তিস্তা নিয়ে কথা রাখতে পারলেন না মোদি

নজরুল ইসলাম
 | প্রকাশিত : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০৮:৪৭

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ‘কাঁটা’ তিস্তা চুক্তি আটকে যাচ্ছে বারবার। আওয়ামী লীগের সদ্য গত এবং ভারতে তার সরকারের আমলেই এই চুক্তি করার অঙ্গীকার ছিল দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের ওই সরকারের মেয়াদ শেষে এসেছে নতুন সরকার। আর মোদি সরকারের মেয়াদও এখন শেষ পর্যায়ে। তিনি কথা রাখতে পারবেন কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিটি হয়ে যাওয়ার কথা ছিল সেই ২০১১ সালে। সে সময়ের ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরে চুক্তি সইয়ের বিষয়টি চূড়ান্তও ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে শেষ মুহূর্তে আটকে যায়। সেই মমতাই এখনো বাধা হয়ে আছেন। তাকে বাগে আনতে পারেননি মোদি। আর এরই মধ্যে সে দেশে যখন ভোটের আওয়াজ শুরু হয়ে গেছে, সে সময় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী এই চুক্তি আদৌ এগিয়ে নিতে পারবেন কি না, এ নিয়ে আছে সংশয়।

চলতি বছরের মার্চেই ভারতের সাধারণ নির্বাচন। এবার দুর্বল অবস্থানে থাকা পশ্চিমবঙ্গের দিকে হাত বাড়াচ্ছে বিজেপি। এই অবস্থায় তিস্তার পানিচুক্তি করে পানির ভাগাভাগি নিয়ে রাজ্যের মানুষের হিসাব-নিকাশের মধ্যে পড়তে মোদি রাজি হবেন কি না, সেই প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।

শুকনো মৌসুমে তিস্তায় পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় এরই মধ্যে উত্তরের জনপদের কৃষকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় তিস্তা চুক্তি আটকে যাওয়ার বিষয়টি আবার সামনাসামনি এসেছে।

বহুলপ্রতীক্ষিত তিস্তার জট খোলার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল ২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে রাষ্ট্রীয় সফরকে ঘিরে। ওই বছরের ৭ থেকে ১০ এপ্রিলের এই সফরে ৩৫টি বিষয়ে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়। তবে সেখানে ছিল না তিস্তার প্রসঙ্গ। যদিও সফরের দ্বিতীয় দিন ৮ এপ্রিল তার সরকার এবং বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সদ্য বিগত সরকারের আমলে এই চুক্তি করার অঙ্গীকার করেন।

গত ১১ মার্চ রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ভারত সফরেও তিস্তা চুক্তির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সেদিন আবদুল হামিদকে মোদি জানান, এ বিষয়ে মমতাকে রাজি করানোর চেষ্টা চলছে।

মোদি সরকারের মেয়াদে তিস্তা চুক্তি হবে কি না, জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমি এখন এটা নিয়ে কথা বলতে পারব না।’

ভারতে জাতীয় নির্বাচনের আগে তিস্তা চুক্তির সম্ভাবনা দেখছেন কি না, এমন প্রশ্নে সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির বলেন, ‘আমি মনে করি, বর্তমান সরকারকে তিস্তার বিষয়টি নতুন করে তুলে ধরতে হবে। মোদিকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে তিস্তা চুক্তি তার সরকারের সময়ে করে দেওয়ার কথা ছিল। তবে মমতা যেহেতু তিস্তার বিষয়ে নেগেটিভ তাকে বোঝানোটাই বেশি গুরত্বপূর্ণ।’

‘ভারতের সঙ্গে এটা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। বিশেষ করে, আমাদের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পানিবিষয়ক মন্ত্রীদের এটা নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। এ ছাড়া কোনো গতি নেই। আমি আশা করি, এটা হবে।’

বর্তমান সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত বেশ কিছু সমস্যার সমাধান হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বিনিময় হয়েছে ছিটমহল, যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রায় ১০ হাজার একর জমি বেশি পেয়েছে। দুই দেশের জলসীমান্তও চূড়ান্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে। এই সরকারের আমলে সীমান্ত হত্যাও কমে প্রায় শূন্যে নেমেছে। তবে তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যা রয়েই গেছে। আর এই পানিবণ্টন চুক্তি কয়েক বছর ধরে আটকে আছে মমতার আপত্তিতে। তার দাবি, বাংলাদেশকে পানি দিলে তার রাজ্য পর্যাপ্ত পানি পাবে না।

২০১৭ সালে মমতা তিস্তার চুক্তি না করে তোর্সার পাশাপাশি ছোট আরও দুটি নদীর পানি বাংলাদেশকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই নদীর পানি তিস্তায় আনতে খনন করতে হবে নদীর মতোই বড় খাল।

গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পশ্চিমবঙ্গ সফরকে ঘিরেও তিস্তার প্রসঙ্গ সামনে আসে। যদিও এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল অন্য। তার পরও মোদির সঙ্গে তার এক ঘণ্টার একান্ত বৈঠক এবং পরে মমতার সঙ্গে আধা ঘণ্টার আলাপনে তিস্তা নিয়ে নাটকীয় কোনো ঘোষণার অপেক্ষায় ছিল বাংলাদেশ।

তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এরই মধ্যে জানান, তিস্তা চুক্তি নিয়ে অগ্রগতি আছে। আর ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর আসছিল যে মমতা রাজি না হলে তাকে বাদ দিয়েই চুক্তি করবে মোদি সরকার।

তবে নির্বাচনের আগেই তিস্তার জট খুলতে বাংলাদেশ ও ভারত একটি অন্তর্বর্তীকালীন পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে প্রাথমিক মতৈক্যে পৌঁছেছে বলে যে খবর একটি সংবাদপত্রে এসেছে, সে বিষয়ে কিছুই বলেননি সদ্য সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। তবে তিনি বরাবরের মতোই জানিয়েছিলেন, যথাসময়ে জানতে পারবেন।

মোদি সরকারের চার বছর পূর্তির দিন গত মে মাসে নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি করতে কেন্দ্রীয় সরকার খুবই আন্তরিক। তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সম্মতি ছাড়া তিস্তা চুক্তি সম্ভব নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘মমতার সঙ্গে মোদির যে মতপার্থক্য বাড়ছে, তাতে মনে হয় না নির্বাচনের আগে মোদির পক্ষে তিস্তা চুক্তি করা সম্ভব। তবে নাটকীয়ভাবে কিছু হলেও হতে পারে। কিন্তু সেই ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না। তিস্তা করতে হলে সরকারকে কূটনৈতিকভাবে মমতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা উচিত।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :