ছিলেন যে শ্রদ্ধায় নুয়ে পড়তে হয়েছে রাষ্ট্রকে। সারা দেশে যে ৪২৬ জন বীর প্রতীক উপাধি পেয়েছেন, তাদেরই একজন তিনি। তার নাম আবু সালেক। বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায়। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েন। এর মধ্যে আক্রমণ শুরু হলো পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের। চলছে গণহত্যা। ভুক্তভোগীদের মধ্যে আছেন সালেকের বাবা আবুল হাসেম। সঙ্গে নেওয়া হলো চাচা আবদুল খালেক, গোলাম মওলা, চাচাতো ভাইসহ ৩৭ জনকে। নেওয়া হলো গঙ্গাসাগর দিঘির পাড়ে। মোবারক রাজাকারের নির্দেশে হত্যা করা হলো সবাইকে।

আবু সালেক দেশের সীমানা পেরিয়ে চলে যান ভারতের আগরতলায়। সেখানে চলছিল রণপ্রস্তুতি। প্রশিক্ষণ নিতে দাঁড়ান লাইনে। কিন্তু এমন কিশোরকে কে যুদ্ধে নেবে? তাই প্রাথমিক বাছাইয়েই বাদ পড়ে গেলেন।কিন্তু তার ভেতরে যে আগুন জ্বলছে, যুদ্ধে যেতেই হবে, শুরু করলেন কান্না। বুঝিয়ে-শুনিয়ে কিছুতেই শান্ত করতে পারছিলেন না বড়রা। এতেই ভেতরের বারুদটা বুঝে যান সবাই। রাজি হলেন প্রশিক্ষণ দিতে। আগরতলায় ত্রিপুরা কংগ্রেস ভবনে নাম তোলার পর নেওয়া হলো মেলাঘর ক্যাম্পে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ফোর বেঙ্গলের একটি কোম্পানিতে ঠাঁই হলো। চলল কঠোর প্রশিক্ষণ। সব পরীক্ষায় উতরে অস্ত্র চালনা শিখে ফিরলেন সেই কসবায়। সফল অভিযান শেষে ফিরলেন আবার আগরতলায়।

১০ দিন পর চন্দ্রপুর গ্রামে হয় দ্বিতীয় যুদ্ধ। সেখানে সালেকের কারণেই প্রাণে বেঁচে যান সহযোদ্ধারা। মধ্যরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর তুমুল গোলাগুলিতে বিপাকে পড়েন মুক্তিযোদ্ধারা। পিছু হটা ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু সেখানে একজনকে যে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ‘ব্যাকআপ’ দিতে হয়। ফলে তিনি থাকেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।

অবলীলায় সেই দায়িত্বটা পালন করতে রাজি হয়ে গেলেন সালেক। ছোট কাঁধে পাহাড়সম দায়িত্ব নিয়ে অনবরত গুলি ছুড়তে লাগলেন। আর সহযোদ্ধারা নিরাপদে পশ্চাদপসরণ করলেন। সহযোদ্ধাদের বর্ণনামতে, সালেক এত গুলি ছুড়ছিলেন যে পাকিস্তানিরা ভাবছিল, সেখানে মুক্তিবাহিনীর জোরালো অবস্থান রয়েছে। তারা আর এগোয়নি।

রাত পার হয়, ভোর হয়। থেমে যায় দুই পক্ষের গোলাগুলি। মুক্তিযোদ্ধারা ভাবলেন, সালেকের বুঝি কিছু হয়েছে। বাঙ্কারে গিয়ে দেখেন সালেক ঠায় বসে অস্ত্র হাতে। মুক্তিযোদ্ধারা শ্রদ্ধায় তাকে সেখানেই দেন স্যালুট। এরপর অন্য একটি অপারেশনে গিয়ে বুলেট ও মর্টারের শেলবিদ্ধ হন সালেক। ছড়িয়ে পড়ে তার মৃত্যুর খবর। তিনি কোথায় আছেন, সেই তথ্যও ছিল না। আসলে তিনি ছিলেন ভারতের একটি হাসপাতালে। যুদ্ধ শেষে মার্চে দেশে ফেরেন। স্বাধীনতার পর সালেককে দেওয়া হয় বীরের খেতাব। তার বয়সী আর কেউ এই সম্মান পাননি। বিজয় দিবসের আগে ঢাকা টাইমসের মুখোমুখি হয়েছেন আবু সালেক। কথা বলেছেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টি নিয়ে।

এই বয়সে যুদ্ধে গেলেন?

আমাদের বাড়ি আখাউড়ার টান মান্দাইল গ্রামে। আমি পড়ি কসবা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণিতে উঠেছি (প্রমোটেড)। তখন সম্ভবত আমার বয়স বারো কি তেরো। রাজনৈতিক কারণে দেশ উত্তাল। সে কারণে কসবা থেকে আখাউড়ায় চলে আসি। আমরা তো অত কিছু বুঝি না। তবে চারদিকে আলোচনা হচ্ছে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ অনিবার্য। ৭ মার্চের ভাষণের পর এই যুদ্ধ আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে গেল। আমি বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করতাম যুদ্ধ লেগে গেলে আমরাও যুদ্ধে যাব। মনস্থির করেছি।

যুদ্ধ নিয়ে এত কিছু ভাবতেন ওই বয়সে?

আমি সব যে বুঝতাম, তা তো নয়। তবে এই বিষয়গুলো আমার সঙ্গে আলোচনা করতেন হামিদুল হক। তিনি সম্পর্কে আমার চাচা হন। তিনি আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন যুদ্ধে যেতে। ৭ মার্চের ভাষণ তো আমাদের আলোড়িত করেছে। হামিদুল চাচা বলতেন এখানে থাকলে পাকিস্তানিদের কাজ করতে হবে। পাকিস্তানিরা বাড়িতে বাড়িতে হানা দেয়। ছেলেপিলে থাকলে এদের ধরে নিয়ে মেরে ফেলবে, তা না হলে তাদের দিয়ে ক্যাম্পে কাজ করাবে। তাই নিয়ত পাকা যে যুদ্ধে যাবই।

বাড়ি থেকে অনুমতি পেয়েছিলেন?

তত দিনে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আব্বা-আম্মাকে বললাম যুদ্ধে যাব। কেউ রাজি হলেন না। আমার যুদ্ধে যাবার মতো বয়স হয়নি বলে তাড়িয়ে দিয়েছেন প্রতিবারই। আমি যেহেতু যাব বলে ঠিক করেছি। তাই তক্কে তক্কে ছিলাম কীভাবে যাওয়া যায়। এদিকে যুদ্ধ শুরু হয়েছে এক মাসের বেশি সময় হলো। বাড়িতে বেশ অসুবিধা মনে হচ্ছিল। ভালো লাগছিল না কিছুই।

আপনি যুদ্ধে যোগ দিলেন কখন?

৩০ এপ্রিল রাতে হামিদুল হক চাচার সঙ্গে আগরতলা সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে যাই। দেখলাম, বলে যেহেতু কাজ হচ্ছে না, তাই এই পথ বেছে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিল না। আগরতলায় পৌঁছে বাড়িতে খবর পাঠিয়েছি, আমি যুদ্ধে চলে এসেছি। বাড়িতে আব্বা-আম্মা অনেক চিন্তা করেছে। কিন্তু কেউ আর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।

সেখানে গিয়ে কোনো অসুবিধা হয়নি?

অসুবিধা তো হয়েছে আগরতলাতেই। কারণ, ভারত আর বাংলাদেশি সেনারা মিলে কংগ্রেস ভবনে মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুট করত। কিন্তু সেনা কর্মকর্তারা কোনোভাবেই আমাকে নেবে না। কারণ, আমি নাকি খুব ছোট। আর আমাকে দিয়ে কোনো কাজই নাকি করানো যাবে না। এরা আমাকে কোনোভাবেই নেবে না।

পরে কীভাবে যোগ দিলেন?

আমিও কান্না শুরু করলাম। নানাভাবে অনুনয়-বিনয় করলাম। একজন অফিসারের মায়া হলো। তিনি বললেন আমাকে যেন নেওয়া হয়। পরে এরা অনেকটা বাধ্য হয়েই আমাকে নিয়েছে। আমি ৪ নম্বর রেজিমেন্টে যোগ দিই (২ নং সেক্টর)। সেখানে ট্রেনিং শুরু করেছি। আমি ছিলাম সবার চেয়ে বয়সে ছোট। এ জন্য সবাই অনেক আদর করত।

একটা অপারেশনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন?

নেতৃত্ব নয় ঠিক, আমরা ১০ জনের একেকটা গ্রুপ হয়ে অপারেশনে যেতাম। এই ঘটনাটা ২২ নভেম্বরের আগের। আমার ঠিক মনে আসছে না। আমরা রাত তিন বা চারটার দিকে পাকিস্তানি ক্যাম্পে আক্রমণ করব ঠিক করলাম। সেখানে ২০-২৫ জনের একটা গ্রুপ ছিলাম। রাস্তায় পাকিস্তান আর্মি তখন টহল করছে। আমরা আক্রমণ করি। এরাও তখন পাল্টা আক্রমণ করে। আমাদের একজনকে দায়িত্ব নিতে হবে ক্রমাগত গুলি করার জন্য। এরই মধ্যে বাকিদের নিরাপদে সরতে হবে। তখন আমি দায়িত্ব নিই। আমার কাছে দুই শ বা আড়াই শ বুলেট ছিল। আমি তখন কাভার করি। সঙ্গীরা নিরাপদে সরে যায়। পাকিস্তানিরাও সামনে না এগিয়ে পিছিয়ে যায়। আমি ভোর পাঁচটা পর্যন্ত গুলি করি। পরে একটা সময় সব থেমে যায়।

আপনি নাকি তখন বাঙ্কারে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন?

এই অপারেশনে আমি গুলি করতে করতে হঠাৎ ভোরের দিকে সেখানে ঘুমিয়ে যাই। সহযোদ্ধারা ভেবেছিল, আমি শহীদ হয়ে গেছি। পরে এরা আমার খোঁজ করতে এসে দেখে আমি ঘুমিয়ে আছি। এই অবস্থায় দেখে সবাই ভেবেছে, আমি মরেই গেছি। পরে হঠাৎ জেগে উঠলে আমাকে জড়িয়ে ধরে সবাই।

আপনার বাবাকে পাকিস্তানি সেনারা ধরে নিয়ে গিয়েছিল, তাকে তো আপনি আর দেখেননি...

দিনটা ছিল ৭ ভাদ্র। যাদের সন্তানরা যুদ্ধে গেছে, পাকিস্তানি আর্মিরা তাদের অনেকের অভিভাবককে ধরে নিয়ে গেছে। বাবাকেও সে কারণেই ধরে নিয়ে গেছে। প্রায় ৩৭ জনকে ধরে নিয়ে গেছে। এর মধ্যে আমার আব্বা (আবদুল হাশিম), চাচা আবদুল খালেক ও গোলাম মাওলা, চাচাতো ভাই তারা চান ও আমার বড় ভাই আবুল খায়ের মাস্টার। আমার বড় ভাই কীভাবে যেন পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। বাকিদের গঙ্গাসাগর পাড়ে নিয়ে গেছে। হত্যা করার আগে এই মানুষগুলোকে দিয়েই গর্ত তৈরি করেছিল হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরা। একে একে সবাইকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। পরে এই গর্তেই সবাইকে পুঁতে ফেলে।

এই হত্যায় জড়িত এই দোসরদের চেনেন?

চিনব না কেন? এরা তো আমাদেরই আশপাশের মানুষ। এদের একজন মোবারক রাজাকার। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিচার চলছে। একটি মামলায় তার ফাঁসির রায় হয়েছে। বাকিগুলোতেও হবে, আশা করি। এদের মতো যারা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী, তাদের প্রত্যেকের ফাঁসি কার্যকর করা প্রয়োজন। এরা তো বাংলাদেশি নয়, এরা পাকিস্তানের দোসর। এরা খায় বাংলাদেশের আর কথা বলে পাকিস্তানি সুরে।

শুনেছি তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন?

‘মোবারক রাজাকার’ যুদ্ধের পর ভোল পাল্টে ফেলে। সে ছিল জামায়াতের রুকন। যুদ্ধের পর আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হলে তাকে উপজেলা আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এখন শুধু তার ফাঁসির চূড়ান্ত রায় কার্যকরের অপেক্ষায় আছি।

আপনার পরিবারের আর কেউ যুদ্ধ করেছে?

সবাই অংশগ্রহণ করতে পারেনি। আমরা আট ভাই ও এক বোন। আমি (চতুর্থ) আর আমার ভাই আবুল কালাম (দ্বিতীয়) যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। বাবা, চাচা আর চাচাতো ভাইদের তো পাকিস্তানিরা মেরেই ফেলল।

হাশিমপুর গ্রামের নাম তো আপনার বাবা আবদুল হাশিমের নামে রাখা হয়েছে।

জি, এটা আমার বাবার নামে নামকরণ করা হয়। আগে এই গ্রামের নাম ছিল টানমান্দাইল। এখন গ্রামের নাম হাশিমপুর।

আপনার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল...

২২ নভেম্বর আমরা সবচেয়ে বড় একটি অপারেশন করি। সেটা কসবার লতুয়া মোড়া। যেখানে আমাদের দেড় শর মতো মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়। সেখানেই আমার দুই হাতে বুলেট ও শেলবিদ্ধ হই। অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যাওয়া আমাকে ভারতে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। আর আমার সঙ্গে ছিলেন আরেক সহযোদ্ধা আসাদুজ্জামান খান। এরই মধ্যে দেশ স্বধীন হয়েছে। আমি আর অসুস্থতার কারণে দেশে ফিরতে পারিনি। এই সময় সবাই ধারণা করেছে, আমি শহীদ হয়ে গেছি। এর মধ্যে আমি বাড়িতে চিঠি পাঠিয়েছি। কিন্তু বাড়ির কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।

কখন দেশে ফিরেছেন?

আমার ফিরতে ফিরতে বেশ দেরি হয়ে গেছে। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১ বা ২ মার্চ দেশে চলে আসি। ভারতীয় সেনারা আমাকে বেনাপোল দিয়ে যশোর সীমান্তে নামিয়ে দিয়ে যায়। সেখান থেকে খুলনা হয়ে চাঁদপুর দিয়ে আখাউড়ায় এসে পৌঁছাই।

দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের, একজন বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছেন।

তখন তো এত কিছু ভেবে যুদ্ধ করিনি। একজন কিশোরের কাছে তার দেশকে ভালো লাগে। সে কারণেই দেশের জন্য আমি সেদিন যুদ্ধে যাই। দেশ আমাকে সম্মান দিয়েছে, এটা আমার কাছে গর্বের। এই ভালো লাগা বলে শেষ করা যাবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত