আপনি শুনছেন তো, স্যার!

মনদীপ ঘরাই
| আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০১৯, ১৪:০৯ | প্রকাশিত : ০৬ জানুয়ারি ২০১৯, ১৩:৩৬

মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর লিখেছিলাম, "যাকে ছুঁয়ে দেখি নি, তাঁর মৃত্যু কেন কাঁদাবে?"

আজ কেন জানি মনে হচ্ছে কলমের সেই কালি দিয়েই লিখছি। মন খারাপের কিংবা শোকের কালো কালি। সবার মনে দাগ কাটা এক মৃত্যুর এত পরে কেন লিখছি? প্রশ্নটা স্বাভাবিক, উত্তরটা গোলমেলে লাগতে পারে।

সবার স্ট্যাটাস, প্রোফাইল পিকচার আর শ্রদ্ধা নিবেদনের মাঝে আমার লেখাটি সৈয়দ আশরাফ পর্যন্ত পৌঁছাতো কি না কে জানে? তাই মায়ের মাটির বুকে নিথর দেহটা আসার পরেই কলমটা ধরলাম।

আশরাফ স্যারের পারিবারিক ঐতিহ্য, বর্ণময় কর্মজীবন,রাজনীতি... এসব নিয়ে একটা কথাও বলবো না। শয়ে শয়ে লেখা রয়েছে। হাঁটবো অন্য পথে। অন্য আলোয়।

কয়েক বছর আগের কথা। আশরাফ স্যারের অর্ধাঙ্গিনী শীলা ম্যাডাম আসলেন ফরিদপুরে। তখন আমি এনডিসি। দুটো দিনের সফরের অনেকটা সময় ম্যাডামের সাথে ছিলাম। গল্প হয়েছিল অনেক। আশরাফ স্যারের সাথে তাঁর প্রথম দেখা হতে শুরু করে জীবনের নানা অজানা গল্প। একটা ব্যাপার বুঝতে কষ্ট হয় নি, দুজনের আত্মার বাঁধনটা ছিল মারাত্মক শক্ত।

যেদিন শীলা ম্যাডাম চলে গেলেন, ওইদিন মনে মনেই বলেছিলাম, স্যারের খুব কষ্ট হয়ে যাবে। এ জগৎ সংসারের বাঁধনটা সেদিনই কি খানিকটা আলগা হয়ে যায় নি? আশরাফ স্যারের কত গুণ নিয়ে আলাপ চলছে...সাধাসিধে, সৎ, সরল জীবন। স্যারের দোষ নিয়ে তো কেউ কিছু বললেন না!

আমি বলবো। স্যার, এভাবে চলে যাওয়ার জন্য দোষারোপ করতে ছাড়বো না আপনাকে। আপনাকে বড় দরকার ছিল আমাদের।বড় দরকার।

আজ মৃত্যুর পর আপনাকে স্মরণ করছি সবাই।অন্তর থেকে।কোনো সন্দেহ নেই। তবু কেন জানি মনে হয়, আরও ভালোবাসতে, শ্রদ্ধা করতে পারতাম আপনার জীবদ্দশায়। আক্ষেপটা পিছু ছাড়ছে না।

পিতার মৃত্যুশোক বুকে লুকিয়ে কেটেছে এতগুলো বছর। শেষে এসে প্রিয় অর্ধাঙ্গীর মৃত্যু। সয়ে গেছেন আজীবন সে কষ্ট। আর আমাদের আপনার প্রয়াণ মেনে নিতেই এত কষ্ট হচ্ছে কেন? কারণ, প্রচারণার এ যুগে আপনি নীতির লড়াই লড়ে গেছেন যত্ন করে, নীরবে। আমরা তবুও জেনেছি সব। স্বচ্ছ সে বাতাস ছুঁয়ে গেছে আমাদেরও।  আজ কেন জানি দমবন্ধ লাগছে। হয়তো আরও আরও সুবাতাস ছুঁয়ে যাবে আমাদের। তবু আপনাকে তো আর পাবো না।

ভালো মানুষ কাকে বলে, স্যার? আমার জ্ঞানের বাইরে সে সংজ্ঞা। তবে, উদাহরণ যদি চায় কেউ আমার কাছে, মনের অজান্তেই বলে উঠবো আপনার নাম।

প্রত্যেকটা মৃত্যুই হারানোর বেদনা দিয়ে যায়। কোনটা মনে দাগ কাটে, কোনটা অশ্রুজলে ধুয়ে যায়। আজ লাখো তরুনের মনে দাগ কেটে গেছে এই প্রয়ান। কষ্টটা মেখে থাকুক আমাদের অস্তিত্বে। তবেই তো আপনার যা কিছু ভালো তা আত্মস্থ করতে পারবো সবাই।

ফেসবুকে হাজারো প্রোফাইলের প্রোফাইল পিকচার আজ আশরাফ স্যারের। আজ আমরা আপনার সাথে একাত্ম হয়ে গেছি সবাই। তাই যেন হয়। আপনার মতো নেতা গড়ে উঠুক বাংলার লাল-সবুজের প্রতি ঘরে।

বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের সনদটা নিয়েছিলাম আপনার হাত থেকে। করমর্দনের সেই স্মৃতিটাই আমার একমাত্র স্মৃতি। ওটুকুতেই যদি আজ এতটা বিমর্ষ হয়ে পড়ি, তবে আপনার নিবিড় সান্নিধ্য যারা পেয়েছে, তাদের মনের বেদনা যে পর্বতসম,তা অণুমান করতে পারি সহজেই।

আপনার বলা একটা কথা এখনো মনে,মস্তিস্কে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বন্ধু রাশেদ রেজা ডিকেনের ফেসবুক ওয়াল থেকে তুলে দিলাম হুবহু। আপনি বলেছিলেন, "তুমি ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তেভেজা বাংলাদেশের কর্মকর্তা। মনে রেখো।" মনে রাখবো স্যার।আমরা সবাই মনে রাখবো। আপনার জাগতিক পথ চলার শেষ। আমাদের শুরু। শুভাশীষটা ওপার থেকেও যেন সবাই পাই।

বিদায় "সত্যিকারের নেতা"।

মনদীপ ঘরাই: লেখক এবং সিনিয়র সহকারী সচিব, বাংলাদেশ সরকার

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :