চাঙা পুঁজিবাজারে দুর্বল কোম্পানিরও উল্লম্ফন

রহমান আজিজ
 | প্রকাশিত : ০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০৮:৫১

কারসাজি হচ্ছে বুঝতে পেরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১৩টি কোম্পানির বিষয়ে সতর্কতা দেওয়া হয় গত আগস্টে। সেসব কোম্পানি পরিদর্শন করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসিকে প্রতিবেদনও দিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষÑডিএসই। কিন্তু কারসাজি বন্ধ করা যায়নি।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার ক্ষমতায় ফেরার পর চলতি বছরের প্রথম দিন থেকে বাজারে যে চাঙাভাব, সেই সুযোগে লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ছে উৎপাদন বন্ধ এবং লোকসানি কোম্পানিগুলোর।

অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুবার পুঁজিবাজারে ধস হয়েছে। এ কারণে একধরনের অস্বস্তিও আছে ক্ষমতাসীন দলে। শেয়ার লেনদেনে সতর্ক হতে নানা সময় আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়ে নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালও একই আহ্বান জানিয়েছেন।

এবার ভোটের আগে বাজারে ছিল দীর্ঘ মন্দা। তবে সরকারের ধারাবাহিকতার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর নিষ্ক্রিয় বিনিয়োগকারীরাও সক্রিয় হতে শুরু করেছে। ভোটের পর ছয় কার্যদিবসের মধ্যে পাঁচ দিনই বেড়েছে সূচক। বেড়েছে ৪২১ পয়েন্টের বেশি। লেনদেনও বেড়ে ছাড়িয়েছে হাজার কোটি টাকা।

ভোটের আগে টানা এক বছরই বলতে গেলে পড়তির দিকে ছিল পুঁজিবাজার। হতাশা ছড়িয়েছিল বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। নতুন সরকার আসার পর চাঙাভাব দেখে কাটতে শুরু করেছে হতাশা। কিন্তু এর মধ্যে বাছবিচার ছাড়া সব কোম্পানির শেয়ারের দাম বৃদ্ধি নিয়ে আছে উদ্বেগও।

ডিএসই কর্তৃপক্ষ যেসব কোম্পানি নিয়ে সতর্কতা দিচ্ছে তার একটি সোনারগাঁও টেক্সটাইল। পাঁচ বছর ধরে লভ্যাংশ দিতে না পারা কোম্পানিটির শেয়ারের দর গত ১০ ডিসেম্বরও ছিল ২১ দশমিক ৫০ টাকা। কিন্তু গতকাল এটি লেনদেন শেষ করেছে ৩৫ টাকায়। গত অর্থবছরে ৫৭ পয়সা লোকসান দেওয়া কোম্পানিটি চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে লোকসান দিয়েছে ৩৩ টাকা।

সতর্কতা দেওয়া আরেক কোম্পানি দুলা মিয়া কটনের শেয়ারের দাম গত ২০ ডিসেম্বরও ছিল ২৩ টাকা। গতকাল এক টাকা কমলেও এটি লেনদেন শেষ করেছে ৩৪ টাকায়। গত অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ৪.০৪ টাকা লোকসান দেওয়া কোম্পানিটি চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে লোকসান দিয়েছে ১.১৭ টাকা।

খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের মেঘনা কনডেন্সড মিল্কের শেয়ারদর গত ২৩ ডিসেম্বরও ছিল ২০.৯ টাকা। গতকাল সেটি লেনদেন শেষ করেছে ৩১.৭০ টাকায়। ২০০১ সালে তালিকাভুক্ত এই কোম্পানি কখনো লভ্যাংশ দেয়নি। আর ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের পেছনে কোম্পানিটির দায় আছে ৪৪ টাকারও বেশি।

ঢাকা-১ আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সালমান এফ রহমানের তিনটি কোম্পানির শেয়ারদর হঠাৎ লাফাতে শুরু করেছে ভোটের পর থেকে। ভোটের আগে শেষ কার্যদিবস ২৭ ডিসেম্বরে যার দর ছিল ১৪ টাকা, সেটি গতকাল লেনদেন শেষ করেছে ১৬ টাকায়। অথচ এই কোম্পানি গত পাঁচ বছর ধরে লভ্যাংশ দিচ্ছে না।

সালমানের আরেক কোম্পানি আরও বেশি লোকসানি বেক্সিমকো সিনথেটিকসের দর ৭.৩০ টাকা ছিল ভোটের আগেও। সেটি গতকাল লেনদেন শেষ করেছে ৯.১০ টাকায়। এটিও পাঁচ বছর ধরে লোকসানের কারণে লভ্যাংশ দিতে পারেনি। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৮৭ টাকা।

ডিএসই প্রতি কার্যদিবসে যেসব কোম্পানির লেনদেনের বিষয়ে সতর্ক থাকতে নিত্যদিন বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছে, সেগুলো হলো মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক ইন্ডাস্ট্রিজ, মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, দুলা মিয়া কটন স্পিনিং মিলস, সামতা লেদার কমপ্লেক্স, শ্যামপুর সুগার মিলস, জিলবাংলা সুগার মিলস, ইমাম বাটন ইন্ডাস্ট্রিজ, কেরু মেট ইন্ডাস্ট্রিজ, সাভার রিফ্র্যাকটরিস, বেক্সিমকো সিনথেটিকস, জুট স্পিনার্স, শাইনপুকুর সিরামিক, নর্দান জুট, সোনারগাঁও টেক্সটাইল এবং ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক।

ডিএসই এসব কোম্পানির বিষয়ে প্রথমে সতর্কতা দেয় গত বছরের ৭ আগস্ট। এর পর থেকে প্রতি কার্যদিবসেই লেনদেন শুরুর আগে এসব কোম্পানিকে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানানো হচ্ছে। আর এই কয় মাসে এসব কোম্পানি সরেজমিন পরিদর্শনও করেছে ডিএসই।

ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘পরিদর্শনে দেখা গেছে, অধিকাংশ কোম্পানির ঘুরে দাঁড়াতে তিন থেকে চার বছর সময় লাগবে। এই সময়ের মধ্যে তাদের লভ্যাংশ দেওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।’

এই প্রতিবেদন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসিকে দিলেও তারা এসব কোম্পানির বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান ঢাকা টাইমসকে জানিয়েছেন, এ প্রসঙ্গে তিনি কিছুই জানেন না।

ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘চিঠি পাওয়ার পর কোম্পানিগুলো লিখিত যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তা ডিএসইর কাছে সন্তোষজনক মনে হয়নি। ফলে এগুলোর প্রতিনিধিদের সরাসরি ডিএসইর কার্যালয়ে শুনানিতে ডাকা হয়। এতে পাঁচ থেকে ছয় কোম্পানি জানিয়েছে, নানা কারণে তাদের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না এবং শিগগির মুনাফায় আসা সম্ভব নয়। আগামী আরও কয়েক বছর তাদের পক্ষে লভ্যাংশ দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে বলে জানায় তারা।’

‘আমাদের একটি প্রতিনিধিদল কোম্পানিগুলো সরাসরি পরিদর্শনও করেছে। পরিদর্শনে দেখা গেছে, আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে এ কোম্পানিগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। আমরা পরিদর্শন রিপোর্ট এবং ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কাছে পাঠিয়েছি।’

ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে রকিবুর জানান, ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যবস্থা নেবে। আমরা পরিদর্শন প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। এর পরও যদি আমাদের ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা থাকে, তবে অবশ্যই নেব।’

পুঁজিবাজারে নানা সময় বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিক রকমের বেড়ে যায়। গত দুই বছরে প্রায় ১০ গুণ দাম বেড়েছে এমন কোম্পানিও রয়েছে। চার টাকা ৩০ পয়সা সম্পদমূল্যের কোম্পানির শেয়ারদর ৩১০ টাকাও আছে।

অস্বাভাবিকভাবে শেয়ারদর বাড়ার কারণ জানতে গিয়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে নানা সময় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। কোম্পানিগুলো সচরাচর জানায়, এ বিষয়ে অপ্রকাশিত কোনো তথ্য নেই। এ ছাড়া আর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। গতকালও নয় কোম্পানিকে চিঠি দিয়ে এই নোটিশ জারি করেছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলহাজ টেক্সটাইল মিলসের শেয়ারদর গত ২ ডিসেম্বর থেকে বেড়েই চলেছে। ওই দিন থেকে বেড়ে শেয়ারটির দর দাঁড়ায় ৮৬ টাকা ৯০ পয়সা। গতকাল শেয়ারটির দর ৯৫ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে সর্বশেষ ১০৩ টাকা ৩০ পয়সা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।

মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদর গত ২ ডিসেম্বর থেকে বেড়েই চলেছে। ওই দিন থেকে বেড়ে শেয়ারটির দর দাঁড়ায় ১৪ টাকা ৯০ পয়সা। গতকাল শেয়ারটির দর ২২ টাকা থেকে বেড়ে সর্বশেষ ২৩ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।

ইউনাইটেড ইনস্যুরেন্সের দর গত ২ ডিসেম্বর ছিল ২২ টাকা ৭০ পয়সা। গতকাল শেয়ারটির দর ৩৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বেড়ে সর্বশেষ ৩৯ টাকা ১০ পয়সা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।

বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্সের দর ছিল ৫ টাকা ১০ পয়সা। সেটি গতকাল ৭ টাকা ৯০ পয়সা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। এই কোম্পানির স্বত্বাধিকারী মহাজোটের শরিক বিকল্পধারার মহাসচিব আবদুল মান্নান, যিনি লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে জিতেছেন।

সিভিও পেট্রোকেমিক্যালের দর ২ ডিসেম্বর ছিল ১৫৫ টাকা ৩০ পয়সা। গতকাল সেটি ২২৭ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।

অ্যাপোলো ইস্পাতের দাম গত ২ ডিসেম্বর ছিল ৭ টাকা ৩০ পয়সা। গতকাল এটি সর্বশেষ ১০ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।

২ ডিসেম্বর থেকে এপেক্স ফুডের দর ১৬০ টাকা ৯০ পয়সা থেকে হয়েছে ২১৫ টাকা ৩০ পয়সা।

গত চার মাসে বিস্ময়কর দর বৃদ্ধি হয়েছে নর্দান জুটের। গত অর্থবছরে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারপ্রতি ২০ টাকারও বেশি লোকসান দেওয়া কোম্পানিটির শেয়ারমূল্য গত ২৪ সেপ্টেম্বর ছিল ৩১৫ টাকা। গতকাল শেয়ারটির দর ১৩৬৬ টাকা থেকে বেড়ে সর্বশেষ ১৪৫৮ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।

এই কোম্পানির বড় শেয়ারধারী ছিল ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকÑআইডিবি। বাংলাদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে কোম্পানিটি ২৬৫ টাকা করে শেয়ার বেচে দিয়েছে গত জুনে। সেই কোম্পানির শেয়ারদরে এই লাফ কেন, এটা নিয়ে কথা আছে বাজারে।

গত বছর এই কোম্পানির মতোই অস্বাভাবিক দর বেড়েছে লিগ্যাসি ফুটওয়্যার, মুন্নু সিরামিক, মুন্নু স্টাফলারস, বিডি অটোকারস, স্টাইলক্রাফট, আজিজ পাইপ, সাভারাফার, জুট স্পিনার্সসহ বিভিন্ন কোম্পানির। এর পেছনে কারসাজি আছে কি না, এ নিয়ে নানা কথা থাকলেও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি।

অবশ্য রহিমা ফুড এবং মডার্ন ডায়িং নামের দুটি কোম্পানিকে মূল বাজার থেকে তালিকাচ্যুত করা হয়। কিন্তু বাকি কোম্পানিগুলোর বিষয়ে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে কোনো জবাব নেই।

ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করার জন্য আমাদের ওয়েবসাইটে প্রতিদিন অস্বাভাবিক দর বেড়ে যাওয়া কোম্পানিগুলোর নাম দিই। বিনিয়োগকারীদের দেখেশুনে বিনিয়োগ করতে হবে। খারাপ কোম্পানিতে কেন বিনিয়োগ করবেন। সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগ না করলে পুঁজি হারানোর আশঙ্কা থাকবে।’

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘গেম্বলাররা বিভিন্ন সময় নানা কোম্পানি নিয়ে খেলা করে। যেহেতু ডিএসইর সতর্কতার পরও কোনো কাজ হচ্ছে না, সে কারণে সাময়িকভাবে এগুলোর লেনদেন স্থগিত করা যেতে পারে। সেটি হবে শক্তিশালী ব্যবস্থা।’

‘আরেকটি কাজ করা যেতে পারে। এই কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা পাল্টে দিয়ে যাদের বেশি শেয়ার আছে, তাদের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। এর পরও যদি না হয়, সে ক্ষেত্রে তালিকাচ্যুত করা যেতে পারে। তবে এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে শেয়ারধারীদের টাকা দিয়ে দেওয়া যেতে পারে।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :