ধ্রুপদীকে বানালেন গোলাপী

রুদ্র রুদ্রাক্ষ
| আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৪:১০ | প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৩:২৯

ফোনের অপরপ্রান্তে কান্নার শব্দ টের পাচ্ছিলাম স্পষ্ট। ববিতার কান্না আমি সিনেমায় দেখেছি। কিন্তু সিনেমায় দেখা সেই কান্নার সঙ্গে এই কান্নার কোনো মিল নেই। তিনি কান্না চাপানোর চেষ্টা করছেন ফোনের অপর প্রান্তে। নন্দিত নির্মাতা আমজাদ হোসেনের মৃত্যুর পর ববিতা কাঁদবেন, কাঁদাবেন সারা দেশকেÑ এটাই স্বাভাবিক। এই নির্মাতার প্রায় সব বিখ্যাত সিনেমারই নায়িকা ছিলেন তিনি। ববিতার ভাষায়, আমজাদ হোসেনের ছবিতেই তিনি (ববিতা) নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন।

কান্না লুকিয়ে ববিতা বললেন, ‘কাকতালীয়ভাবে কখনো কখনো সিনেমার সংলাপেরা জীবন্ত হয়ে ওঠে। আজ (শুক্রবার) আমজাদ ভাই মারা গেলেন, আর আমাকেই কিছু একটা বলতে হবে তাকে নিয়ে। আমি বলছি ‘আমজাদ ভাই, আপনি কী শুনতে পাচ্ছেন? আপনি কী জানতেন আপনার মৃত্যুর পর আমাকেই স্মৃতিচারণা করতে হবে? আপনার সেই সংলাপ ‘ক গোলাপী ক’ আমার জীবনের সঙ্গে মিলে গেল তো। আজ বলতে হচ্ছে আপনাকে ছাড়া ভালো থাকবে না ঢাকাই সিনেমা, ভালো থাকবে না পরিচিতজনরা।’

আমজাদ হোসেনের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর শুক্রবার বিকালে ঢাকা টাইমসের সঙ্গে কথা হয় তারকা অভিনেত্রী ববিতার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রুদ্র রুদ্রাক্ষ।

আমজাদ হোসেনের সঙ্গে আপনার প্রথম কাজ...

‘নয়নমণি’। সে সময় আমি ব্যস্ত নায়িকা। একদিন সন্ধ্যার পর ভাবি আর আমজাদ ভাই এলেন। বললেন তার পরবর্তী সিনেমার জন্য আমাকে কাস্ট করতে চান। স্ক্রিপ্ট দিলেন। সিনোপসিস পড়েই তো মুগ্ধ আমি। বললাম, আমজাদ ভাই, আমি কাজ করতে চাই। এবার তিনি বেঁধে দিলেন এক শর্ত। আমাকে যত দিন দরকার হবে তত দিন কাজ করতে হবে। আমি কোনোকিছু না ভেবেই হ্যাঁ বলে দিলাম। এখনো মনে আছে, ওই সিনেমার জন্য বেশ কিছু সিনেমার কাজ ছেড়ে দিয়েছিলাম আমি।

আমজাদ হোসেনের কোন সিনেমায় সবচে বেশি মুগ্ধতা কাজ করে আপনার?

সব সিনেমাতেই। ওনার প্রতিটি সিনেমাতেই মুনশিয়ানার ছোঁয়া থাকে। তবে বিশেষভাবে বলতে গেলে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’-এর নাম বলতে হবে।

ওই সিনেমা নিয়ে বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?

প্রচুর স্মৃতি আছে। আমরা ট্রেনে চেপে জামালপুরে যাচ্ছি। আমার চোখে সানগ্লাস। আরও অনেকের চোখেই সানগ্লাস। হঠাৎ আমজাদ ভাই তার সিট থেকে উঠে এসে বললেন, ‘গোলাপীর ঠোঁটে গান থাকবে’। কী গান এটা জিজ্ঞেস করার সুযোগ না দিয়েই তিনি শুরু করলেন পায়চারি। তাকে এখন বিরক্ত করা যাবে না। তিনি ভাবছেন গোলাপী কী গাইবে। কিছুক্ষণ বাদে আমজাদ ভাই শোনালেন ‘হায় রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ’- এই গানটা থাকবে গোলাপীর কণ্ঠে। আমাদের চোখের সানগ্লাস থেকেই সম্ভবত ওই গানটার জন্ম হয়েছিল।

পরিচালক আমজাদ হোসেনকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আমজাদ ভাই ছিলেন জহির রায়হানের যোগ্য শিষ্য। আমার মতে, সত্যজিৎ রায়, জহির রায়হান আর আমজাদ হোসেন এই উপমহাদেশের তিনজন শ্রেষ্ঠ নির্মাতা। ওনার সিনেমা দেশের বাইরেও সমাদৃত হতো। মস্কো ফেস্টিভ্যালে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’র প্রদর্শনী শেষে কলকাতার বিখ্যাত পরিচালক আমাকে বলেছিলেন, ‘বাহ ও-দেশেও তো দারুণ সিনেমা হচ্ছে’। বাণিজ্যিক ও শিল্পের মিথস্ক্রিয়া ছিল আমজাদ ভাইয়ের ছবিতে। আমরা দেখি কমার্শিয়াল ফিল্ম দেশীয় সিনেমা হলে চলে, আর আর্টফিল্ম দেখানো হয় ফেস্টিভ্যালে। আমজাদ ভাইয়ের সিনেমা যেমন প্রেক্ষাগৃহে সুপারহিট হতো, তেমনি নিয়মিত অংশ নিত দেশি-বিদেশি ফেস্টিভ্যালে। সিনেমার সংজ্ঞা ভেঙে উনি ‘আমজাদ ফিল্ম’ প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।

সাহিত্যিক আমজাদ হোসেনকে চিনতেন?

চিনব না মানে। আমি তো ওনার উপন্যাসেরই নায়িকা। ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ওনার যে উপন্যাস থেকে নির্মাণ করা হয়েছে, সেটার নাম ছিল ‘ধ্রুপদী এখন ট্রেনে’। সেই ধ্রুপদীকে গোলাপী বানিয়ে তিনি দর্শকের সামনে উপস্থাপন করলেন। শুধু সাহিত্যিকই না, তিনি ছিলেন মেধাবী সাহিত্যিক। সাহিত্য ও সিনেমার যে পাঠক-দর্শক বিভাজন, এটা তিনি বুঝতেন। এ কারণেই ধ্রুপদীকে বানালেন গোলাপী। ধ্রুপদী নামটার চেয়ে গোলাপী নামটা মানুষের মুখে মুখে বেশি রটাবে এটা তিনি বুঝেছিলেন। এবং রটেছেও। ওই সময় অনেক প্রেমিক তার প্রেমিকাকে ‘গোলাপী’ বলে ডাকতেন। শুধু এটা নয়। আমজাদ ভাই উপন্যাসের পাশাপাশি নাটক লিখেছেন, জীবনী লিখেছেন ভাসানী, সুভাস বসুসহ অনেকের। ওনার সাহিত্যকর্মের সঙ্গে বেশ পরিচিত আমি।

মানুষ আমজাদ হোসেন...

মানুষ মানে হলো যার মান ও হুঁশ আছে। আমজাদ ভাইয়ের ছিল মান ও পাগলামি। পাগলামিও যে সুন্দর হয় সেটা আমজাদ ভাইকে না দেখলে বুঝতাম না। মান ও পাগলামি নিয়ে উনি হয়ে উঠেছিলেন প্রকৃত মানুষ। আমরা শ্রদ্ধা করতাম তার পাগলামিকে। রাত তিনটায় উনি কলটাইম দিতেন। আমরা সব আর্টিস্টরা সানন্দে সেটে চলে যেতাম। কারও ভেতরে বিন্দুমাত্র অনিচ্ছা দেখিনি আমি তখন। কারণ আমরা সবাই জানতাম আমজাদ ভাইয়ের এই সব সিদ্ধান্তের নাম হলো শিল্প।

আমজাদ হোসেনের কষ্টের কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?

(হাউমাউ করে কাঁদলেন ববিতা) আমজাদ ভাইয়ের আলসার ছিল। আমরা জানতাম না। একদিন আমরা সবাই সেটে ওয়েট করছি। উনি আসেননি। স্বভাবতই অনেকের চোখে-মুখে বিরক্তির রেখা। উনি আসলেন তিন ঘণ্টা পর। এরপর আমরা জানলাম লোকটা সারা রাত বালিশে বুক চেপে সিকোয়েন্স লিখেছেন। এ কথা জেনে ইউনিটের প্রত্যকেটা মানুষ তার জন্য অশ্রু ফেলেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিনোদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত