এরশাদ-রওশন অবিশ্বাসে জাপায় টানাপোড়েন

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
 | প্রকাশিত : ০৫ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:৩১

জাতীয় পার্টিতে কী হচ্ছে? বড় কোনো পরিবর্তন কি আসছে দলটির নেতৃত্বে? এরশাদ কি তবে সরে যাচ্ছেন চেয়ারম্যান পদ থেকে? রওশনের সঙ্গে এরশাদের সম্পর্কের মিঠাকড়া কত দূর গড়াল?
এমন অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে সরিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দলটিকে নিয়ে।
জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েনের বিষয়টি প্রথম স্পষ্ট হয় ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনের আগে। এরশাদ ভোটে যাবেন না ঘোষণা দিয়ে দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করার নির্দেশের পরও রওশন এরশাদের নেতৃত্বে একটি অংশ ভোটে যায়। নির্বাচনে ৩৪টি আসনে জয়ী জাতীয় পার্টির এই নেতাদের মধ্যে এরশাদের প্রভাব ছিল খুবই কম। সংসদীয় দলের সভায় এরশাদকে বাদ দিয়ে রওশনকে নেতা বানান তারা।
এবারের নির্বাচনেও প্রধানত আসন বণ্টন নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বনিবনা হচ্ছিল না জাতীয় পার্টির। কিন্তু জাতীয় পার্টিতে রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত মশিউর রহমান রাঙ্গা মহাসচিব হওয়ার পর এ নিয়ে আর কোনো বিরোধ হয়নি।
রওশন এরশাদের সঙ্গে আবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পর্ক ভালো। দশম সংসদের বিরোধীদলীয় নেতাকে তিনি বেশ আস্থায় রাখেন। এরশাদকে বিশেষ দূত বানালেও রওশনপন্থীরাই সরকারে গুরুত্ব পেয়েছেন বেশি।
এর কারণ প্রধানত এরশাদের অস্থি’রতা। একবার এক সিদ্ধান্ত তো আরেকবার অন্য। ২০১৪ সালের নির্বাচনে না আসতে বিএনপিকে আহ্বান জানানোর কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি আবার উল্টে গিয়ে ভোটে না যাওয়ার কথা বলেন।
এবারও চিকিৎসা শেষে সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে মহাজোটের বাইরে দলের সব প্রার্থীকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন এরশাদ। আবার ভোল পাল্টান কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানান, লাঙ্গলের কোনো প্রার্থী সরবেন না।
এরশাদের এই দ্বিচারিতার কারণে দলেও তার বিরুদ্ধে একটি পক্ষ সক্রিয়। আর তারা রওশনেই আশ্রয় নিয়েছেন। শারীরিকভাবে দুর্বল এরশাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই তিনি আগেভাগে তার অবর্তমানে ভাই জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
বছরের প্রথম দিন ১ জানুয়ারি গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জাপাকে ঘিরে নতুন করে জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে এরশাদ জানান, তার অবর্তমানে দলের হাল ধরবেন ছোট ভাই কাদের। অথচ কদিন আগেই এরশাদ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান, তার অবর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবেন সাবেক মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার।
এরশাদের সঙ্গে রওশনের বোঝাপড়ার দূরত্ব নিয়ে দলের ভেতরে নানা গুঞ্জন ডানপালা মেলছে। দলের অনেক সিদ্ধান্তে তারা এক হতে পারতেন না। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের সঙ্গে আসন সমঝোতা থেকে শুরু করে প্রার্থী মনোনয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এরশাদকে না জানিয়ে।
অন্যদিকে এরশাদ ও রওশনের মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস দলে দুই নেতার অনুসারী-অনুগামীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। এসব কারণে দলে দেখা দিয়েছে টানাপোড়েন। বিভিন্ন সময় তা স্পষ্টও হচ্ছে। জাতীয় পার্টি এবার শুধু বিরোধী দলে থাকবে, মন্ত্রিসভায় যাবে নাÑগতকাল দলীয় প্রধানের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়েও মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা নাকি আগে থেকে কিছুই জানতেন না।
দলটির নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, প্রকাশ্যে না হলেও জাতীয় পার্টিতে দীর্ঘদিন ধরেই মৌন বিভক্তি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে একটি অংশ আছে এরশাদের সঙ্গে। অন্যরা অনুসরণ করেন রওশন এরশাদকে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরশাদের চেয়ে রওশনের ওপর বেশি আস্থা রাখেন। মহাজোটের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রয়োজন হলে রওশনের সঙ্গেই কথা বলেন। তাই চেয়ারম্যান পদে থাকলেও কার্যত জাপায় এরশাদের গুরুত্ব কমেছে অনেকে আগেই।
এরশাদের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত দলের সভাপতিম-লীর একজন সদস্য বলেন, এরশাদের আশঙ্কা তাকে ধীরে ধীরে দলের নেতৃত্বে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হচ্ছে। তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। তার অবর্তমানে দলের নেতৃত্ব বেহাত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে সাবেক এই রাষ্ট্রপতির। তাই কিছু একটা হওয়ার আগেই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তার বর্তমানে দলের সম্মেলনে ছোট ভাই জি এম কাদেরকে দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করতে নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছেন।
অপর একটি সূত্র জানায়, রওশনের সঙ্গে জি এম কাদেরের সম্পর্কও ভালো নয়। কাদের এরশাদের নির্দেশনা মেনে কাজ করেন। রওশনের তা পছন্দ নয়। তাদের দুজনকে ঘিরেও দলে বিভক্তি রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সংসদ ভবনের শপথ অনুষ্ঠানে এরশাদ উপস্থিত না হলেও দলের নবনির্বাচিত ২১ জন সংসদ সদস্য ঠিকই শপথ নিয়েছেন। দলের কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদও উপস্থিত ছিলেন। পরে দলের সংসদীয় সভা শেষে বেরিয়ে এসে জাপার মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা সাংবাদিকদের জানান, দশম জাতীয় সংসদের মতো এবারও তারা মন্ত্রিসভা ও বিরোধী দলÑদুই ভূমিকাতেই থাকবেন।
কিন্তু পরদিন গতকাল সকালে গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জাপার চেয়ারম্যান এরশাদ জানান, তার দল এবার মন্ত্রিসভায় নয়, শুধু সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবে। সংসদ নেতা হবেন তিনি এবং উপনেতা হবেন জি এম কাদের। বিদায়ী দশম সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন রওশন এরশাদ। কিন্তু এবার তাকে কোথাও রাখা হয়নি।
এক রাতের ব্যবধানে সিদ্ধান্তে এমন পরিবর্তনের কারণ কী? জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাত ১০টা পর্যন্ত আমি পার্টির চেয়ারম্যানের সঙ্গে ছিলাম। তিনি তখনো আমাকে এ বিষয়ে কিছু বলেননি। তবে তিনি যদি কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তা তিনি নিতে পারেন। কারণ দলের গঠনতন্ত্রের ৩৯ ধারা অনুযায়ী, চেয়ারম্যান ক্যান ডু অ্যাভরিথিং। তিনি তা করলে আমরা মানব।’
রাঙ্গা বলেন, ‘এর আগে তিনি (এরশাদ) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, তার অবর্তমানে দলে কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের সাহেব চেয়ারম্যান হবেন। আমরা তা মেনে নিয়েছি।’
এরশাদের সঙ্গে রওশনের বোঝাপড়ায় দূরত্বের কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে জাপার এই নেতা বলেন, ‘আমি তা মনে করি না।’
নির্বাচনের আগে একাধিকবার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি হয়েছেন এরশাদ। তারপর উন্নত চিকিৎসার জন্য যান সিঙ্গাপুরে। ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার শেষ হওয়ার পরদিন তিনি দেশে ফিরলেও বিমানবন্দর থেকে সোজা ওঠেন বনানীর বাসভবনে। সেখানে সবার সঙ্গে দেখাও দিচ্ছেন না। প্রয়োজনে দলের শীর্ষ কয়েকজন নেতাকে ডেকে নিয়ে কথা বলছেন।
১৯৮২ সালে জোর করে ক্ষমতা দখল করা এরশাদ ৮৬ সালের ১ জানুয়ারি নিজের দল জাতীয় পার্টি গঠন করেন। সেই থেকে তিনিই দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এবারের নির্বাচনে রংপুর-৩ আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
শুরু থেকেই নানা ধরনের ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে জাতীয় পার্টিকে। মতের অনৈক্যে দল ভেঙেছে বহুবার। ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য হওয়া, গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘদিন কারান্তরীণ থাকাসহ নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন এরশাদ। জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপির সঙ্গে একাধিকবার জোট করেছেন। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে তা আবার ভেঙেছেন। জোট গড়েছেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে। ২০০৮ ও ২০১৪ সালে মহাজোটের বিপুল জয়ের সুফল পেয়েছে জাতীয় পার্টিও। মন্ত্রিসভা ও বিরোধী দল দুই জায়গাতেই দলটির ঠাঁই হয়েছে দশম জাতীয় সংসদে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :